Sunday, July 3, 2022
বাড়িSliderআলোর পথযাত্রী

আলোর পথযাত্রী

  • শেখ হাসিনা

স্বাধীনতা-স্তম্ভে থাকবে আলোর শিখা। পরাধীনতার অন্ধকার থেকে আলোর জগতে আমরা এসেছি। স্বাধীনতার আলো-প্রতীক হচ্ছে আলোর স্তম্ভ। এই স্তম্ভের উপরে একটা শিখা থাকবে- শিখা চিরন্তন- এই প্রতীক হবেÑ মানুষের মনে এ শিখা চিরদিন প্রজ্বলিত থাকবে। দূর থেকে এই শিখা যখন মানুষ দেখবে তখন মনে হবে শিখাটা নড়ছে, খুব হালকাভাবে বাতাসে নড়ছে। অর্থাৎ এখানে প্রাণের স্পন্দন রয়েছে। মনের আবেগ-অনুভূতি, স্মৃতি যেন জেগে উঠছে, কিছু বলছে। শিখা জ্বলবে- কখনো তা নিঃশেষ হবে না। চেতনার এ অগ্নিশিখা আমাদের ভবিষ্যতের পথ দেখাবে। যে জাতি দীর্ঘদিন অন্ধকারে ডুবেছিল, সে জাতি আলোর দিশা পেয়েছে। দীর্ঘদিনের মুক্তিসংগ্রামের মধ্যদিয়ে অর্জন করেছে এক অমূল্য সম্পদ, তা হলো জাতি হিসেবে আত্মপরিচয়। এই সংগ্রামের পথ বেয়ে অর্জন করেছে স্বাধীনতা। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বহু ত্যাগ করতে হয়েছে এদেশের মানুষকে। দীর্ঘদিনের সংগ্রামে কত বোনের বাসরশয্যা স্বপ্নই রয়ে গেছে। কত মানুষের জীবনকাল কেটেছে অন্ধ কারাগারের প্রকোষ্ঠে। জীবনের স্বপ্ন হারিয়েছে চার দেয়ালের আঘাতে বিদীর্ণ হয়ে। কত সন্তান হয়েছে পিতৃস্নেহবঞ্চিত। কত মা সন্তান হারিয়ে অশ্রু ফেলেছে। তেইশটি বছর ধরে চলেছে এ সংগ্রাম। ধীরে ধীরে মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত হয়েছে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা। এই ত্যাগ, এই সংগ্রামই মানুষকে জাগ্রত করে চেতনার শিখাকে প্রজ্বলিত করেছে। বিজয় অর্জনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। কিন্তু এখানেই কি শেষ?
‘স্বাধীনতা অর্জন করা যেমন কঠিন, তা ধরে রাখা আরও কঠিন’ বলেছিলেন জাতির জনক। আমরা সত্যি হারাতে বসেছিলাম আমাদের গৌরবের সে ইতিহাসকে, বীরত্বের ইতিহাসকে। বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধ করেছে, আঘাতে আঘাতে শত্রুকে করেছে পরাজিত। জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে ষড়যন্ত্রকে করেছে প্রতিহত।
কিন্তু কোথায় সেই ইতিহাস? কোথায় সেই চেতনা? পরাজিত শক্তি উঠে এসেছিল সব গৌরবগাঁথা, বীরত্বের গাঁথাকে মুছে দিতে। বিস্মৃতির অতল গহ্বরে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে ইতিহাস। মুছে গেছে স্মৃতি, মøান করেছে গৌরবের সেই অর্জনÑ স্বাধীনতা, প্রিয় স্বাধীনতা। যেন হঠাৎ করে পাওয়া একটা কিছু যা অর্জনের মধ্যে নেই কোনো স্বপ্নÑ নেই কোনো স্মৃতি। নেই কোনো আত্মত্যাগের মহিমা। আমাদের শিশু-কিশোর তো দূরের কথা, যুবসমাজ এমনকি ত্রিশের কোঠায় যাদের বয়স তারাও জানে না, কিছুই জানে না। যা জানে তা অত্যন্ত ভাসাভাসা। যা জানে তা হলো ‘গ-গোলের বছরে’ কী যেন হয়েছিল। হ্যাঁ, এই আমাদের দুর্ভাগ্য। এভাবেই তাদের জানানো হয়েছে।
