Saturday, July 13, 2024
বাড়িSliderএলএনজিতে সহযোগিতা দেবে ব্রুনাই

এলএনজিতে সহযোগিতা দেবে ব্রুনাই

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সহযোগিতা দিতে সম্মত হয়েছে ব্রুনাই। বিশেষ করে এলএনজি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা দেবে দেশটি। বাংলাদেশ ও ব্রুনাইয়ের মধ্যে আগেও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা ছিল। মাঝে কয়েক বছর বন্ধ থাকায় এখন তা পুনরায় চালু হতে পারে।

আশরাফ সিদ্দিকী বিটু: ব্রুনাই দারুসসালামের সুলতান হাজি হাসানাল বলকিয়াহ মুইজ্জাদ্দিন ওয়াদ্দৌলাহর বাংলাদেশ সফরে সরাসরি বিমান যোগাযোগ, জনশক্তি রপ্তানি, তরলীকৃত গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম সরবরাহসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে একটি চুক্তি ও ৩টি সমঝোতা স্মারক সই করেছে দুই দেশ। বৈঠকে বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য ব্রুনাইয়ের সুলতানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশকে জ্বালানি বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন ব্রুনাই সুলতান। ব্রুনাইয়ের সুলতান হাজি হাসানাল বলকিয়াহ’র ঢাকা সফর নিয়ে ২২-দফার যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
গত ১৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ব্রুনাইয়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির সুলতান হাসানাল বলকিয়াহ। বৈঠকে বাংলাদেশে ব্রুনাইয়ের ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকে ব্রুনাই সুলতান বাংলাদেশ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, কৃষি ও মৎস্য পণ্য, হালাল মাংস নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। জ্বালানি বিষয়ে আলোচনায় সুলতান বলকিয়াহ বলেছেন, চাহিদা অনুযায়ী তারা বাংলাদেশকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করবেন।
২২-দফার যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, উভয়পক্ষ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে ঐকমত্য পোষণ করেছে। যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগে ব্রুনাইকে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ব্রুনাই খাদ্য ও কৃষি খাতে বিনিয়োগে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আরও দক্ষ জনশক্তি নিতে সম্মত হয়েছে ব্রুনাই। উভয়পক্ষ মানসম্মত উচ্চতর শিক্ষা খাতে সহযোগিতা করবে। উভয়পক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি, গ্রিন টেকনোলজি ও সমুদ্র অর্থনীতি খাতে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে।
ব্রুনাইয়ে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত। কিন্তু দেশটিতে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে প্রায় ৭০ হাজার নতুন কর্মীর প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ থেকে এক্ষেত্রে কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যে নতুন সমঝোতা স্মারক ইতিবাচক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সফরের দ্বিতীয় দিন বিকাল পৌনে ৪টার দিকে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছালে ব্রুনাই সুলতান হাসানাল বলকিয়াহ’কে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সুলতান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছানোর পর দুই নেতা একান্ত বৈঠক করেন। পরে দুদেশের প্রতিনিধি পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শুরু হয়। বৈঠক শেষে একটি চুক্তি ও ৩টি সমঝোতা স্মারক সই হয়। ‘এয়ার সার্ভিস অ্যাগ্রিমেন্ট’ সই করেন বাংলাদেশের পক্ষে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী এবং ব্রুনাইয়ের পক্ষে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর অফিসমন্ত্রী এবং ফাইন্যান্স ও ইকোনমিমন্ত্রী আমিন আবদুল্লাহ। ‘বাংলাদেশি জনশক্তি নিয়োগ’ বিষয়ে ঢাকার সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে ব্রুনাই। এ সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের পক্ষে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমেদ এবং ব্রুনাইয়ের পক্ষে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহমাদিন বিন হাজি আবদুল রহমান সই করেন। ‘তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য’ সরবরাহ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে দুদেশ। এ সমঝোতা স্মারকে সই করেন ব্রুনাইয়ের প্রধানমন্ত্রীর অফিসমন্ত্রী এবং ফাইন্যান্স ও ইকোনমিমন্ত্রী আমিন আবদুল্লাহ এবং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এমপি। তৃতীয় সমঝোতা স্মারকটি হলোÑ ‘রিকগনিশন অব সার্টিফিকেট ইস্যুড আন্ডার দ্য প্রভিশন্স অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন স্ট্যান্ডার্ডস অব ট্রেনিং, সার্টিফিকেশন অ্যান্ড ওয়াচ কিপিং ফর সিফেয়ারস, ১৯৭৮ অ্যাজ অ্যামেন্ডেড’। এ সমঝোতা স্মারকে সই করেন বাংলাদেশের নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি এবং ব্রুনাইয়ের প্রধানমন্ত্রীর অফিসমন্ত্রী এবং ফাইন্যান্স ও ইকোনমিমন্ত্রী আমিন আবদুল্লাহ।
