test
Monday, May 27, 2024
বাড়িকৃষিউত্তরণের পথে

উত্তরণের পথে

শাইখ সিরাজ : আওয়ামী লীগ নেতা, গবেষক ও প্রাবন্ধিক নূহ-উল-আলম লেনিন ফোন করে আমার একটি লেখা চাইলেন। কিছুটা রসিকতার সুরেই বললেন, আমাদের নিয়ে সমালোচনা করার অনেক প্লাটফরম আপনাদের রয়েছে। সুযোগও রয়েছে। কৃষি নিয়ে যদি সরকারের কিছু অর্জন থাকে, তাহলে সেটি নিয়ে একটি লেখা দেবেন। বললাম, সত্যিকার অর্থে অযাচিত ও নেতিবাচক সমালোচনার সাংবাদিকতা আমরা করি না। আমাদের সক্ষমতা ও অক্ষমতা দুটিই আমরা জানি। তাই নেতিবাচক সমালোচনা করে কোনো পক্ষের উদ্দেশ্য প্রণোদিত বাহবা কুড়ানোর পক্ষে আমরা নই। আর কৃষি নিয়ে যদি বলতে বলা হয়, অবশ্যই বলব। কৃষিতে ইতিবাচক অনেক অর্জন আছে। এ কাজটিই আমি করে থাকি। সত্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করি। জনাব লেনিন বললেন, আমাদের পত্রিকাটি দলীয়। নাম ‘উত্তরণ’। আমারও তখনই মনে হলো, আমার লেখাটির শিরোনাম হতে পারে ‘উত্তরণের পথে’।
পৃথিবী এক কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে চলছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার এই আধুনিক সময়ে মহামারিকাল অতিক্রম করতে হচ্ছে। মানুষ স্মরণাতীত কালের মধ্যে সবচেয়ে অসহায় এখন। উন্নয়নের গর্বে গর্বিত উন্নত বিশ্বও এ পরিস্থিতিতে নাকাল। প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীকেই তার জনজীবন ও অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন হতে হচ্ছে। সব-রকম উৎপাদন ব্যবস্থা ধসে পড়েছে। সকল আত্মাভিমান ও অহংকার থেকে দমে গিয়ে সব জাতিগোষ্ঠীকেই এখন বেঁচে থাকা নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার কোনো পূর্ব প্রস্তুতি কারও হাতেই ছিল না। তাই গত মার্চ-এপ্রিল-মে মাসে আমরা দেখেছি উন্নত বিশ্বও খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। মানুষ নিদানকালের খাদ্য সংগ্রহ করা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পৃথিবীর দরিদ্রতম জনপদের বাইরে এই আধুনিক সময়ে মানুষের এই দুর্যোগ আর দেখা যায়নি।
আমি মহান সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করেই বলতে চাই, এই কঠিন সময়ে আমরা ভেঙে পড়িনি। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল এবং সামনের দিকে অগ্রসরমাণ অর্থনীতির দেশ হিসেবে আমাদের যতটা হতাশ হয়ে পড়ার কথা ছিল, ততটা হতাশ আমাদের হতে হয়নি। এর পেছনে যতগুলো নিয়ামক, তার সবচেয়ে সামনেই রয়েছে আমাদের কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা। যেটি গত এক দশকে একটি মজবুত জায়গায় এসে পৌঁছেছে বলেই আমরা এই খাতের ওপর দৃঢ়ভাবে নির্ভর করতে পারছি। গত এক দশকে আমরা বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে পড়িনি। তাছাড়া কৃষি উপকরণগুলো সহজলভ্য হয়েছে। উচ্চফলনশীল ফসল উৎপাদন করতে গিয়ে কৃষকের বড় সংকটের জায়গাটি ছিল উপকরণ। সরকার উপকরণকে সহজলভ্য করেছে, বেসরকারি খাতের মাধ্যমে ফসলের উচ্চ ফলনশীল বীজ আমদানি ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহের জন্য অনুুকূল ব্যবস্থা করছে। এ কারণে কৃষক ফসল উৎপাদনের গতি বাড়াতে পেরেছে, অল্প জমি থেকে বেশি ফসল উৎপাদন করতে পেরেছে। শস্যের নিবিড়তা বেড়েছে, চাষ পদ্ধতির নানারকম পরিবর্তন এসেছে। যে কারণে দেখা যায়, স্বাধীনতা-উত্তরকালে টানা এক দশক এই প্রথম আমরা কৃষি উৎপাদনে ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখতে পেরেছি। এ-কথা স্বীকার করতেই হবে যে, আমরা এখনও কৃষির সামগ্রিক উন্নয়নের জায়গাতে শতভাগ গতি সঞ্চারিত করতে পারিনি, এখনও অনেক সংকটের জায়গা রয়েছে। তারপরও যে সাফল্য সূচিত হয়েছে সে-সাফল্য তুলনাহীন। অন্য কোনো খাতেই এমন সাফল্যের দৃষ্টান্ত গড়ে ওঠেনি। আজ করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে আমাদের আত্মবিশ্বাসের বড় জায়গাটি এখানেই।