কিন্তু না, ষড়যন্ত্র সফল করতে পারে নাই। আবার সংগ্রাম, আবার রক্ত, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাবার পদক্ষেপ। জাতির চেতনাকে জাগ্রত করে সকল ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ভেদ করে জয়ী হয়েছে বাঙালি। সেই চেতনা, হারিয়ে যাওয়া চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য। শিখা প্রজ্বলিত থাকবে মানুষের মনের চেতনায়, চিরদিন চিরন্তন। দূর থেকে বহুদূরে থেকেও মানুষ যখন তাকাবে এই শিখার দিকে, তার চেতনায় মৃদু মৃদু আঘাত করবে এই শিখা, ঠিক যেন বাতাসে থিরথির করে কাঁপছে, তারই প্রতিফলন ঘটবে। মানুষের মনে, অনুভূতিতে সত্যকে জানার, অজানাকে জানার বাসনা, এভাবে মনের ভিতরে ধিকিধিকি জ্বলবেÑ জ্বলবে স্বাধীনতার ইতিহাসের স্মৃতি। তাই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতার আলোর জগতে আমাদের প্রবেশ- তারই স্মৃতি হিসেবে চিরদিন থাকবে আলোর স্তম্ভ।
স্মৃতিস্তম্ভের ভিতরে অর্থাৎ মাটির নিচে গড়ে উঠবে আর এক জগৎ, যেখানে থাকবে মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর। স্বাধীনতার ফসল জাতি ভোগ করছে, ভোগ করবে। কিন্তু এই মহৎ অর্জনের পেছনে যে ইতিহাস, সংগ্রাম, ব্যথা, অশ্রু, রক্ত, শ্রম, ঘাম তার খবর কে কতটুকু জানে? বাইরে আনন্দ, উল্লাস, উৎসব।
এই উৎসব অর্জনের পিছনে যে অবদান, ব্যথা-বেদনার কাহিনী তা কি হারিয়ে যাবে? সেই স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তৈরি হবে এই মুক্তিযুক্ত জাদুঘর। বাইরে আলোর স্তম্ভ নিয়ে যাবে অনাগত ভবিষ্যতের পানে। অন্তরে ধরে রাখবে সব স্মৃতি, ইতিহাসের স্বাক্ষর। তাই স্বাধীনতা-স্তম্ভের ভিতরে স্মৃতির জাদুঘর যেন ‘হৃদপি-’। এই স্মৃতিস্তম্ভ বুকে ধারণ করে আছে কত কথা, আর সে-কথা জানার জন্য মানুষের ঢল নামবে, স্মৃতিস্তম্ভের হৃদয়ে প্রবেশ করবে। খুঁজে ফিরবে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে। কিছুক্ষণের জন্য হলেও মানুষ চলে যাবে হারিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলিতে- যে দিনগুলির এক-একটি মুহূর্ত সৃষ্টি করেছিল ইতিহাসের এক-একটি অক্ষর। বিন্দু বিন্দু করে তৈরি হয়েছিল একটি জাতির উত্থান। তিল তিল করে গড়ে উঠেছিল সংগ্রাম, আন্দোলন।
আলোর স্তম্ভ থেকে প্রবেশ করবে জাদুঘরে। প্রথমেই পাবে আত্মপরিচয়ের ঠিকানা। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ঐতিহ্য, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্পকলার নিদর্শন। স্বাধীন সত্তা অর্জনের দীক্ষা- অর্থাৎ পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্তির সংগ্রামে মহৎপ্রাণ বাঙালির দুর্দশা, শোষণ ও বঞ্চনার কথা। বাঙালির রুখে দাঁড়াবার ইতিহাস। মুক্তি-সংগ্রামের ইতিহাস। যুদ্ধে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী, শহীদদের নামের তালিকা যতদূর সম্ভব যোগাড় করা, মুক্তিযুদ্ধে যেসব মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন তাদের আত্মত্যাগের কথা ইত্যাদি। মানুষ যখন বেরিয়ে আসবে তখন তার চেতনায় যেন এই স্মৃতিটুকু বয়ে নিয়ে যায় যে, যে-স্বাধীনতা আজ সে ভোগ করছে, দেশে-বিদেশে যে আত্মপরিচয় নিয়ে জীবন ও জীবিকার অন্বেষণে বিচরণ করছে, যে পরিচয়ে সে গৌরব অর্জন করেছে- তার পিছনে রয়েছে বীর বাঙালির বীরত্বগাঁথা এক ইতিহাস। আনন্দ ও বেদনামাখা এক গভীর অনুভূতিময় স্মৃতিÑ যা কখনো ভুলবার নয়, যা ভোলা যায় না। ভুলতে চাইলেও ভোলা যাবে না। ভোলাবার চেষ্টা করলে ইতিহাস ক্ষমা করে না। এখান থেকে এই স্মৃতি নিয়ে যখন সকলেই বের হবে তখন আমার আকুল আবেদন থাকবে ফেরার পথে আরেকবার যেন আলোর স্তম্ভের দিকে ফিরে তাকান। যদি ফিরে তাকান কী দেখবেন? দেখবেন বাঙালি জাতি আবার জেগেছে, চেতনার অগ্নিশিখা আবার প্রজ্বলিত। ধীরে ধীরে আমরা উন্নত হবো। লুপ্ত সম্মান ফিরে পাবো। সমৃদ্ধিশালী জাতি হিসেবে বিশ্বে সসম্মানে স্থান করে নেব। আলোর স্তম্ভের উপর শিখা চিরন্তন আমাদের পথ দেখাবে এগিয়ে চলার।
