Friday, February 23, 2024
বাড়িSliderএখনও সজীব বঙ্গবন্ধুর সবুজ বিপ্লব

এখনও সজীব বঙ্গবন্ধুর সবুজ বিপ্লব

বঙ্গবন্ধুর সবুজ বিপ্লবের আদর্শের মশাল বহন করছেন তারই সুযোগ্য কন্যা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনিও জাতির পিতার স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে কৃষি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।

রাজিয়া সুলতানা: যুদ্ধবিধ্বস্ত ক্ষুধার্ত সাড়ে ৭ কোটি মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতেই বঙ্গবন্ধু সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। সাধারণত সবুজ বিপ্লব বলতে আমরা বুঝি গতানুগতিক কৃষি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে অল্প সময়ে অধিক ফসল উৎপাদনের কৌশল। অর্থাৎ কৃষিতে উচ্চ ফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক, পানি সেচ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বাড়ানোই সবুজ বিপ্লব। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান দেশ বিনির্মাণে সবুজ বিপ্লবের আহ্বান করেন।
১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ছিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠান। সেখানে জাতি পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, “আমাদের গ্রামের দিকে নজর দিতে হবে। কেননা, গ্রামই কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের উৎপাদনের মূল কেন্দ্র। গ্রামের উন্নয়ন ও কৃষকের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারলেই সোনার বাংলা বাস্তবায়িত হবে।” উৎসবে সবুজ বিপ্লব সফল করতে কৃষি গ্র্যাজুয়েটদের আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেছিলেন, “আপনারা যারা কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছেন। আপনাদের গ্রামে গিয়ে কৃষকের সঙ্গে মিশে যেতে হবে, মনোযোগ দিতে হবে তাদের চাহিদা আর কর্মের ওপর, তবেই তারা সাহসী হবে, আগ্রহী হবে, উন্নতি করবে। ফলাবে সোনার ফসল খেত ভরে। গ্রাম উন্নত হলে দেশ উন্নত হবে। কৃষককে বাঁচাতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে। তা না-হলে বাংলাদেশকে বাঁচাতে পারব না। কারণ শুধু কাগজে-কলমে আর বই পড়েই কৃষিকাজ হয় না। ছোট ভাইয়েরা তোমরা মনে কিছু করবে না। বই পড়ে তোমরা যা শেখো, গ্রামে যারা অর্থাৎ বুড়ো কৃষক, নিজের অভিজ্ঞতায় কম শেখে না। যদি তাদের জিজ্ঞেস করো; এ জমিতে কী লাগবে, কতটুকু সার লাগবে, সে নির্ভুল বলে দিতে পারবে। তোমরা পাঁচ বছরে বই পড়ে যা শিখবে না, তার কাছে দেখো উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যাবে। বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে একটু প্র্যাকটিক্যাল কাজ করতে হবে। প্যান্ট-শার্ট-কোট একটু খুলতে হবে। তা না হলে কৃষিতে সবুজ বিপ্লব করা যাবে না।”
ইতিহাসে সবুজ বিপ্লবের শুরু ১৯৪৪ সালে মেক্সিকোতে। উচ্চ ফলনশীল, রোগ প্রতিরোধক আধা বেটে গমের জাত উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল যাত্রারম্ভের গল্প। সাথে যুক্ত করা হয়েছিল রাসায়নিক সারের ব্যবহার। এই ঐতিহাসিক কাজের সূচনা করে বিশ্ববাসীকে ক্ষুধার জ্বালা থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন একজন আমেরিকান কৃষিবিজ্ঞানী (কৌলিতত্ত্ববিদ) নরম্যান আর্নেস্ট বোরলগ। নরম্যানকে সবুজ বিপ্লবের জনক বলা হয়। তবে ‘সবুজ বিপ্লব’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন উইলিয়াম এস গ্যাড ১৯৬৮ সালে। তিনিও ছিলেন একজন মার্কিনী। ওই দেশের প্রশাসনের এক আধিকারিক ছিলেন উইলিয়ামস। দক্ষিণ এশিয়ার ভারতও খুব বেশি পিছিয়ে ছিল না। ওই উপমহাদেশের কয়েকটি অঞ্চলে উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহার করে প্রথম সবুজ বিপ্লবের সূচনা করা হয়েছিল ১৯৬৪-৬৫ সালে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। হৃত স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে লেগে যায় প্রায় ১৯০ বছর। তারপর আরও গল্প। গল্প ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ১৭৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। দেশের আপামর জনগণ দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলার অবিসংবাদিত নেতা পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। দায়িত্ব নেন বাংলাদেশের। শুরু হয় দেশ গড়ার সংগ্রাম।