বর্তমান সময়টির তুলনা করার জন্য আমি একটু পেছনের দিকে যাব। আমি নিজে কৃষক নই; কিন্তু কৃষি-কৃষক, গ্রামীণ জীবন ব্যবস্থা, জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতি আমার কাজের প্রধান ক্ষেত্র। এদেশের অন্যসব মানুষের মতো আমারও পূর্বপুরুষের পেশা কৃষি। চার দশক ধরে আমার কাজের ক্ষেত্র কৃষি। কৃষির উত্থান-পতনের সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের জীবনমানের যে পরিবর্তন হয়, তাদের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, সেগুলো কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ ঘটে। আশির দশকের গোড়ার দিকে গ্রামীণ কৃষিজীবী জনগোষ্ঠীর জীবন ব্যবস্থা যতখানি দারিদ্র্যে মোড়া ছিল সে-সময়গুলো কল্পনা করতেও কষ্ট হয়। দেখেছি মানুষের কষ্ট ও দুর্দশা। বাল্যবেলায় নানাবাড়িতে গিয়ে দেখেছি চুলোয় ভাত রান্না হচ্ছে, সেই ভাতের মাড়টুকু নেওয়ার জন্য দরিদ্র নারীরা অপেক্ষা করছে। এই তো সেদিনের কথা, যখন গ্রামের কৃষক শতছিন্ন গেঞ্জি পরে মাঠে কাজ করতেন, গ্রামের দরিদ্র একজন নারী গোসলের পর পরনের শাড়ির একাংশ পরে আরেকাংশ রোদে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। কারণ, তার পরার কাপড় একটাই। তৃণমূল কৃষক পরিবারের আনন্দ বিনোদন বলতে কিছু ছিল না। শত অনিশ্চয়তায় ভরা ছিল তাদের জীবন। কি দুর্যোগকাল, কী সাধারণ সময় সব সময়ই তাদের জীবন ছিল সংকটে ভরা। ভৌগোলিক কারণে, বন্যা, খরা, লবণাক্ততাসহ নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষকের মানুষের পেছনে লেগে থাকত। মানুষ কোনো আশার আলোই দেখত না। শুরুর দিকে টেলিভিশন ক্যামেরা নিয়ে যখন মানুষের সামনে যেতাম, তখন সামনে এসে কথা বলার মতো শক্তি তাদের ছিল না। সমস্যা আর সংকটই ছিল তাদের জীবনসঙ্গী।
নতুন সহস্রাব্দের গোড়ার দিক থেকেও যদি হিসাব করতে করতে আসি, ২০০৭-০৮ সালেও দেশে কৃষির ভয়াবহ সংকট ছিল। মানুষ সারের জন্য লম্বা সারিতে দাঁড়িয়ে, দিনের পর দিন অপেক্ষা করে সার পেত না। কৃষির সব উপকরণের জন্যই ছিল হাহাকার। সামনে এগোনোর মতো কোনো শক্তিই ছিল না তাদের। ছিল না কোনো স্বপ্ন। মনে পড়ে, ২০০৭ সালে একেবারে ভোরে ময়মনসিংহের ফুলপুরের কাশিগঞ্জ বাজারে যাই। সারের জন্য আগের সন্ধ্যা থেকে লাইন ধরে আছে মানুষ। গায়ে গা লাগিয়ে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে। সারের জন্য এক কঠিন হাহাকার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে সার পাচ্ছে দুই কেজি তিন কেজি। এক কঠিন বিভীষিকা। পরবর্তীতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেই সারের মূল্য কৃষকের নাগালে নিয়ে এলো। কৃষিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন গণমানুষের নেত্রী মতিয়া চৌধুরী। তিনি বললেন, কৃষক এতদিন সারের পেছনে দৌড়িয়েছে, এখন সার দৌড়াবে কৃষকের পেছনে।
২০০৭ সালের আরেকটি প্রসঙ্গের কথা বলতে হয়। সে-সময়ে বিশ্ববাজারে চালের দাম চড়া। সারাবিশ্বই খাদ্য সংকটে। চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোও নিজেদের খাদ্য চাহিদা মেটানোর কথা ভাবছে। আমরা চাল খুঁজে বেড়াচ্ছি পৃথিবীর বাজারে। সরকার ভারতের কাছ থেকে ১০ লাখ টন চাল কিনতে চাইল। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে সভা শেষে ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাকী রঞ্জন চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বললেন, সাফ বলে দিলেন, ‘আগে তো আমরা খাব, তারপর অন্যকে দেব।’ ঠিক সেই জায়গা থেকে এক যুগের মাথায় আমরা খাদ্যশস্য রপ্তানির স্বপ্ন দেখছি। এর চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে!
কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা পাল্টে দেওয়ার কাজটি শুরু হয়েছে বর্তমান সরকারের দূরদর্শী কিছু উদ্যোগের ভেতর দিয়ে। ফসলের উৎপাদন খরচ হ্রাস করার লক্ষ্যে সরকার ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত সারের মূল্য চার-দফা কমিয়ে প্রতি কেজি টিএসপি ৮০ টাকা থেকে কমিয়ে ২২ টাকা, এমওপি ৭০ টাকা থেকে ১৫ টাকা, ডিএপি ৯০ টাকা থেকে ২৫ টাকায় নির্ধারণ করেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে কৃষক পর্যায়ে ডিএপি সারের খুচরা মূল্য ২৫ টাকা থেকে কমিয়ে ১৬ টাকা করা হয়েছে। সরকারি এই উদ্যোগগুলো কৃষককে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে দিয়েছে। কৃষি উৎপাদনের ব্যয়কে কমিয়ে এনে বৈচিত্র্যময় ফসল উৎপাদনে তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। কৃষকের আত্মবিশ্বাসী উদ্যোগ, সরকারের বহুবিধ সহায়তা, কৃষি সম্প্রসারকদের নতুন তৎপরতা, গবেষক-বিজ্ঞানীদের আন্তরিক তৎপরতায় গোটা কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় আমাদের সাফল্য সারাবিশ্বেই এখন দৃষ্টান্তমূলক। খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিশ্বে আমাদের স্থান এখন দশম। ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, আলু উৎপাদনে সপ্তম, আম উৎপাদনে সপ্তম এবং পেয়ারায় অষ্টম। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ইলিশে প্রথম, মুক্ত জলাশয়ে তৃতীয়, তেলাপিয়ায় চতুর্থ, বদ্ধ জলাশয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। সকল ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যবস্থা বৃদ্ধি পাওয়ার মধ্য দিয়ে দেশীয় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির গতি যেমন বেড়েছে, একইভাবে পাল্টে গেছে গ্রামীণ জীবন ব্যবস্থা। যে কৃষক শতছিন্ন গেঞ্জি পরে মাঠে কাজ করত, সেই কৃষক এখন অনেকগুলো কাপড় পরতে পারে, তার ঘরে বৈদ্যুতিক পাখা, এমন কী ফ্রিজও ব্যবহার করতে পারে, কৃষকের সন্তান এখন লেখাপড়া শিখে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখছে। কৃষক তার সন্তানকে বিদেশে পাঠাচ্ছে। সেখান থেকে রেমিট্যান্স আসছে। সেই অর্থে আমাদের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত হচ্ছে। কৃষিকে কেন্দ্র করেই গ্রামের সঙ্গে শহরের দূরত্ব ঘুচে গেছে। গ্রামাঞ্চলে মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির সুবাদে জীবনে এসেছে নতুন ছন্দ। এগুলোর সুবাতাস সবখানে আছে বলেই মানুষ এখন স্বপ্ন দেখতে পারে। আশায় বুক বাঁধতে পারে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই কৃষি ও গ্রামীণ জীবন ব্যবস্থা উন্নয়নের প্রশ্নে তার সঠিক ও দূরদর্শী চিন্তার জন্য। আমার পেশাগত কাজের সুবাদে যতবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। সুযোগ হয়েছে দীর্ঘ সময়ব্যাপী একান্ত আলোচনা করার। সেখানে দেশের কৃষির নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দেখেছি কৃষি উন্নয়ন ইস্যুতে তার ভাবনা বেশ গভীর ও বাস্তবসম্মত। ঠিক কোন জায়গাতে গুরুত্ব দিতে হবে, এ-বিষয়ে তার যথেষ্টই সুবিবেচনা রয়েছে। আমি গত এক দশকে বেশ কয়েকবার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কৃষিভাবনা নিয়ে কাজ করতে বেরিয়েছি। বন্ধুর বহুবৈচিত্র্যপূর্ণ বর্ণাঢ্য জীবন-দর্শন ও কাজের গভীরে খুব বেশি যে পৌঁছতে পেরেছি তা বলব না, যতটুকু দেখেছি, পড়েছি, জেনেছি, তার নিকটতম তৃণমূল মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, তাতে নিশ্চিত করেই বুঝেছি, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নের পেছনে বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নের বিষয়টি ছিল সর্বাগ্রে, তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বঙ্গবন্ধুর এই চিন্তা ও দর্শনের পথ ধরেই হেঁটে চলেছেন।