শিখা যেমন আকাশের পানে উঠে যাচ্ছে, আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে- আয় উঠে আয়Ñ উপরে আরও উপরে- আমরাও যাবো উপরে, থেমে যাবো না- উঠব আমরা উন্নতির শিখরে। বাঙালি জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে উন্নত জাতি হিসেবে। বিশ্বসভায় স্থান করে নেবে সম্মানের। ‘বাঙালি বীরের জাতি, কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না’Ñ বলেছিলেন জাতির জনক।
গৌরবের সে ইতিহাস হারিয়ে গেল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হারিয়ে। সেই থেকেই শুরু হয়েছিল গৌরবের ইতিহাসকে মুছে ফেলার ঘৃণ্য চক্রান্ত। কিন্তু না, পারে নাই। জেগে উঠেছে আবার এই বাঙালি- দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে, অনেক রক্ত অনেক ত্যাগের বিনিময়ে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে উদ্ধার করেছে বাঙালি। গত ২৬ মার্চ ১৯৯৭ বিশ্ববরেণ্য তিন নেতা- নেলসন ম্যান্ডেলা, ইয়াসির আরাফাত ও সোলেমান ডেমিরেল একত্রে এলেন বাংলাদেশে। এই ঐতিহাসিক স্থানে এসে দাঁড়ালেন। মনে হলো যেন ইতিহাস আবার কথা কয়ে উঠল, স্থাপিত হলো ‘শিখা চিরন্তন’। ইতিহাস চলে তার আপন গতিতে। সাধ্য কার ইতিহাসের গতি রোধ করে। প্রজ্বলিত শিখা চিরন্তন চিরদিন মানুষের মনে জাগ্রত থাকবে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে পরাজিতরা বাঙালির বিজয় মেনে নিতে পারেনি। পাকিস্তানের শাসনভার বাঙালিদের হাতে যাবে, আর সেই বাঙালি নেতার হাতে যিনি পাকিস্তানি শাসনকর্তাদের কখনো তোষামোদ, খোশামোদ করেননি- করেছেন বারবার বিদ্রোহ, ছয়-দফা দিয়ে বাঙালির স্বাধীন সত্তাকে করেছেন জাগ্রত, স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে করেছেন প্রজ্বলিত- সমগ্র বাঙালি একতাবদ্ধ যাঁর নেতৃত্বে। নির্বাচনে ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন আওয়ামী লীগ জয় করেছে- তাকে কীভাবে মেনে নেবে! ছয়-দফা বাস্তবায়ন মানেই হলো স্বাধীন বাংলাদেশ অর্থাৎ তাদের শোষণের অবাধ বিচরণ-ক্ষেত্র তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ধনসম্পদ আর লুটে খাওয়া যাবে না। কাজেই ধ্বংস করতে হবে বাঙালিকে, শুরু হলো ষড়যন্ত্র। রুখে দাঁড়ালো বাঙালি। প্রাণ দেবে, তবু মাথা নত করবে না।
ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণÑ যা দিক-নির্দেশনা দিয়েছিল জাতিকে গেরিলাযুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার নির্দেশ, বাঙালির প্রতিটি ঘরই এক-একটি দুর্গ হিসেবে গড়ে উঠেছিল। শহর-বন্দর-বাংলার মেঠোপথ-প্রান্তর পল্লীর কুটিরে-কুটিরে সর্বত্র ছড়িয়ে গেল সেই প্রিয় নেতার স্বাধীনতার স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার হৃদয় নিঃসৃত ঐতিহাসিক অবিস্মরণীয় ভাষণ।
