Friday, February 23, 2024

আলোর পথযাত্রী মাহবুবে আলম

নূহ-উল-আলম লেনিন

ও আলোর পথযাত্রী
এ যে রাত্রি
এখানে থেমনা…।’

না আমাদের হৃদয়ের আর্তি তিনি মানলেন না। থেমে গেলেন। অথচ এখনো নিশাবসান হয়নি। দুঃসহ নিকষ অন্ধকার রাত্রি সারাবিশ্বে মাতম করে বেড়াচ্ছে। এক দুঃসাহসিক মশালচি শেখ হাসিনা যখন যুদ্ধাপরাধী দানব নিধন করে নতুন এক অরুণোদয়ের পথে বাংলাদেশকে নিয়ে যাচ্ছেন, শতাব্দীর দারিদ্র্য, দুঃখ-কষ্ট, বৈষম্য কাটিয়ে বাংলাদেশ যখন আলোর পানে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে সবাইকে কাঁদিয়ে আমাদের পথের সাথী মাহবুবে আলম মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে আত্মসমর্পণ করলেন।
অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম। দৃষ্টিনন্দন নায়কোচিত চেহারা, আকাশস্পর্শী ব্যক্তিত্ব এবং সততা ও নিষ্ঠার মূর্ত প্রতীক। মাহবুবে আলম ছিলেন বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেলÑ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা। বাংলাদেশে একটানা ১২ বছর আর কেউই এই দায়িত্ব পালন করেননি। কী-ই বা বয়স হয়েছিল তার? মাত্র ৭১। এই বৈশ্বিক কোভিড-১৯ মহামারি না হলে তারও এত তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার কথা ছিল না। রাষ্ট্রের কর্ণধার বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার বিশ্বস্ততম এবং আস্থাভাজন অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন তিনি। নেত্রীর একটি ডানা যেন ভেঙে গেল।
প্রায় ১২ বছর অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি, কিন্তু অসৎ পথে অর্থ উপার্জনের কলুষতা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তার আগেও, প্রথমবার প্রধানমন্ত্রিত্বের কালে অনেকেই বিশেষত বিক্রমপুর অঞ্চল থেকে একজনকে শেখ হাসিনা অ্যাটর্নি জেনারেলের পদের পাশাপাশি দলীয় সর্বোচ্চ ফোরামের পদ-পদবি দিয়েছিলেন। সেই ব্যক্তি নেত্রীর দেওয়া দায়িত্বের মর্যাদা ও সততা বজায় রাখতে পারেননি। মাঝপথে তাকে বিদায় নিতে হয়েছে। কিন্তু মাহবুবে আলমকে কোনো কলঙ্ক, কোনো মালিন্য স্পর্শ করতে পারেনি। সততা, নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সাথে সরকারের দায়িত্বভার পালন করেছেন।
যেমন প্রধানমন্ত্রী জীবনবাজি রেখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তেমনি তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে রাষ্ট্রের পক্ষে পরম নিষ্ঠার সাথে তার দায়িত্ব পালন করেছেন মাহবুবে আলম। ফলে তার জীবনের ওপরও জামাতি-মৌলবাদীদের পক্ষ থেকে হুমকি এসেছে। হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে ওদের হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে আইনের লড়াই অব্যাহত রেখেছেন।
বঙ্গবন্ধু-কন্যার সাথে তিনিও বাংলাদেশকে কলঙ্কমুক্ত করার কাজে অসাধারণ অবদান রেখেছেন।
বঙ্গবন্ধু সংবিধান প্রণয়ন শেষে জাতীয় সংসদে তার সমাপ্তি ভাষণে বলেছিলেন, ‘পরশ্রীকাতরতা শব্দটি বাংলা ছাড়া ইংরেজি, রুশ, চীনা ভাষাসহ অন্য ভাষায় খুঁজে পাওয়া যায় না।’ বঙ্গবন্ধুর এই উক্তির প্রতিটি অক্ষর সত্য। আমরা অভিজ্ঞতা থেকেই জানি পরশ্রীকাতর অনেকেই মাহবুবে আলমের বিরুদ্ধে নানা কানাঘুষা করেছেন। লোলুপ দৃষ্টিতে তার পদটি পাওয়ার জন্য লালায়িত ছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ভয়ে জনসম্মুখে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করার সাহস পাননি। অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে মাহবুবে আলম বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র চক্ষুশূল ছিলেন। জামাত তো মুরতাদ আখ্যা দিয়ে তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য মদত মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের দিয়েছে, উসকানি দিয়েছে। এমনকি তার অনেক সহকর্মী, যারা কেউ কেউ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন তারা এবং কেউ কেউÑ যারা সরকারি দলের প্রভাবশালী সদস্য ও সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবী ছিলেন, তারাও নানাভাবে চেষ্টা করেছেন হয় প্রধানমন্ত্রী মাহবুবে আলমকে অপসারণ করেন, নয়তো মাহবুবে আলম নিজেই পদত্যাগে বাধ্য হন। কিন্তু এসব ষড়যন্ত্র বা চাপ কোনোটিই সফলকাম হয়নি। নেত্রীর যে আস্থা তিনি অর্জন করেছিলেন তা ছিল মাথার সাথে হৃৎপি-ের সম্পর্কের মতো অপরিবর্তনীয়।