যুদ্ধে বিপর্যস্ত সুজলা-সুফলা বাংলাকে হেনরি কিসিঞ্জার বললেন, তলাবিহীন ঝুড়ি। দায়িত্ব নিয়ে হতাশ হলেন না জাতির পিতা। দেশের মানুষকে বাঁচাতেই হবে। ভিক্ষা নয়, প্রথমেই খাদ্যের ব্যবস্থা করার পথ আঁকলেন। তিনি জানতেন তার প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে শত শত নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়। জানা আছে দেশের উর্বর মাটির কথা। আছে দেশ গড়ার বড় হাতিয়ার কৃষক। দেশের ৮০ শতাংশ লোকই কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। তাই বঙ্গবন্ধু প্রথম হাত দিলেন কৃষি আঙিনায়। তার দিব্যচোখ দিয়ে বুঝে নিয়েছিলেন পুরনো আমলের সনাতন পদ্ধতির চাষাবাদ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে ভাত তুলে দেওয়া সম্ভব হবে না। তাই তিনি সবুজ বিপ্লবের জনক নরম্যানের দেখানো পথেই হাঁটলেন। ক্ষুধা ও দরিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়তে ডাক দিলেন সবুজ বিপ্লবের।
তখন দেশের বেশিরভাগ কৃষকই চিরায়ত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করত। অন্যদিকে পাকিস্তানি শাসকদের অবহেলার কারণে পূর্ব বাংলায় যুদ্ধের আগেই গড়পড়তা ১৫ লাখ টন খাদ্যশস্যের ঘাটতি ছিল। এরপর রক্তক্ষয়ী ৯ মাসের যুদ্ধ। সব মিলিয়ে তখন দেশে খাদ্য ঘাটতি প্রায় ৩০ লাখ টন। দেশের এ অবস্থা থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য কৃষিবান্ধব শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে উচ্চ ফলনশীল বীজ, সার, কীটনাশক ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের আহ্বান করলেন। পাশাপাশি তৃণমূলের কৃষকরা যাতে সহজেই কৃষিসামগ্রী পেতে পারে, তার জন্য কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করলেন। তাছাড়া কৃষকদের মধ্যে ধান, গম, আলু ও পাটের বীজ বিতরণ করলেন। বিদেশ থেকে সার আমদানি করে তা কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিলেন। সেচের জন্য গভীর ও অগভীর নলকূপ এবং লোলিফ্ট পাম্পের ব্যবস্থা করে দিলেন। গ্রামগঞ্জে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করলেন। কৃষিকাজে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের জন্য বিএডিসি’কে নামমাত্র মূল্যে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার সরবরাহ করলেন। বঙ্গবন্ধু বিএডিসি’র মাধ্যমে এসব যন্ত্র কৃষকদের মাঝে ভর্তুকি দিয়ে বিতরণের ব্যবস্থা করেছিলেন। নামমাত্র মূল্যে কৃষকদের হাল চাষের জন্য বলদ, ভর্তুকি মূল্যে দুধেল গাই দিয়ে সাহায্য করলেন। টানা তিন মাস কৃষকদের মাঝে তিনি খাদ্যশস্যসহ ৩০ কোটি টাকার রিলিফ প্রদান করেন। ফসল উৎপাদন বাড়ানোর জন্য এক ফসলি জমিকে দুই ফসলি আর দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তরিত করার পথ বাতলে দিলেন।
ছোটবেলা থেকে কৃষকদের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা শেখ মুজিবুর রহমান কৃষিকে শুধু শস্যের মধ্যেই বেঁধে রাখেননি। মৎস্য চাষ, পশু পালন, বনায়ন ইত্যাদি সেক্টরগুলোও সেই আওতায় নিয়ে এসেছিলেন। সবুজ বিপ্লবকে যথাযথভাবে স্বার্থক করতে প্রকৃতির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। তাই তো বঙ্গবন্ধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগও গ্রহণ করেছিলেন। ষড় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ঋতুভেদে প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকে। বন্যা, খরা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, নদীভাঙন ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তাই তো তিনি বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বাঁধ নির্মাণ ও ঘূর্ণিঝড় থেকে জানমাল রক্ষার জন্য ‘মুজিব কিল্লা’ নির্মাণে উদ্যোগী হয়েছিলেন। সবুজ বিপ্লব তথা কৃষি বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কৃষি শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করছিলেন। সরকারি চাকরিতে কৃষিবিদদের তিনি প্রথম শ্রেণির মর্যাদা দিয়েছিলেন। আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি প্রণয়ন এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের জন্য কৃষি গবেষণার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-কে পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠানে রূপদান করেছিলেন। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত উন্নয়ন কৃষক-বন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের হাত দিয়েই শুরু হয়। পাশাপাশি তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রতিবেশী দেশের সাথে যৌথ নদী কমিশন গঠন, নেদারল্যান্ডস সরকারের সঙ্গে নদী খননের জন্য ড্রেজিংয়ের চুক্তিও সম্পাদন করেছিলেন। দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু সবুজ বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করার জন্য বাংলাদেশ হাওর উন্নয়ন বোর্ড ও নারায়ণগঞ্জ ড্রেজার পরিদপ্তর গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠকেই বঙ্গবন্ধু কৃষকদের জন্য এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। আর তা হলো দেশের প্রথম অর্থ বাজেটেই মোট উন্নয়ন ব্যয় ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে কৃষি খাতেই বরাদ্দ দিয়েছিলেন ১০১ কোটি টাকা। খাসজমিসহ ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিতরণযোগ্য জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করার জন্য পরিবারপ্রতি জমির সিলিং ১০০ বিঘা নির্ধারণ করে দেন। তাছাড়া পাকিস্তানি আমলে রুজু করা ১০ লাখ সার্টিফিকেট মামলা থেকে কৃষকদের রক্ষা করেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা চিরতরে মাফ করেছিলেন। দরিদ্র কৃষকদের রক্ষায় নিম্নমূল্যে রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। গরিব কৃষক পরিবারের সন্তানদের সরকারি খরচে লেখাপড়ার ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন এই বাংলাদেশ স্রষ্টা শেখ মুজিব। কৃষকদের স্বার্থে ইজারাদারি প্রথা বিলুপ্তি করে ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রণালয় স্থাপন এবং সেলামি ছাড়া জমি বণ্টনের ব্যবস্থাও করেছিলেন। মোদ্দাকথা ১৯৭৩ সালে প্রণীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় তিনি কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। গুরুত্ব দিয়েছিলেন কৃষির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ শিল্প উৎপাদনের দিকে। অর্থকরী ফসল পাট রপ্তানি কমে গেলে তিনি অস্থির হয়ে যান রপ্তানি বাড়ানোর জন্য। এত কিছুর পরও কতিপয় অসৎ ব্যক্তি ও মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর কারসাজিতে ১৯৭৪ সালে দেশের কোনো কোনো স্থানে সাময়িকভাবে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয়েছিল। বিচক্ষণ নেতা বঙ্গবন্ধু অল্পদিনের মধ্যেই সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খুঁজে বের করেন। এরপর সমগ্র বাংলাদেশের কৃষকদের এক করার জন্য তিনি নিয়েছিলেন এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তার স্বপ্ন ছিল কৃষকদের সমবায় সমিতি গঠন। ৬৫ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। এই নীতির ওপর ভিত্তি করে তিনি প্রতিটি গ্রামে একটি সমবায় সমিতি বানাতে চেয়েছিলেন। যেখানে সকল কৃষক একত্রিত হয়ে কাজ করবে। অর্থনৈতিক মুক্তি পাবে জাতি। কিন্তু তার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। কিছু স্বার্থান্বেষী কুচক্রি ঘাতকদের বুলেটের আঘাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান। জাতি হারালো তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। ভাগ্যক্রমে বিদেশে থাকায় বেঁচে গিয়েছিলেন জাতির পিতার সুযোগ্য উত্তরসূরিÑ দুই মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। দীর্ঘ ২১ বছর পর পিতার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে; বন্ধুর কঠিন সময় পার করে ১৯৯৬ সালে ফের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই পিতার মতো তিনিও বুঝতে পেরেছিলেন দারিদ্র্য বিমোচনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার কৃষক। একমাত্র কৃষকরাই পারবে সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে। তাই তো তিনি সবুজ বিপ্লবকে সামনে রেখে কৃষিবান্ধব সকলনীতি গ্রহণ করেন। ফলে বাংলাদেশ আজ দানাদার শস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ তো বটেই; সাথে সবজি, ফল, মৎস্য ও কৃষির অনান্য সেক্টরেও অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। নতুন এই সবুজ বিপ্লবের রূপকার মানবতার নেত্রী শেখ হাসিনা।