প্রতিরোধ, অসহযোগ আন্দোলন চলল বাংলার নেতা, রাখাল রাজা, বাংলার মানুষের নয়নের মণি, প্রাণের বন্ধু বঙ্গবন্ধুর ডাকে। মূলত ভেঙে পড়ল জেনারেল ইয়াহিয়ার শাসন। বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি এক আত্মা এক প্রাণ হয়ে জেগে উঠল। বাংলাদেশের শাসনভার মূলত চলতে থাকল ৩২নং সড়কের বাড়িটি থেকে, যার তুলনা ১৯৭১-এর মার্চে বিদেশি পত্রিকায় করা হয়েছিল লন্ডনের ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটের সঙ্গে।
সমগ্র বাংলাদেশের ওপর থেকে পাকিস্তানি সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেল। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠল ইয়াহিয়া খান। শুরু করল হত্যাযজ্ঞ ২৫ মার্চ ১৯৭১, ঝাঁপিয়ে পড়ল হায়েনার মতো ঘুমন্ত বাঙালির ওপর। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর পেল ইয়াহিয়া। পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী টেলিফোনে ইস্টবেঙ্গল রাইফেলকে (বর্তমান বিডিআর) পিলখানা ফাঁড়িতে স্বাধীনতার ঘোষণা ও যুদ্ধ চালিয়ে যাবার নির্দেশ পৌঁছে দেওয়া হলো ৩২নং সড়কের বাড়ি থেকেÑ যে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে দেওয়া শুরু হলো। তাছাড়া টেলিগ্রাম ও টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমেও ঐ রাতের ভিতরে বিভিন্ন জেলায় খবর পৌঁছানো শুরু হলো। চারদিকে যেন দাবানলের মতো ছড়িয়ে গেল সে ঘোষণা। যুদ্ধ- মুক্তির যুদ্ধ। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ অস্ত্র তুলে নিল বাঙালি। ইয়াহিয়া বাহিনী ঐ রাত্রে দেড়টার সময় গ্রেফতার করল বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। প্রথমে সংসদ ভবনের নির্মাণাধীন উত্তর প্লাজার সিঁড়িতে নিয়ে বসিয়ে রাখল। ভোরের আলো যখন ফুটল, তখন নিয়ে গেল আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে। সেখান থেকে পাকিস্তান। মিয়ানওয়ালা কারাগারে বন্দিজীবন। প্রিয় দেশ, প্রিয় জনগণ থেকে বহুদূরে বন্দিজীবনে। গোপনে শুরু করেছিল বিচারের নামে প্রহসন। স্বাধীনতা ঘোষণার অপরাধে বিচার শুরু হলেও রায় কী হবে, তা ইয়াহিয়া আগেই ঠিক করেছিল। ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি’ বলেছিলেন জাতির জনক। কিন্তু হুকুম তিনি দিয়েছিলেন ‘তোমাদের যার যা-কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’ ধন্য বাঙালি ধন্য। প্রতিটি অক্ষর তারা মেনেছে। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয়টি মাস নেতার হৃদয়-নিঃসৃত সেই নির্দেশ, সেই স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা সংবলিত বাণী প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি-সাহস জুগিয়েছে। পাকিস্তানের বন্দিখানাও তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পারেনি। সেই বজ্রকণ্ঠ, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”Ñ প্রেরণা, সাহস, শক্তি ও ত্যাগের এক ইতিহাস বাঙালি সৃষ্টি করেছে। শত্রুর মোকাবেলা করেছে, আঘাতে-আঘাতে শক্তিকে পরাজিত করেছে।
