Friday, February 23, 2024
বাড়িSliderকাজী হাবিবুল আউয়াল প্রধান নির্বাচন কমিশনার

কাজী হাবিবুল আউয়াল প্রধান নির্বাচন কমিশনার

প্রথমবারের মতো আইনি প্রক্রিয়ায় নিয়োগ

রায়হান কবির: সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রণিত ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার আইন, ২০২২’ অনুযায়ী প্রথমবারের মতো নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটির বাছাইকৃত তালিকা থেকে একজনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও চারজনকে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিয়েছেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ইসি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নিয়োগ করা হয় সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী হাবিবুল আউয়ালকে এবং চার কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সাবেক জেলা ও দায়রা জজ বেগম রাশিদা সুলতানা, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আহসান হাবীব খান, সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর ও সাবেক সিনিয়র সচিব আনিছুর রহমানকে। যার মধ্য দিয়ে দেশের ১৩তম প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পেলেন কাজী হাবিবুল আউয়াল। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারগণকে প্রধান বিচারপতি শপথ বাক্য পাঠ করান এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি তারা দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
স্বাধীনতার পর দেশে এবারই প্রথম সংবিধান অনুসারে আইন প্রণয়ন করে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে এটি একটি অনন্য মাইলফলক। সংবিধান ও আইন প্রক্রিয়ায় মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গঠিত নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। আওয়ামী লীগ ও বর্তমান সরকারবিরোধী হিসেবে পরিচিত সুশীল সমাজ থেকেও একটি গ্রহণযোগ্য এবং শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সাধুবাদ জানিয়েছে।
নতুন ইসি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও ২০-দলীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, কাজী হাবিবুল আউয়ালের নাম আমি প্রস্তাব করেছিলাম। নাম প্রস্তাব করার আগে তার সঙ্গে আমার কোনো আলাপ হয়নি। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে চিনি। নিজের দেওয়া তালিকা থেকে সিইসি বেছে নেওয়ায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তিনি। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ নতুন ইসি সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, সার্চ কমিটি অনেক সময় নিয়ে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ১০ জনকে বাছাই করেছে। রাষ্ট্রপতি সেখান থেকে পাঁচজনকে নিয়োগ দিয়েছেন। সে-হিসেবে তারা নিশ্চয়ই উপযুক্ত। নতুন ইসি সম্পর্কে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, নতুন সিইসিকে ভালো বলেই জানি। তবে সবকিছু তার কাজের ওপর নির্ভর করবে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি নবনিযুক্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং চার নির্বাচন কমিশনারকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি আশা করি নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন অনুযায়ী সার্চ কমিটির মাধ্যমে সুপারিশকৃত ১০ জন উপযুক্ত ব্যক্তির মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি কমিশন গঠন করেছেন। এই কমিশন দেশের সংবিধান ও আইনকে সমুন্নত এবং নির্বাচন কমিশনের মর্যাদা অক্ষুণœ রেখে আগামীতে তাদের মেয়াদকালে অনুষ্ঠিতব্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানে সাফল্য অর্জন করবে। জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী মো. মুজিবুল হক চুন্নু এমপি বলেন, কাজী হাবিবুল আউয়ালকে (প্রধান নির্বাচন কমিশনার) চিনি, জানি। তার সম্পর্কে আমাদের ধারণা আছে।
নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে আইনের আলোকেই সার্চ কমিটি গঠন করেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং সার্চ কমিটি আইন অনুযায়ী দেশের রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন ও বিশিষ্টজনদের প্রস্তাবিত নাম থেকে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে ১০ জনের নামের তালিকা জমা দেয়। গত ৫ ফেব্রুয়ারি সার্চ কমিটি গঠন করেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসানকে সভাপতি করে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে সুপ্রিমকোর্টের জাজেস লাউঞ্জে ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম বৈঠক করে সার্চ কমিটি। ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে ১২, ১৩ ও ১৬ ফেব্রুয়ারির বৈঠকে নির্বাচন কমিশন গঠনে বিশিষ্টজনদের মতামত নেয় সার্চ কমিটি। ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি বিশিষ্টজনদের সঙ্গে বৈঠকে পাওয়া প্রস্তাব অনুসারে নির্বাচন কমিশনের জন্য ২৬ রাজনৈতিক দল, ৬ পেশাজীবী সংগঠন ও ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তাব করা ৩২২ জনের নামের তালিকা ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করে সার্চ কমিটি। ২২ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিমকোর্টের জাজেস লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত সার্চ কমিটির শেষ বৈঠকে ব্যাপক পর্যালোচনার পর ১০ জনের নামের তালিকা চূড়ান্ত করা হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ২৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, গত ১৭ জানুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় উত্থাপন ও অনুমোদন করা হয়। এই আইন পাসের উদ্দেশে ২৩ জানুয়ারি আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল, ২০২২’ উত্থাপন করেন। ঐদিনই বিলটি যাচাই-বাছাই করে রিপোর্ট পেশ করার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ করেন স্পিকার। এরপর ঐ কমিটি বিলটি রিপোর্ট আকারে সংসদে উপস্থাপনের পর এর ওপর ১২ জন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ছাঁটাই ও সংশোধনী প্রস্তাব দেন। জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সকল রাজনৈতিক দলের মাননীয় সংসদ সদস্যগণের উত্থাপিত ২২টি সংশোধনী গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ হয়। সংশোধনীসহ ২৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলের শিরোনামেও সামান্য সংশোধন হয়। ২৯ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি এ বিলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে এটি আইনে পরিণত হয়। ঐদিনই জাতীয় সংসদ থেকে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২’-এর গেজেট প্রকাশ করা হয়। যার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৫০ বছর পর নির্বাচন কমিশন গঠন আইন প্রণয়নের সাংবিধানিক নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়।
১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশন গঠন আইন প্রণয়নের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা সন্নিবেশিত করেন। জাতির পিতা সংবিধানে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠাসহ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করার বিধান সংযোজন করেন। সে-সময় বিশ্বের অনেক দেশেই নির্বাচন পরিচালনার বিষয়টি নির্বাহী বিভাগের হাতে রাখা হতো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের সংবিধানে নির্বাচন পরিচালনার সর্বময় ক্ষমতা একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করেন এবং কোনোরূপ আইনি অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা ব্যতিরেকে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠার বিধান প্রণয়ন করেন। বঙ্গবন্ধুর সময়ই বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। আর এই নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন গঠন সম্পর্কিত আইন প্রণয়নে সংবিধানে নির্দেশনা থাকলেও বিগত সময়ে উপেক্ষিত থেকেছে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন নিয়োগের আইন না থাকলেও ২০১২ ও ২০১৭ সালে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে দুবার নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রথমবারের মতো সকল রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে সার্চ কমিটির মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনসহ অন্য কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ২০১৭ সালে নিয়োগ দেওয়া নির্বাচন কমিশনও সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ।

লেখক : গবেষণা সহকারী, উত্তরণ

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য