জীবনে তার একটা স্বপ্ন ছিল বিক্রমপুর অঞ্চল থেকে সাধারণ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোট করার। লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত নির্বাচনী এলাকা গত ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তিনি চষে বেড়িয়েছেন। বিপুল সাড়া তিনি পেয়েছিলেন। ভোটাররা তাকে সাদরে বরণ করে নিয়েছিল। তার জনসমাবেশগুলোতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ ভিড় জমাতো। এই অঞ্চলের মানুষ একটা পরিবর্তন চেয়েছিল; সেজন্য গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু এজন্য তাকে বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো কটূক্তি, মিথ্যা দোষারোপ ও অরুচিকর কোনো মন্তব্য তিনি করেননি। কিন্তু পরশ্রীকাতর প্রতিপক্ষ তাকে নানাভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করে। এলাকায় তার প্রবেশে বাধাদান, দলীয় ফোরামে অভব্য আচরণ এবং শারীরিকভাবে আঘাত করারও অপচেষ্টা করে। অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তার সাথে পুলিশ গার্ড এবং আওয়ামী লীগের কর্মীদের একটি বড় অংশ থাকায় তিনি সংঘাত এড়াতে পেরেছেন। তার সততা, বিনয় এবং বিপদে-আপদে, দুর্যোগে তিনি অ্যাটর্নি হওয়ার আগে থেকেই নিজ এলাকার বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতেন বলেই সাধারণ মানুষের মনের মণিকোঠায় স্থান করে নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নেত্রী বা দল তাকে মনোনয়ন দেয়নি। তিনি নেত্রীর সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন বলেই বিনা বাক্যে তা মেনে নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালনে মনোনিবেশ করেন।
আমরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হই, প্রধানমন্ত্রী এমন একজন দক্ষ, বিশ্বস্ত ও কর্মযোগী অ্যাটর্নি জেনারেলকে হারাতে চাননি বলেই তার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে তার আগমনকে উৎসাহিত করেননি। যোগ্যতা বা জনপ্রিয়তার অভাবের জন্য নয়, রাষ্ট্রের জন্য তার আরও সক্রিয় অবদান প্রয়োজন বিবেচনায়ই তাকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়নি বলে, নীতি-নির্ধারক অনেকেই আমাকে জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক পরিপক্বতা, বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে তিনি হাসিমুখে দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। এ নিয়ে কোথাও ক্ষোভ, দুঃখ বা উষ্মা প্রকাশ তিনি করেননি।
ব্যক্তি মাহবুবে আলম কেমন ছিলেন? সে-কথা বলার আগে তার রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনের প্রতি আরও একটু আলোকপাত করা যেতে পারে। ১৯৯৭ সালের আগে মাহবুবে আলম কখনও আওয়ামী লীগ করেননি। তার পিতা ও আমাদের পিতার মধ্যে সখ্য ছিল। প্রায় শতবর্ষ যাবত এই দুই পরিবারের মধ্যে একটা আত্মিক সম্পর্ক ছিল। তবুও ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে তার সাথে আমার পরিচয় ছিল না। সেবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলগুলো জেনারেল জিয়ার বিরুদ্ধে জেনারেল এমএজি ওসমানীকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করেছিলেন। মুন্সিগঞ্জ মহকুমা ও পরে ঢাকা দক্ষিণ এলাকায় ওসমানীর পক্ষে প্রচারণার জন্য প্রয়াত কোরবান আলীর নেতৃত্বে একটি দল ওই মহকুমার বিভিন্ন এলাকা সফর করে। ঐ সফরকারী দলের মধ্যে আরও ছিলেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বেগম সাজেদা চৌধুরী, প্রয়াত সংসদ সদস্য ও মুন্সিগঞ্জ মহকুমা (জেলা) আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল করিম বেপারী, ন্যাপের জেলা নেতৃবৃন্দ এবং সিপিবি-র পক্ষে আমি। ছিলেন অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম, মাহবুব ভাই তখন সক্রিয়ভাবে কোনো দল না করলেও বাম ঘরানার আইনজীবী হিসেবে আইনজীবীদের সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া মাহবুব ভাই ও আমি দোহার ও নবাবগঞ্জ থানার একাধিক জনসভায় যোগদান করি। এই সফরকালে আমাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতার সৃষ্টি হয়।