এই সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। তখন ছিল রেসকোর্স ময়দান। ৭ মার্চ লাখো জনতা যে অমর বাণী হৃদয়ে ধারণ করে ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার মাঠে-ঘাটে-প্রান্তরে, দুর্গ গড়ে তুলে শত্রুকে করেছিল পর্যুদস্ত। ছিনিয়ে এনেছিল বিজয়। যে স্বাধীনতার-সূর্য অস্তমিত হয়েছিল ১৯৫৭ সালে ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে, সেই স্বাধীনতা সংগ্রামে ২৪ বছরের সাধনা, ত্যাগ-তিতিক্ষায় সংগ্রামে আত্মত্যাগে গড়ে ওঠে মেহেরপুরের আম্রকাননের মুজিবনগর সরকার। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। নেতার অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। বাংলার জনগণ ভোট দিয়ে ম্যান্ডেট দিয়েছিল আওয়ামী লীগকে, যে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেন নামে এক বাড়িতে। পলাশীর আম্রকাননে যে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, ২৩ জুন আবার সেই স্বাধীনতা অর্জনের জন্যই যেন আর এক শতাব্দীতে আওয়ামী লীগের জন্ম। এ এক অনন্য যোগসূত্র। প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো আর এক আম্রকাননে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। এই যুদ্ধে সহায়তা করতে এগিয়ে এলো পৃথিবীর অনেক মিত্রশক্তি। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ চলল। আঘাতে আঘাতে শত্রু পর্যুদস্ত হলো। বাংলার দামাল ছেলেরা মিত্রশক্তির সহায়তায় পরাজিত করল হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে। পরাজিত শত্রুদের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ বুকে ধারণ করে আছে এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। একদিন যে স্থান থেকে প্রেরণা-শক্তি-সাহস নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এদেশের মুক্তিকামী জনতা- বিজয় অর্জন করে পরাজয়ের কলঙ্ক-টিকা শত্রুর কপালে এঁকে দিল এই উদ্যানেই।
ইয়াহিয়ার ২৬ মার্চের ভাষণে শেখ মুজিবকে ইয়াহিয়ার শত্রু, বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে কঠিন শাস্তির ঘোষণা দিয়েছিল- স্বাধীনতা ঘোষণা দেবার অপরাধে শাস্তি দিয়েছিল মৃত্যুদ-। আর সেই শাস্তি কার্যকর করার জন্য যেদিন পাকিস্তানিদের যুদ্ধে পরাজয় ঘটে বাংলাদেশে এবং ওদিকে ইয়াহিয়ার পতনÑ সেই পতনের পূর্বে ফাঁসির হুকুমনামায় সই করে ইয়াহিয়া। তার পরাজয়ের জন্যও দায়ী করে বঙ্গবন্ধুকে। তাই ফাঁসি কার্যকর করার দিনও ধার্য করে দেয়। সেলের পাশে কবরও খুঁড়ে রাখে। কিন্তু বাঙালিরÑ সৌভাগ্য যেদিন ফাঁসি কার্যকর হবে তার মাত্র ঘণ্টা দুই-তিন আগে পাকিস্তান সরকারের কিছু কর্মকর্তা জেলখানা থেকে বের করে একজনের নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রেখে জীবন বাঁচায়। ইয়াহিয়া বিদায়ের আগেই মুজিবের মৃত্যুর খবর পেয়েছিল। কিন্তু খোদার কী ইচ্ছা, তা হয় নাই। ভুট্টো শাসনভার হাতে নেয়। বিশ্বনেতাদের প্রবল চাপে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
