Friday, February 23, 2024

করোনাজয়ী মানুষের গল্প

ল্যাটিন ‘ভাইরাস’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘বিষ’। এই বিষ যুগে যুগে মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। আবার যুগে যুগে মানুষও পরাস্ত করেছে অতিমারি আণুবীক্ষণিক শত্রুকে। সারা পৃথিবীর মানুষ আজ উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে যে সুখবরের জন্য, তা হলো নভেল করোনাভাইরাসের কার্যকর প্রতিষেধক টিকা। এ-মুহূর্তে একমাত্র এ খবরটিই পারে কোটি কোটি মানুষের জীবনে স্বস্তি এনে দিতে। বিজ্ঞানীরা বসে নেই, দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন এই মহামূল্যবান ধন্বন্তরি হাতের মুঠোয় নেওয়ার জন্য। তবে দুঃস্বপ্নের রাত একটু বেশি দীর্ঘ হয়। তারপরও বলা চলে, সেদিন আর নিশ্চয়ই বেশি দূরে নেই, সেই সুখবর আমরা পাব। একদিন আলোর সকাল আসবেই। এই সংখ্যায় উত্তরণ খুঁজে নিয়েছে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে বিজয়ী মানুষের গল্প। শুনুন সবটাই তাদের মুখ থেকে। পাঠকের জন্য যা গ্রন্থিত করেছেন আরিফ সোহেল

ভালো আছি : মাশরাফি
করোনায় জীবন যখন বিপর্যস্ত ঠিক তখন নড়াইলের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন ক্রিকেট অধিনায়ক ও সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি নড়াইলের মানুষকে করোনা থেকে রক্ষার চ্যালেঞ্জ নেওয়া মাশরাফি নিজেই এখন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। গত ২০ জুন করোনাভাইরাস বাসা বেঁধেছে তার শরীরে। এরই মধ্যে মাশরাফির স্ত্রী সুমনা হক সুমিও করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। মাশরাফি করোনা আক্রান্ত হওয়ার দুদিন পর তার ছোট ভাই মুরসালিন বিন মর্তুজা (সিজার) করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শে তারা এখন ঢাকার বাসায় আইসোলেশনে রয়েছেন। মাশরাফি ও তার ছোট ভাই প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আর ৮ জুলাই পারিবারিক সূত্র থেকে জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকার বাসায় থেকে মাশরাফির স্ত্রী সুমনা হক সুমি চিকিৎসা নিচ্ছেন। সুমির শারীরিক অবস্থা ভালো।
সর্বশেষ করোনা পরীক্ষাও মাশরাফি বিন মর্তুজা পজেটিভ। তবে রিপোর্টে পজিটিভ এলেও শারীরিকভাবে বেশ ভালোই আছেন বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক। মাশরাফি জানিয়েছেন, ‘আমি ভালোই আছি। দোয়া করবেন।’ করোনায় আক্রান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘আমি আমার সন্তানদের কাছ থেকে ১৭ দিন বিচ্ছিন্ন আছি, একজন বাবা হিসেবে এটা কতটা কষ্টের তা বলে বোঝানো যাবে না। আমি আমার পরিবারের সদস্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন আছি। তারা আমার কাছে আসতে পারছেন না। এটি অনেক বেদনার। আমি আক্রান্ত হলেও সর্বোচ্চ দিয়ে কাজ করব লোহাগড়ার জনগণের জন্য। আমি শুধু আপনাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। হয়তো আমরা করোনাকে আটকাতে পারব না, তবে একমত হয়ে কাজ শুরু করলে এলাকাকে নিরাপদ রাখতে পারব।’

করোনাজয়ী সারওয়ার ফের আলোচনায়
বাংলাদেশে বিপুল আলোচিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম করোয়া জয় করে কর্মক্ষেত্রে যোগ দিয়েছেন। এবং আবার তিনি উঠে এসেছেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ৭ জুন রক্ত পরীক্ষার পর সারওয়ার আলম করোনা পজেটিভ হয়েছিলেন। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ১৮ দিন পর করোনামুক্ত হয়েছেন। গত ২৪ জুন তিনি নিজেই করোনামুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে। সেখানে র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম লিখেছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর অশেষ রহমত ও আপনাদের সকলের দোয়ার বদৌলতে কোভিড-১৯ থেকে মুক্তি পেলাম। কৃতজ্ঞতা আপনাদের সকলের প্রতি।’
একের পর এক আলোচিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম সস্ত্রীক করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। গত ৭ জুন নিজের করোনা শনাক্তের বিষয়টি জানান তিনি। দেশে করোনা সংক্রমণের পর থেকে সারওয়ার আলম ধারাবাহিকভাবে কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত, নকল মাস্ক, গ্লাভসের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আসছিলেন। এছাড়া, রমজানে ভেজালবিরোধী অভিযান ছাড়াও অনেকগুলো আলোচিত অভিযান পরিচালনা করেছেন তিনি।