মাহবুবে আলমকে আমার মনে হলো তিনি রাজনৈতিক চিন্তার দিক থেকে নিখাঁদ সেক্যুলারিজম ও সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তার কমিউনিস্ট পার্টি বা ন্যাপ করার মতো মানসিকতা ছিল না। আবার তৎকালীন আওয়ামী লীগে যোগদানের বিষয়েও তার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। গত শতাব্দীর আশির দশকে তিনি আমার অনুরোধে কমিউনিস্ট পার্টি প্রভাবিত ‘বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন’ করতে সম্মতি জানান। তাকে যুব ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত করা হয়। তবে তিনি বেশি উৎসাহী ছিলেন আইনজীবী সমিতি নিয়ে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটও বদলে যায়। ১৯৯৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি আমরা বিপুল সংখ্যক সিপিবি-র নেতাকর্মী এবং ন্যাপ ও স্বতন্ত্র ধারার প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী আওয়ামী লীগে যোগদান করি। এবারও মাহবুব ভাই আমার অনুরোধে আমাদের সাথে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যোগদান না করলেও তিনি প্রবল উৎসাহে আওয়ামী লীগ অনুসারী আইনজীবী সংগঠনকে শক্তিশালী করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এই সময়কালে আওয়ামী লীগ অনুসারী একাধিক আইনজীবী সংগঠন ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রম গ্রহণ করে। মাহবুবে আলম এই ‘আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ’ ও ‘বঙ্গবন্ধু আইনজীবী সমিতি’কে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। শতাব্দী শেষে মাহবুবে আলম আওয়ামী লীগ তথা সভানেত্রীর মনোনয়নে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন।
প্রধানমন্ত্রী (১৯৯৬-২০০১) শেখ হাসিনা তার এই বিজয়কে স্বাগত জানান। ১৯৯৯-২০০০ সালের দিকে প্রধানমন্ত্রী তাকে একাধিকবার হাইকোর্টের বিচারপতি হওয়ার প্রস্তাব দেন। মাহবুব ভাই তখন সম্মত হননি। আমাকে তিনি বলেছিলেন, “বিচারপতি হলে তার আয়-রোজগার কমে যাবে। আমি বিচারপতি হলে যে আয় হবে তা দিয়ে মিরপুরে আমি একটি বাসভবন তৈরি করছি তা কমপ্লিট করতে পারব না। আইনজীবী হিসেবে তার তখন রমরমা অবস্থা। ২০০১ সালে লতিফুর রহমানের ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচনের পর দেশের দৃশ্যপট আবার বদলে যায়। বিএনপি-জামাত জোট বাংলাদেশকে জাহান্নামে পরিণত করে। শুরু হয় হত্যা সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক নির্যাতনের নতুন অধ্যায়। বিএনপির পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের উত্থান হয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে হামলা চালিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রথমসারির নেতৃবৃন্দকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল।
২০০১ থেকে ২০০৮-এর নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশের আইনজীবীদের সংগঠিত করে একদিকে বিএনপি-জামাত জোটের অপকর্মের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম অন্যতম অগ্রণী সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। সভানেত্রী শেখ হাসিনা কারাগারে গেলে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো পরিচালনায়ও তিনি সক্রিয় অংশ নেন। এছাড়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধাপরাধীদের গণবিচারেও মাহবুবে আলম ছিলেন অন্যতম অগ্রণী সংগঠক।
২০০৮-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর নেত্রী ২০০৯ সাল থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব দিয়ে তাকে সম্মানিত করেন। মাহবুবে আলমও নিবেদিত প্রাণ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী কর্মী হিসেবে সততার সাথে গত ১১/১২ বছর এই দায়িত্ব পালন করেন।
অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সহ-সভাপতি ছিলেন। অগ্রসর বিক্রমপুরের প্রায় সকল কর্মকা-ের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। আমাদের প্রতিষ্ঠিত বিক্রমপুর জাদুঘর, লৌহজং-এর কনকসারে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘর এবং মুন্সিগঞ্জ শহরের মালপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানপীঠ স্বদেশ গবেষণা কেন্দ্রের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। এছাড়া বিক্রমপুরের রঘুরামপুরে খনন ও একটি বৌদ্ধবিহার আবিষ্কার এবং নাটেশ্বর প্রত্নক্ষেত্রে আবিষ্কৃত বৌদ্ধমন্দির নগরীর উৎখনন সংরক্ষণ কাজেও তিনি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তারই অর্থায়নে আমরা ১ লাখ টাকা মূল্যমানের একটি পুরস্কার প্রবর্তন করেছিলাম। বস্তুত তিনি ছিলেন এই জ্ঞানালোক পুরস্কারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের অভিভাবকের মতো। অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন কোনোদিনই তার অবদানের কথা বিস্মৃত হবে না।
ব্যক্তিগত জীবনে মাহবুবে আলম ছিলেন সদালাপী, বিনয়ী, এক নির্লোভ কর্মযোগী মানুষ। এলাকার হত-দরিদ্র, গরিব-দুঃখী মানুষকে তিনি অকাতরে সাহায্য করতেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত অনেককেই তিনি দ্বিধাহীনচিত্তে প্রচুর অর্থ সাহায্য করেছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শীতকালে তিনি তার এলাকায় দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। হাত অবারিত করে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী এলাকার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠাগারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ ও চিরায়ত সাহিত্যবিষয়ক প্রচুর বই তিনি দান করেছেন। প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রতিও ছিল তার অপরিসীম দরদ। তাদের সুখে-দুঃখে রোগে-শোকেও মাহবুবে আলম দ্বিধাহীনচিত্তে পাশে দাঁড়িয়েছেন। লৌহজং-টঙ্গিবাড়ীর অনেক স্কুল, মসজিদ-মাদ্রাসা, এতিমখানার জন্য নিজের রোজগারের টাকা অকাতরে বিতরণ করেছেন। নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটেরও তিনি সদস্য ছিলেন।
অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলমের ছিল আজন্মের জ্ঞানপিপাসা। পেশাগত বইপত্র ছাড়াও তার বাংলা ক্ল্যাসিক সাহিত্য ছাড়াও সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় ছিল অবাধ বিচরণ। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তার কাছে দিশারীর মতো। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সমসাময়িক সাহিত্য-উপন্যাস, গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, কবিতা ও সংগীতের তিনি ছিলেন একজন সমঝদার পাঠক-শ্রোতা। পশ্চিমবঙ্গ বা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লেখক-শিল্পীরা ঢাকায় এলে অনেকেই তার আতিথ্য গ্রহণ করতেন। প্রচুর বই কিনতেন তিনি। তার সঙ্গে সাহিত্য-শিল্প নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনেকের বিস্ময় জাগত এবং অনেকের মনের অন্ধকার ঘুচে গিয়ে জ্ঞানার্জনের আগ্রহ সৃষ্টি হতো।
অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম একাধারে ছিলেন কর্মযোগী, জ্ঞানযোগী এবং সমাজকর্মী। তিনি সাম্প্রদায়িকতাকে ঘৃণা করতেন। অজ্ঞানতার অন্ধকারমুক্ত একটি শোষণ-বঞ্চনামুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি ছিল তার অচলাভক্তি। মাতৃভূমি বাংলাদেশে অর্থবহ মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছিল তার জীবনে ব্রত। বিরলপ্রজ নিষ্কলুষ চরিত্রের মাহবুবে আলম মানবমুক্তি সংগ্রামে তার মতো করে অংশ নিয়েছেন।
সৎ ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক মানুষের এই আকালের সময় তার চলে যাওয়া আমাদের জন্য বিরাট আঘাত স্বরূপ। দেশ হারিয়েছে তার এক শ্রেষ্ঠ সন্তানকে। ব্যক্তিগতভাবে আমি হারালাম আমার অকৃত্রিম সুহৃদ ও বন্ধুকে। আলোর পথযাত্রী মাহবুব ভাইয়ের স্মৃতির প্রতি আমাদের নমিত শ্রদ্ধা।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য