২০১৯ সালের মার্চ মাসের কথা। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে নিয়ে ট্রেনে নাটোর যাচ্ছি ‘কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট’ অনুষ্ঠানে। তার ইচ্ছেতেই ট্রেন ভ্রমণ বেছে নেওয়া। তিনি প্রায় গত দেড় দশক ধরে আমাদের ‘কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট’ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকছেন। মন্ত্রী থাকাকালে প্রতি বছরই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই আয়োজনে গিয়েছেন। যা হোক, গত বছর ট্রেন ভ্রমণে তার সুদীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য জীবনের অভিজ্ঞতা এবং মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের নানা কথা নিয়ে তার একটি খোলামেলা সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ট্রেনের কামরায় তিনি ও আমি। পাশে আমার দুয়েকজন সহকর্মী ক্যামেরায় ধারণ করছে কথোপকথন। ট্রেন ছুটে চলেছে দিগন্তজোড়া সবুজ ক্ষেত ও জনপদ পেছনে ফেলে। মুহিত স্যার বললেন, শাইখ সিরাজ লক্ষ করুন, গ্রামের একটি বাড়িও আর কাঁচা কিংবা খড়ের বা বেড়ার পাওয়া যায় না। অধিকাংশই পাকা ও আধাপাকা, ওপরে টিন। এটিই তো উন্নয়নের বড় নজির। আমাদের জনজীবনে বড় একটু পরিবর্তন যে ঘটেছে, এতেই তো বোঝা যায়।
কথায় কথায় বাজেটের প্রসঙ্গ এলো। তিনি বললেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষকে বড় চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনিই প্রথম বড় অংকের বাজেট দিতে পরামর্শ দিয়েছেন। যেটি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হিম্মত লাগে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই আমাকে সেই সাহস দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, বড় স্বপ্ন না দেখলে, বড় কিছু পাওয়া যায় না। আশাও করা যায় না। স্বাধীনতার পর যে-দেশের প্রথম বাজেট ঘোষণা করা হয় ৭৮৬ কোটি টাকার। সে-দেশের বাজেটের আকার এখন ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার। সত্যিই, অর্থনৈতিক এই সক্ষমতা তো অনেক বড় অর্জনকেই নির্দেশ করে।
এ-কথা বলতেই হবে যে, বাঙালি জাতি তথা বাংলাদেশের যখন উন্নয়নের জো এসেছে, যখন প্রত্যেক মানুষ তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে জীবনের পরিবর্তন ঘটানোর জন্য সাহসী ও উদ্যমী হয়ে উঠতে শুরু করেছে, ঠিক সেই সময়ে পৃথিবীতে করোনার এই মহাবিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পৃথিবীর সব জাতিগোষ্ঠী যখন হতোদ্যম হয়ে পড়েছে, তখন আমাদের দেশের ক্ষেত্রেই সঠিক জায়গাতে আলো ফেলা হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি। ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। দেশে যখন করোনা ঢুকে পড়েছে, প্রধানমন্ত্রী তখন তৃণমূল মানুষের নিয়মিত খোঁজ রাখার কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। প্রতিদিন দেশের একেকটি জেলার সঙ্গে ভার্চুয়াল আলোচনা করে তিনি পরিস্থিতির সঙ্গে মানুষের উপলব্ধি বুঝে নিতে থাকলেন। তার পরপরই জানান দিলেন, আজকের পরিস্থিতিতে কৃষিকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের কোথাও এক ইঞ্চি জায়গা আর খালি রাখা চলবে না। কৃষি উৎপাদন করে নিজেদের খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে হবে। এমন কী পৃথিবীর অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সংকটের দিকেও তাকাতে হবে।