১০ জানুয়ারি আর একটি ঐতিহাসিক দিন বাংলার মানুষের জীবনে। এইদিন ফিরে এসেছিলেন জাতির জনক, তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিতে পা রেখেছিলেন। ফিরে এলেন আপন মাটিতে পরম আপনজন বাংলার মানুষের মাঝে। এসে দাঁড়ালেন এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। লাখো জনতা পাগলপ্রায় ছুটে এসেছে। এই ময়দানÑ যেখান থেকে একদিন স্বাধীনতার অমোঘ বাণী তিনি শুনিয়েছিলেন, যেখান থেকে মানুষ প্রেরণা নিয়ে গিয়েছিল, সেই জায়গায়Ñ যেখানে আত্মসমর্পণ করেছিল শত্রুবাহিনীÑ সেই মাটিতে বিজয়ের বেশে এলেন বিজয়ী জাতির পিতা। কী অপূর্ব সে প্রথম মিলনÑ মৃত্যুপুরী থেকে আপনজনদের কাছে। চোখে অশ্রু, মুখে হাসি, বুকে অব্যক্ত বেদনায় মেশা এক অনুভূতি, কণ্ঠে বিজয়োল্লাস নিয়ে দাঁড়ালেনÑ

‘সাত কোটি সন্তানেরে
হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালি করে
মানুষ করোনি।’

কবিগুরুর সেই কথা মিথ্যে করে দিয়ে বললেন বঙ্গবন্ধু : “কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা কিন্তু আজ আর বাংলার মানুষের বেলায় খাটে না। বাঙালি জাতি প্রমাণ করে দিয়েছে যে তারা মানুষ, তারা প্রাণ দিতে জানে। এমন কাজ তারা করেছে যার নজির ইতিহাসে নাই। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের কাছে প্রমাণ করেছে তারা বীরের জাতি, তারা নিজেদের অধিকার অর্জন করে মানুষের মতো বাঁচতে জানে।” চোখের পানিতে ভেসে বুক উঁচু করে আর এক কবি, জনতার কবি শোনালেন গর্বের সঙ্গে বাঙালির গৌরবের কথা, এই উদ্যানের আকাশ-বাতাসে তা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হলো।
এখানে দাঁড়ালে আজও কান পেতে শোনা যাবে সেই বাণী। এখানে দাঁড়িয়েই স্বপ্ন দেখালেন এদেশের মানুষকে দেশ গড়ার স্বপ্ন, ভবিষ্যতের স্বপ্নÑ দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার স্বপ্ন। স্বপ্নের এক বাংলাদেশÑ যেখানে দুঃখ থাকবে না, বঞ্চনা থাকবে না। সবুজ ধানের ক্ষেত মৃদু বাতাসে দুলবে। কৃষাণ-কৃষাণীর আনন্দ-উল্লাস ভরা ক্ষেত হেসে উঠবে। নবান্নের পিঠা-পায়েস ঘরে ঘরে ডেকে আনবে আনন্দমেলা, সোনার ফসল গোলায় তুলবে কৃষক। বর্গীর হামলায় কোনো গোলার ধান হারাতে হবে না। শান্তি-সুখ-সমৃদ্ধিতে গড়ে উঠবে সোনার বাংলাদেশ। ভাটিয়ালি গানের সুর ভেসে যাবে নদীর ঢেউয়ে-ঢেউয়ে। রাখালের বাঁশের বাঁশি আর সাঁঝের বেলায় নীড়ে-ফেরা পাখির কলকাকলিতে মিশে জন্ম দেবে নতুন সুর-মূর্ছনার। পলাশীর প্রান্তরে যে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, সেই স্বাধীনতা আবার ফিরে পেল বাঙালি। বিজয় অর্জন করল। বিজয়ের সাক্ষ্য বুকে ধারণ করে আছে এ জায়গা। স্বাধীনতা-স্তম্ভ বুকে ধারণ করে রাখবে শত্রুর আত্মসমর্পণের দৃশ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসবে এই স্মৃতিভরা উদ্যানে, খুঁজে পাবে সেই বীরত্বের গাঁথামালা। পাবে শিকড়ের সন্ধান। শতাব্দীর পর শতাব্দীতে এগিয়ে যাবে দেশকে ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তোলার নতুন প্রেরণায়। ‘শিখা চিরন্তন’ হৃদয়ে জাগাবে অনুপ্রেরণা আর পথ দেখাবে আলোর স্তম্ভ। এগিয়ে যাবে আলোর পথযাত্রী সোনার বাংলার পথে-প্রান্তরে।
রচনাকাল : ৪ ডিসেম্বর ১৯৯৭

লেখক : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং সভাপতি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

আরও পড়ুন
- Advertisment -spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য