Saturday, July 13, 2024
বাড়িSliderআশার আলো দেখাচ্ছে বিনা ধান-২৫

আশার আলো দেখাচ্ছে বিনা ধান-২৫

ধান মানে বাঙালির প্রাণ। হোক তা লবণ-কাঁচামরিচ দিয়েÑ দুবেলা ভাত না-হলে বাঙালির চলে না। সেই ধান উৎপাদনে মনোনিবেশ করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কারণ তিনি জানতেন কৃষক বাঁচলেই দেশ বাঁচবে।

ড. রাজিয়া সুলতানা: কমে যাচ্ছে ধানের ফলন। কৃষক দিশাহারা। কৃষিতে অনবদ্য বাংলাদেশ যেখানে ধান উৎপাদনে তৃতীয়; সেখানে শঙ্কার কালো ছায়া। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলও চিন্তিত- ভাবছে বিকল্প নিয়ে। এতদিন বোরো মৌসুমে বাম্পার ফলন দেওয়া ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ জাত আর আগের মতো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। বুড়িয়ে যাওয়া এই দুই জাতের ধানে বাড়ছে চিটা; কমছে উৎপাদন। সামান্য প্রতিকূল পরিস্থিতি হলেই ধানক্ষেতে বাসা বাঁধছে ব্রাস্ট। এমন ঘটছে গত কয়েক বছর ধরে। সরকার বিকল্প হিসেবে নানা জাতের ধানের বীজ অবমুক্ত করে চলছে। কিন্তু তাতেও হাসি ফিরছিল না। ঠিক সে-সময়ে আশার আলো দেখাচ্ছে বিনা ধান-২৫। সংশ্লিষ্টদের নিরীক্ষণোত্তর বিশ^াস, উৎপাদন মান-গুণে নতুন রেকর্ড গড়ছে এই নতুন জাতের ধান।
ধান মানে বাঙালির প্রাণ। হোক তা লবণ-কাঁচামরিচ দিয়ে- দুবেলা ভাত না-হলে বাঙালির চলে না। সেই ধান উৎপাদনে মনোনিবেশ করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কারণ তিনি জানতেন কৃষক বাঁচলেই দেশ বাঁচবে। তাই সবুজ বিপ্লবের- সেøাগান নিয়ে খাদ্য ঘাটতি কমানোর পথ খুঁজে নিতে তিনি কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন করেন। তার অনভিপ্রেত বিদায়ের পর দেশ দেখেছে সবক্ষেত্রেই অন্ধকারের কালো ছায়া। এক সমুদ্র কণ্টকপথ পেরিয়ে ২১ বছর পর তার কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই কৃষি খাতে গভীর মনোযোগ দেন। তখন দেশে খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৪০ লাখ টন। তিনি পিতার দেখিয়ে দেওয়া পথেই ছুটছেন দ্রুত গতিতে। ফলে ২০০১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ খাদ্যে নির্ভরশীলতা অর্জন করে। শুধু তাই-ই নয়; তিনি যখন ক্ষমতা ছাড়েন দেশে তখন ৪০ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত রেখে যান। আবারও বিএনপি-জামাতের চোরাবালিতে দেশ হারায় তার সঠিক গন্তব্যের মহাসড়ক। মুখ থুবড়ে পড়ে কৃষি খাত। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের সময় দেশে খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ ২৬ লাখ টন। দেশকে উন্নয়ন এবং অগ্রগতির সড়কে নিয়ে যেতে বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী আবারও কৃষি খাতকে সর্তক নজরে আনেন। তার পরিকল্পনা-নির্দেশনার পথ ধরেই ২০১৩ সালে দেশ শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতাই অর্জন করেনি, খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়েছে। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথে সরকার কৃষি খাতকে অধিকতর গুরুত্ব দিচ্ছে।
হাইব্রিড ও উফশী জাতের ধান উদ্ভাবন নতুন নয়। এর মধ্যে ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ জাতের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন এতদিন সবচেয়ে বেশি ছিল। ব্রি ধান২৮ আগাম জাতের এবং চাল মাঝারি চিকন, ভাত সাদা, ঝরঝরে ও খেতে সুস্বাদু। ঠিক একই ধরনের ব্রি ধান২৯। ফলে তৃণমূলে চাষিদের কাছে এই দুই জাতের ধানের কদর এখনও আকাশচুম্বি। ১৯৯৪ সালে অবমুক্ত হওয়া এই ধানের উৎপাদন ২০১৭ সাল থেকে বেজায় মন্দা। দীর্ঘ ৩০ বছর যাবত উৎপাদনের শীর্ষে ছিল জাত দুটি। কিন্তু সাম্প্রতিককালে তা এখন কৃষকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের মতে, বোরো মৌসুমে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জমিতে ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ আবাদ হতো। সেখানে কমে তা এখন ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। রোগ এবং উৎপাদন বিবেচনায় সরকারও এ দুটি জাতের চাষকে নিরুৎসাহিত করছে। বিকল্প হিসেবে কৃষকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান৯৬ এবং বঙ্গবন্ধু ধান১০০। তাতেও কৃষকদের উচাটন মনে আনন্দের হিল্লোল সৃষ্টি করতে পারেনি। ঠিক এ পরিস্থিতিতে নতুন ধানের জাত বিনা ধান-২৫ নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানী ড. সখিনা খানম ধানের এই নতুন জাতটি আবিষ্কার করেছেন। এই জাতের ধান আগাম পরিপক্ব। ফলন তুলনামূলকভাবে বেশি; হেক্টরপ্রতি প্রায় ৮ টন। এখন পর্যন্ত ব্লাস্ট প্রতিরোধী। ২০২১ সালে অবমুক্ত বিনা ধান-২৫ জাতটিকে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্মার্ট করবে। ধানের জাত উৎপাদন গবেষণা এদেশে নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে চলছে এর নিরন্তর গবেষণা। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সহায়তায় ব্রি ধান২৯ জাতটির বীজ জাপানে নিয়ে যায়। জাপানের এটমিক এনার্জি এজেন্সি থেকে জাতটির বীজে কার্বন আয়ন রশ্মি প্রয়োগ করে। ফলে বীজটির কৌলিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন হয়। পরিবর্তিত বীজটিকে বাংলাদেশে এনে বিজ্ঞানীরা এর সঙ্গে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সংযোজন ও বিয়োজন করে মিউট্যান্ট সারি [জগ (২)-৪০ (ঈ)-৪-২-৮] উদ্ভাবন করে। এসব প্রক্রিয়া শেষ হতে লেগে যায় প্রায় চার বছর। পরে বিনার উদ্যোগে এই সারিকে সম্প্রসারণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার উদ্দেশে ২০১৭-১৮ সালে বোরো মৌসুমে বিনার উপকেন্দ্রসমূহের মাঠে ও কৃষকের মাঠে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা হয়। ২০১৮-১৯ সালে বোরো মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের মাঠে চূড়ান্তভাবে চাষ করা হয়। ২০২০-২১ সালে বোরো মৌসুমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, ফরিদপুর ও খুলনার ১০টি অঞ্চলে কৃষকের মাঠে চাষ করা হয়। চেকজাত হিসেবে নেওয়া হয় ব্রি ধান৫০-কে। এর মধ্যে ৮টি স্থানেই নতুন জাতের ধানের ফলন চেকজাত হতে ১০ শতাংশ বেশি হয়। ১০টি স্থানের মূল্যায়ন অনুযায়ী প্রস্তাবিত জাতের গড় ফলন হয় ৭.৬৪ টন/হেক্টর এবং জীবনকাল ১৪৫ দিন। অন্যদিকে চেকজাত ব্রি ধান৫০-এর গড় ফলন ৬.৩৮ টন/হেক্টর এবং জীবনকাল ১৪৮ দিন। অতঃপর ২০২০ সালে এই জাত অনুমোদনের জন্য বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির কাছে আবেদন করা হয়। তারা তাদের কন্ট্রোল ফার্মে পরপর দুই বছর ডিইউএস (উটঝ) টেস্ট সম্পাদন করে। এখানে চেকজাত হিসেবে নেওয়া হয় ব্রি ধান৮৬-কে। প্রস্তাবিত জাতটিতে (বিনা ধান-২৫) চেকজাত হতে মোট ৫টি বৈশিষ্ট্যে স্বাতন্ত্র্যতা পরিলক্ষিত হয়, যা চেকজাত হতে সবদিক দিয়ে উন্নতমানের। চেকজাত হতে নতুন এই জাতের ধান গাছ লম্বা, ডিগপাতা সরু ও মধ্যম ধরনের, উচ্চফলনশীল, চাল বাসমতি চালের মতো লম্বা ও সরু, আগাম পরিপক্ব। বিচার-বিশ্লেষণ করে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি ২০২১ সালে এই জাতটিকে বিনা ধান-২৫ নামে অবমুক্ত করে।