আতঙ্কিত হবেন না, ভয় পাবেন না : ড. মাহমুদুল ইসলাম
অনেকেই করোনাকালে হাত-পা গুটিয়ে রাখলেও অনেকে জীবনবাজি রেখে করোনাকালে কাজ করেছেন। অনেকেই তাতে আক্রান্ত হয়েছেন; বিশেষ করে চিকিৎসকরা। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই আবার করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ীযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন ড. মাহমুদুল ইসলাম। পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক এই করোনাযোদ্ধা জীবাণুমুক্ত হয়ে আবার কাজেও যোগ দিয়েছেন। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ২৬ দিন পর তিনি আবার ফিরেছেন চিকিৎসাসেবায়। তিনি করোনাযোদ্ধা জানিয়েছেন, ‘এতদিন আমি বাসায় একা কোয়ারেন্টিনে থেকে চিকিৎসা নিয়েছি। ২ এপ্রিল আমার হাসপাতালে করোনার উপসর্গ নিয়ে আসা একজন বৃদ্ধ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার পর করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলাম বলে আমার ধারণা। বাসায় কোয়ারেন্টিনে থেকে চিকিৎসা নিয়ে আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। আজ থেকে আমি আবার কাজে যোগ দিয়েছি। সবাইকে আমি বলব, করোনায় আক্রান্ত হলে কোনোভাবে আপনি আতঙ্কিত হবেন না, ভয় পাবেন না।’ তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘২ এপ্রিল বাসায় ঢোকার পর থেকে শরীরটা খারাপ লাগতে শুরু করে। দুদিন পর ৪ এপ্রিল আমার শুকনা কাশি, গলাব্যথা আর জ্বর শুরু হয়। এই উপসর্গ দিন দিন বাড়তে থাকে। যে কারণে আমি ৮ এপ্রিল নিজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) গিয়ে করোনার পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়ে আসি। সেদিন রাতেই জানতে পারি, আমার করোনাভাইরাস পজেটিভ। আর ১০ এপ্রিলের পর শরীর আরও খারাপ হয়। জ্বর, কাশি বেড়ে যায়। তবে ১২ এপ্রিলের পর আবার আমার জ্বর, সর্দি, কাশি কমতে শুরু করে। এভাবে আমার কেটেছে ২৬ দিন। কঠোরভাবে কোয়ারেন্টিন মেনে চলার কারণে তার পরিবারের কোনো সদস্য এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হননি।’
করোনাজয়ী মাহমুদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘নরমাল কাশির সময় মনে হয়, বুকের ভেতর কফ জমে আছে। করোনার কাশির সময় মনে হবে যেন গলার ওপরের অংশে ব্যথা। সাধারণ ঠাণ্ডা, কাশি কিংবা জ্বর হলে আমরা যে ধরনের চিকিৎসা নিয়ে থাকি, সেই একই চিকিৎসা করোনার রোগের ক্ষেত্রেও।’

করোনার অভিজ্ঞতা ভয়াবহ
তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসক। শিশু বিভাগে কর্মরত। তার নাম ড. নীলিমা নার্গিস। দীর্ঘ এক মাসের বেশি কোয়ারেন্টিন বা বন্দিজীবন কাটিয়ে আস্তে আস্তে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। করোনার রিপোর্ট পজেটিভ হওয়ার পর বাসায় চিকিৎসা নিয়েছেন। কীভাবে কেটেছে দুঃসময়Ñ জানিয়েছেন, দুর্বলতার কারণে এখন ঘুম বেশি হচ্ছে। নীলিমা নার্গিসের আগে থেকেই অ্যাজমা ছিল। বুকে ব্যথা, কাশি, ডায়রিয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অরুচি, হাত-পা-মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথাসহ করোনার বিভিন্ন লক্ষণ দেরিতে শুরু হয়। রক্তশূন্যতাও ছিল। পালস অক্সিমিটার, অক্সিজেন সিলিন্ডার বাসায় এনে রাখা ছিল আগে থেকেই।
ড. নীলিমা নার্গিস জানান, ২২ এপ্রিল বিএসএমএমইউ-র শিশু (কিডনি) বিভাগে নাইট ডিউটি ছিল। রাত ১০টায় নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা রোগীর রিপোর্ট হাতে আসে। করোনা পজিটিভ। ওই রোগীকে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে রেফার করা, অন্য রোগীদের ব্যবস্থাপনাসহ সব করতে করতে সকাল ৮টা বেজে যায়। পরে ওয়ার্ড লকডাউন করা হয়। সবকিছু শেষ করতে করতে ১৮ ঘণ্টা পার হয়ে যায়। তখনই তিনি বুঝতে পারেন, তার করোনা পজেটিভ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। নীলিমা বললেন, ‘চাইলেই আমি পারতাম অন্য রোগীদের ফেলে আমার ডিউটি টাইমে সকাল ৮টায় বাসায় চলে যেতে। না পারিনি। আমার রোগীর জন্য আমার ভালোবাসা। বাসায় বলে রেখেছিলাম, আইসোলেশনের রুম রেডি রাখতে। সেদিনই বন্দিজীবনের শুরু।’
ড. নীলিমা বললেন, ‘করোনার যে অভিজ্ঞতা, তা ভয়াবহ। হাসপাতালে নিজে বাচ্চাদের ক্যানুলা করেছি। আর নিজের যখন প্রয়োজন তখন অন্যরা ভয়ে আমার কাছে আসতে চায়নি। স্বামী পিপিই পরে ক্যানুলা লাগিয়ে দিয়ে যায়। পরে ক্যানুলার মধ্যে ঝামেলা হলে স্বামীকে আর ডাকিনি। নিজের হাতে নিজে ক্যানুলা লাগানো দুঃসাহসিক কাজ, কিন্তু জীবন বাঁচানোর জন্য তাও করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘দাঁড়িয়ে নামাজ পর্যন্ত পড়তে পারছিলাম না। কিন্তু কেউ যাতে বাইরে থেকে তা বুঝতে না পারে, সে যে কী মানসিক যুদ্ধ, তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বুঝবে না।’ তিনি বললেন, ‘মানসিক শক্তি, মনোবল, আত্মবিশ্বাস থাকা জরুরি। ব্যায়াম করেছি। নামাজ পড়েছি। কোরআন পড়েছি। মন ভালো রাখার জন্য নাটক দেখেছি। মেয়ে দরজার নিচ দিয়ে চিঠি পাঠাত। তা পড়ে ম্যাসেঞ্জারে উত্তর লিখতাম।’