এ বক্তব্যের আগেই এপ্রিল মাসের ১২ তারিখে কৃষি খাতে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেন। ৪ শতাংশ সুদে তহবিল থেকে গ্রামাঞ্চলে যারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষি, পোলট্রি খামারি, ফলমূল, মসলা-জাতীয় খাদ্যপণ্য চাষিদের ঋণ নেওয়ার এই সুবিধা দেওয়া হলো। করোনা আতঙ্কের মধ্যেই এসে গেল বোরো মৌসুমের ধান কাটার তোড়জোর। কিন্তু মানুষ আতঙ্কে ও লকডাউন ঘোষণায় ঘরে বসা। শ্রমিক নেই। হাওরের ধান পেকে যাচ্ছে। এক কঠিন সময়ে সরকারি জরুরি তৎপরতায় হাওরের ধান কেটে ঘরে তোলার ব্যবস্থা করে। আগে থেকেই চলতি বোরো মৌসুমে ধান কাটতে প্রথম ধাপে ১০০ কোটি টাকার প্রায় ১ হাজার ২০৪টি কৃষিযন্ত্র বরাদ্দ দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। করোনা পরিস্থিতিতে সারাদেশেই শ্রমিক সংকট দেখা দিলে আরও ১০০ কোটি টাকার প্রণোদনা কার্যক্রমের আওতায় নতুন করে দেড় হাজার কৃষিযন্ত্র বরাদ্দ দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়।
বোরো ফসল ঘরে তুলতে তুলতেই দেশব্যাপী শুরু হয়ে যায় আরেক তৎপরতা। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নে দেশব্যাপী কৃষকের বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে সকল পরিত্যক্ত জমিতে শাক-সবজি আবাদের তোড়জোর। প্রান্তিক কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন ফসলের বীজ। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য সকল এলাকার জনপ্রতিনিধিরা নিজের উদ্যোগেও কৃষকের মাঝে বীজ বিতরণ করেছেন। এ উদ্যোগগুলোর খুবই প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে কৃষির গুরুত্ব সঠিকভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ। এবার করোনা পরিস্থিতিতে আমাদের শত সীমাবদ্ধতার ভেতরেও সরকার এ কাজটি যথাযথভাবে করে চলেছে। এটি অত্যন্ত ইতিবাচক বিষয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিষয়গুলো প্রশংসা কুড়িয়েছে। এক্ষেত্রে বর্তমান কৃষিমন্ত্রীর কৃষিবিষয়ক চিন্তা, কৃষির সকল দিক সম্পর্কে তার সম্যক ধারণা থাকার কারণে, মাঠ পর্যায়ে কাজগুলো ইতিবাচক ও তৎপরতার সঙ্গে চলছে। কৃষিমন্ত্রী বরাবরই উদার ও আন্তরিক একজন মানুষ। সংকটকালীন সময়ে সব সময় তিনি সক্রিয় রয়েছেন এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমাদের চিন্তা ও মতামত গ্রহণ করেছেন। আমি তার সঙ্গে বহু বিষয় নিয়ে আলোচনা ও মতামত দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। তার আন্তরিকতার কারণেই বিজ্ঞানী, গবেষক ও সম্প্রসারকদের মধ্যেও পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আন্তরিকভাবে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার এক অদম্য স্পৃহাও লক্ষ করা যাচ্ছে।
আসা যাক এবারের বাজেট প্রসঙ্গে। এবার বাজেটের আকার ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে করোনা পরিস্থিতিতে বিশেষ অগ্রাধিকার বিবেচনা করা হয়েছে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতকে। কৃষি মৎস্য প্রাণিসম্পদ ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ২২ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা। এই পরিমাণ গত অর্থবছরের তুলনায় ১ হাজার ৫ কোটি টাকা বেশি। মন্ত্রণালয় বিবেচনায় শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ ১৫ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ২ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা বেশি। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে এবারের বরাদ্দ ৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৬৫৬ কোটি টাকা বেশি। কৃষি মৎস্য প্রাণিসম্পদ ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে ২২ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। গত অর্থবছরে ছিল ২১ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা।