ব্রুনাইয়ের সুলতানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেছেন। বৈঠকে বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব করেছেন এবং এ লক্ষ্যে দুদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সমন্বিতভাবে কাজ করবেন। ব্রুনাইর সুলতান বাংলাদেশ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, কৃষি ও মৎস্য পণ্য, হালাল মাংস নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। জ্বালানির বিষয়ে আলোচনাকালে সুলতান বলকিয়াহ বলেছেন, চাহিদা অনুযায়ী তারা বাংলাদেশকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করবেন।
বাংলাদেশ থেকে আরও জনশক্তি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষি ও মৎস্য, সেবা প্রদান খাত, আইসিটি, মেরিনসহ বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশে অনেক মেধাবী পেশাদার কর্মী রয়েছে। ব্রুনাই চাইলে তাদের নিতে পারে এবং তাদের জনশক্তির চাহিদা মেটাতে পারে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনাকালে শেখ হাসিনা বলেন, এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও নিজ দেশে ফেরত যায়নি। রোহিঙ্গাদের নিজেদের মাতৃভূতিতে ফিরে না যাওয়ার ঘটনাকে দুঃখজনক বলেন ব্রুনাইয়ের সুলতান। দুদেশ প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
কোভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন হাসানাল বলকিয়াহ। আলাপকালে শেখ হাসিনা শুধু পশ্চিমা দেশগুলোর দিকে না তাকিয়ে পূর্ব এবং আশপাশের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এ অঞ্চলের দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করলে সবারই উন্নতি হবে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নিজের এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানার পক্ষ থেকে সুলতানকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
এদিকে ব্রুনাইয়ের সুলতান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আসার আগে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি সেখানে রক্ষিত দর্শনার্থী বইয়ে স্বাক্ষর করেন। জাদুঘর প্রাঙ্গণে জাতির পিতার কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি তাকে অভ্যর্থনা জানান।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে গত ১৫ অক্টোবর তিন দিনের জন্য ভিভিআইপি বিমানে ঢাকা এসেছিলেন ব্রুনাইর সুলতান। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তাকে স্বাগত জানান। বিমানবন্দরে তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেখান থেকে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে শহিদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সুলতান। সেদিন সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে বৈঠক করে সুলতানের সম্মানে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি। এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও যোগ দিয়েছিলেন।
তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে গত ১৭ অক্টোবর দেশে ফিরে যান ব্রুনাইয়ের সুলতান হাসানাল বলকিয়াহ মুইজ্জাদ্দিন ওয়াদ্দৌলাহ।
তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ ব্রুনাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট্ট একটি দেশ। দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই বিদেশি। তাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছেন। বিদেশি কর্মীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের হার ১৫ শতাংশ। ব্রুনাইয়ের সঙ্গে সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হলে সেদেশে কর্মরত আমাদের কর্মীরা উপকৃত হবেন সন্দেহ নেই। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ব্রুনাই যেতে হয় সিঙ্গাপুর বা কুয়ালালামপুর হয়ে। সরাসরি বিমান যোগাযোগ স্থাপিত হলে দুদেশের বাণিজ্যের সুযোগও বাড়বে বলে আশা করি। ব্রুনাই থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করা গেলে এ খাতেও আমরা উপকৃত হতে পারি।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের এপ্রিলে ব্রুনাই সফর করেন। ওই সফরে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারে আলোচনার পাশাপাশি ৬টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। ব্রুনাইয়ের সুলতানের এটা ছিল ফিরতি সফর। আর ব্রুনাইয়ের সুলতানের এটিই প্রথম বাংলাদেশ সফর।

লেখক : সহ-সম্পাদক, উত্তরণ

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য