সবুজ বিপ্লবের ফলে উৎপান বৃদ্ধি পেলেও বাজারজাতকরণের অভাবে প্রায়ই কৃষকরা পণ্যের সঠিক মূল্য পান না। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে মানুষ সনাতন পদ্ধতির চাষাবাদ পদ্ধতি ভুলে যাচ্ছে। ফলে গড়পরতায় বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কারণ অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, জমিতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটি ও পানি দূষিত হচ্ছে। সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করায় পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে বিভিন্ন জায়গায় ভূমিধসের সৃষ্টি হচ্ছে। সবুজ বিপ্লব বাস্তবায়নে দানাদার শস্য যে গুরুত্ব পাচ্ছে, অনান্য ফসল তেমন পাচ্ছে না। তৃণমূলের প্রান্তিক কৃষকরা সবুজ বিপ্লবের সকল সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলে কৃষকদের মধ্যে আয়ের বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি বুঝে; না-বুঝে প্রাথমিক অবস্থায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জমির গুণগতমান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উৎপাদিত ফসলে তামা, দস্তা ও সিসার মতো ভারী ধাতুর অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে, যা শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হলোÑ উফশি ফসল চাষাবাদের ফলে আমরা অনেক রোগ প্রতিরোধী আদি জাত হারিয়ে যাচ্ছে। তবে সবুজ বিপ্লবের জনক ড. নরমেন বোরলগের কণ্ঠের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে চাইÑ ‘বিশ্বব্যাপী স্বল্প উৎপাদনজনিত ক্ষুধা জিইয়ে রাখার চেয়ে; অধিক উৎপাদনজনিত কিছু সমস্যার মোকাবিলা করা অনেক ভালো।’
সার্বিকভাবে বলতে পারি, অতিরিক্ত জনসংখ্যার জন্য খাদ্যের জোগান করতে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত সবুজ বিপ্লবের কোনো বিকল্প ছিল না। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ছিল ৯৩ মার্কিন ডলার। সেই দেশেই তা উন্নীত হয়ে ১৯৭৫ সালে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছিল ২৭৩ মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর দায়িত্বশীল নেতৃত্বেই মাত্র সাড়ে তিন বছরে এ অভাবনীয় পরিবর্তন সম্ভব হয়েছিল। জাতির পিতার স্বপ্নের সমৃদ্ধ সোনার বাংলা আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই অর্জন ১৯৭২ সালের সবুজ বিপ্লবের ‘আরও বেশি খাদ্য ফলান’ সেøাগানের সঙ্গে এক সুতায় বাঁধা যায়।
বঙ্গবন্ধু আজ নেই, আছে তার দর্শন, আদর্শ ও দিক-নির্দেশনা। সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়ে স্বল্পতম সময়ে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করে কৃষিকে ভিত্তি করেছিলেন। দেশ গড়ার ক্ষেত্রে কৃষি-খামারে যে ব্যাপক কর্মকা- শুরু করেছিলেন, তার অন্তর্নিহিত আবেদনটি আজও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কৃষিক্ষেত্রে সেই অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতা তার সুযোগ্য কন্যা, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা রক্ষা করে আরও বেগবান করতে সক্ষম হয়েছেন। ‘কৃষক বাঁচলে, বাঁচবে দেশ’Ñ এই রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কথা বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা সরকারের রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর কৃষকপ্রীতির কথা মনে রেখেই বর্তমান সরকার কৃষকদের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। কৃষক বাঁচলেই দেশ বাঁচবে- সে-কথা জননেত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বাস করেন। তাই গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ ঘটেছে। দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
করোনার নির্মম আঘাতের পরেও বিশ্ব দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা রূপকল্প ২০৪১ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০ অর্জনসহ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে কৃষি খাতে সাফল্য অব্যাহত ছিল। বঙ্গবন্ধুর সবুজ বিপ্লবের আদর্শের মশাল বহন করছেন তারই সুযোগ্য কন্যা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনিও জাতির পিতার স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে কৃষি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পুষ্টি উন্নয়ন, মহিলাদের কৃষিতে অংশগ্রহণ ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার আরও এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। কৃষি খাতে আবার ভর্তুকি, সার বিতরণ ব্যবস্থা, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, শস্য বহুমুখীকরণসহ অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার।

লেখক : শিক্ষক; পিএইচডি গবেষক, প্ল্যান্ট প্যাথলজি শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা নগর, ঢাকা
raziasultana.sau52@gmail.com

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য