করোনা থেকে সেরে ওঠার গল্প : লোপা বিনতে দেলোয়ার
কখন কোথায় কীভাবে আক্রান্ত হয়েছি এটা বলা মুশকিল। তবে ধারাবাহিক ঘটনাক্রম ছিল এমন। গত ২৪ এপ্রিল (শুক্রবার) সকালে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে ১০ দিনের ডিউটি শেষ করে বাসায় ফিরি। যথারীতি সরকারি বিধি অনুযায়ী ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন হিসেবে বাসায় অবস্থান করতে থাকি। ২৩ এপ্রিল সকাল ১১টা নাগাদ করোনা টেস্টের জন্য স্যাম্পল দিয়েছিলাম। বাসায় এসে জানতে পারিÑ ফল নেগেটিভ। স্যাম্পল দেওয়ার পর ওখানে আমি ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করেছি। কে জানে তখনই কি না…!
২৬ এপ্রিল রাতে আমার স্বামীর জ্বরজ্বর ভাব শুরু হলো। সাহরি খাওয়ার পর সে প্যারাসিটামল খেয়েছিল। তাতে লাভ হয়নি। সকাল থেকেই গা গরম। তীব্র জ্বর নয়, তবে তাপমাত্রা ভালোই ছিল। এইভাবে জ্বর ছিল ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত। তারপর জ্বর চলে গেল। পরদিন থেকে শুরু হল আমার জ্বরে ভোগার পালা। ২ মে করোনা টেস্ট করলাম। রাত ৯:৫৩টায় মুঠোফোনে বার্তা এলো- দুজনেরই কোভিড-১৯ পজিটিভ। আমরা দুজনেই নিজ নিজ অফিসে ফোন করে বিষয়টা জানালাম। ‘সাহস আর আত্মবিশ্বাসই হচ্ছে এই রোগটাকে হার মানানোর মহৌষধ। ওষুধগুলো পুরোপুরিই লক্ষণ অনুসারে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুসারে নিতে হবে। একজন করোনা রোগীকে দিনে কমপক্ষে ৪-৫ গরম পানির বাষ্প নিতেই হবে। নিয়মিত ভিটামিন অবশ্যই গ্রহণ করা আবশ্যক। আমরা প্রতিবারই খাবারের সময় এবং অন্য সময়েও প্রচুর পরিমাণে লেবু খেয়েছি। পরিবারের অনেকেই প্রতিদিন ফোন করে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, সাহস দিয়েছেন।’ লোপা আরও বলেছেন- ‘সবচেয়ে দামি কথাটি হলোÑ ভয় পাওয়া যাবে না এবং মনে সাহস রাখতে হবে, যাতে আপনার অর্ধেক চিকিৎসা হয়ে যাবে। সবাই ভালো থাকুন, সচেতন থাকুন, সবসময় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছিÑ ‘করোনা মানেই মৃত্যু নয়; এই কথা একজন রোগী এবং সাধারণ মানুষের মনে রাখতে হবে। মনোবল ধরে রেখে ভাবতে হবে করোনা সাধারণ সর্দি-কাশির মতোই একটি রোগ। যা নিরাময়যোগ্য। এক্ষেত্রে চিকিৎসার বিধি ও করণীয় শতভাগ মানার বিকল্প নেই। আর কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে চিকিৎসার সঙ্গে তাকে সর্বাত্মকভাবে সাহস জোগাতে হবে। দূরে না ঢেলে দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে।’

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৃষিই দেখাচ্ছে আশা
পরবর্তী নিবন্ধ‘অহিংসার পথেই প্রতিবাদ জানাব’
আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য