২০২২-২৩ বোরো মৌসুমে বাংলাদেশের ২২টি জেলা এবং ৩৯৬টি উপজেলায় বিনা ধান-২৫ আবাদ করা হয়েছে। প্রতিটি জেলায়ই সাফল্যের মুখ দেখেছে কৃষকরা। এ জাতটিতে আধুনিক উফশী ধানের সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। সেচ ও সার কম লাগে। ব্লাস্ট প্রতিরোধী। গড় ফলন হেক্টর প্রতি ৭.৬ টন এবং সর্বোচ্চ ফলন ৮.৭ টন। ভাত সাদা, ঝরঝরে ও খেতে সুস্বাদু। অন্যান্য ধানের তুলনায় এই জাতের ধান বাজারে আগে আসায় কৃষকরা বাজারমূল্য বেশি পায়। তাছাড়া জাতটি আগাম জাতের হওয়ায় হাওড় অঞ্চলে পানি ঢোকার আগেই চাষিরা ধান কেটে ঘরে তুলতে পারবে। ফলে হাওড়বাসীর জন্য ধানটি আশীর্বাদ স্বরূপ। তাছাড়া ধানটিতে প্রিমিয়াম কোয়ালিরি সকল গুণাগুণ থাকার ফলে বিদেশে রপ্তানি উপযোগী। উল্লেখ্য, ১৯৬১ সালে ঢাকার আণবিক শক্তি কমিশনের রেডিও-ট্রেসার গবেষণাগার হিসেবে বিনার যাত্রা শুরু। ১৯৭২ সালে পরমাণু কৃষি ইনস্টিটিউটে পরিণত হওয়া প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৫ সালে ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৮২ সালে পায় স্বতন্ত্র কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে মর্যাদা। ১৯৮৪ সাল থেকে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) নামে বিভিন্ন শস্যের জাত উন্নয়ন-উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত ধানের ২৬টি জাত উদ্ভাবন করেছে।
মাতৃজাত ব্রি ধান২৯ হতে বিনা ধান-২৫ এর জীবনকাল ১৫-২০ দিন কম। চাষাবাদ পদ্ধতি অন্যান্য উফশী ধানের মতোই। যেখানে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকে না; সাধারণত বেলে দো-আঁশ এবং এটেল দো-আঁশ জমিতে এই জাতের ধান চাষ উপযোগী। অঞ্চলভেদে বীজ বপনের সময় নভেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহ হতে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ। উর্বর ও স্বল্প উর্বর জমিতে বীজতলা তৈরি করলে কোনোরূপ সারের প্রয়োজন হয় না। তবে প্রয়োজনে জমিতে সার প্রয়োগ করতে হয়। ব্রি ধান-২৯ এর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৪.২৮ টন। অন্যদিকে বিনা ধান-২৫-এর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৮ টনেরও বেশি। প্রাথমিক অবস্থায় বিনা ধান-২৫ জাত সম্পর্কে কৃষক জানিয়েছেন, বিনা ধান-২৫-এ সামান্য চিটা দেখা দিয়েছে। তবে পোকামাকড় নেই বললে চলে।
বিনার মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম বলেন, ‘বোরো মৌসুমে আগাম, উচ্চফলনশীল, রোগবালাই মুক্ত ধান উদ্ভাবন আমাদের লক্ষ্য ছিল। এটা আমরা বিনা-২৫ জাতে পাচ্ছি।’
বিনা ধান-২৫-এর উদ্ভাবক উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাকিনা খানম বলেন, ‘বিনা-২৫ ব্রি ধান২৯ অপেক্ষা ১৫-২০ দিন এবং ব্রি ধান৫০ অপেক্ষা ১০-১৪ দিন আগে পাকে। ১৩৯ দিনে এই ধান কেটে ঘরে তুলেছেন অনেক চাষি।’
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ) রবীন্দ্র শ্রী বড়ুয়া বলেন, ‘বিনা ধান-২৫-জাতটি কৃষকের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে আমরা কাজ করছি। কৃষক এই ধানের বীজ নিজেরাই সংগ্রহে রেখে চাষাবাদ করতে পারবে।’ নতুন বাজেটে গত অর্থবছরের তুলনায় কৃষি খাতে ৮৯৮ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি বলেন, ‘ফসলের উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। আমরা উচ্চফলনশীল জাতের ফসলের আবাদ বৃদ্ধি করেছি। বোরো মৌসুমে দীর্ঘ জীবনকালীন ধানের পরিবর্তে স্বল্প জীবনকালীন ধান আবাদের উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করছি, এর মাধ্যমে হেক্টরপ্রতি প্রায় ১ টন ধান বেশি উৎপাদিত হবে।’
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার জন্য নতুন নতুন জাতের কোনো বিকল্প নেই। তবে হঠাৎ করে কোনো জাত একবারে উঠিয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ অনেক। নতুন জাতের ধান চাষের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ বীজ কৃষকের হাতের নাগালের মধ্যে থাকতে হবে। সব অঞ্চলে নতুন জাতের ট্রায়াল বাস্তবায়ন করতে হবে খুবই সর্তকতার সাথে। উৎপাদিত ফসলের বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অতঃপর ধীরে ধীরে বিকল্প জাতের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনভেম্বর ৭১
পরবর্তী নিবন্ধগ্রাম-নগরের বিচিত্র সংবাদ
আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য