আরেকটি বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ হচ্ছে, কৃষিখামার যান্ত্রিকীকরণে ৩ হাজার ১৯৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় আগামী পাঁচ বছরে ৫৭ হাজার কৃষিযন্ত্র দেওয়া হবে কৃষককে। প্রকল্পের মাধ্যমে হাওর এলাকায় ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে এবং হাওর ছাড়া অন্য এলাকায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকিতে কৃষিযন্ত্র ক্রয় করতে পারবেন কৃষক। চাষাবাদে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদন খরচ কমানো ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। যদিও কৃষির গুরুত্বপূর্ণ উপখাত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকে এই প্রকল্পের বাইরে রাখা রয়েছে। বলতে চাই, কৃষির উপখাতগুলোতেও যান্ত্রিক এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থাগুলো যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি, এদিকে দৃষ্টি না দিলে আমরা পিছিয়ে পড়ব।
পরিশেষে সূচনার কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করতে চাই। কৃষিক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে দৃষ্টান্তমূলক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের কোনো জায়গাতেই আত্মতৃপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই, মেনে নিতেই হবে যে, সারা পৃথিবীই নতুন এক সমীকরণ কষছে, আগামী দিনগুলো নিয়ে। আমরা কোন দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? আমাদের আজকের নিশ্চয়তা, আগামী দিনের জন্য কতটা উপযোগী হবে। কোনো কিছুই নিশ্চিত করে এখন বলা যাচ্ছে না। করোনা পরিস্থিতি মানুষের সংশয় বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিদিন দেশে বেকারত্ব বাড়ছে, শহর থেকে প্রতিদিন মানুষ গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। প্রতিদিন অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে অগণিত মানুষের জীবন। ঠিক এই জায়গা থেকে কৃষির প্রতিটি উদ্যোগের সঙ্গে নিবিড় মনিটরিং অত্যন্ত জরুরি। যে দিকগুলোতে দৃষ্টি দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানাই, তা হচ্ছেÑ এক. গত করোনা পরিস্থিতিতে কৃষক ও খামারিদের জন্য প্রণোদনাসহ যে উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা। দুই. দেশে এখন বেকারত্ব বাড়ছে। অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ কর্মসন্ধানী হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে কয়েক লাখ মানুষ। তাদের সহজে কৃষিতে যুক্ত হওয়ার জন্য নানামুখী সহায়তা দিতে হবে। তিন. কৃষির পাশাপাশি কৃষির সকল উপখাতেও কারিগরিসহ সকল বিষয়ে আর্থিক ও নীতি সহায়তা বাড়াতে হবে। কৃষির উপখাতগুলোর সঙ্গে দেশের লাখ লাখ তরুণ যুক্ত রয়েছে। মৎস্য, পোল্ট্রি, দুগ্ধ খামার ছাড়াও নানাবিধ উৎপাদনমুখী খামার এখনও লাখ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারে। চার. দেশে ইতোমধ্যেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিপণ্যের বাণিজ্যিক উদ্যোগ নিচ্ছে শিক্ষিত তরুণরা। এই বাণিজ্যিক উদ্যোগের সঙ্গে সরকারি নীতি সহায়তা প্রয়োজন। যাতে এই উদ্যোগগুলো থেকে পর্যায়ক্রমে তারা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। পাঁচ. যে কোনোভাবে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। যাতে কৃষক ফসল উৎপাদনে তার উৎসাহ ধরে রাখতে পারে। কৃষককে উৎসাহিত না রাখতে পারলে কৃষিক্ষেত্রের কোনো উদ্যোগই সফল করে তোলা যাবে না।

লেখক : কৃষিবিদ ও চারণ গণমাধ্যমকর্মী

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য