Friday, February 23, 2024
বাড়িSliderআলোকোজ্জ্বল পথে গৌরবোজ্জ্বল আওয়ামী লীগ

আলোকোজ্জ্বল পথে গৌরবোজ্জ্বল আওয়ামী লীগ

প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা মুস্তাফা সারওয়ার ১৯৭৪ সালে কাউন্সিল উপলক্ষ্যে প্রকাশিত ক্রোড়পত্রে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, “শেখ মুজিব-এর ন্যায় একজন উদ্যোগী, সাহসী ও সক্রিয় কর্মী আওয়ামী লীগের জন্মকাল থেকে ছিলেন বলেই দলটি সুপ্রতিষ্ঠা লাভ করে।”

রায়হান কবির: আগামী ২৪ ডিসেম্বর ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২২তম ত্রি-বার্ষিক জাতীয় সম্মেলন। গত ২৮ অক্টোবর গণভবনে অনুষ্ঠিত সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৪ ডিসেম্বর ২০২২ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে জাতীয় সম্মেলন সফল করতে আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে আহ্বায়ক এবং সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপিকে সদস্য সচিব করে জাতীয় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সম্মেলন উপলক্ষে ১১টি উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে দু-তিন দিনব্যাপী বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও বৈশ্বিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে এবারের জাতীয় সম্মেলন আয়োজনকে অনেকটা সীমিত করা হয়েছে। ২৪ ডিসেম্বর সকালে উদ্বোধনী পর্ব, বিকালে জাতীয় সম্মেলন এবং সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে, আওয়ামী লীগ আর পাঁচটা রাজনৈতিক সংগঠনের মতো গড়ে ওঠেনি। এই দল 
বহু ত্যাগ-সংগ্রাম বিসর্জন ও শ্রমের বিনিময়ে গণমানুষের সংগঠনে পরিণত হয়েছে। জনগণই 
আওয়ামী লীগের প্রাণ- আওয়ামী লীগের শক্তি।

গত ৭৩ বছরের ইতিহাস বিনির্মাণে এবং ইতিহাসের গতি-প্রকৃতি নির্ণয়-নির্ধারণে সর্বোপরি বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনে আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটি সম্মেলনই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেছে। বিশেষত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল মানবকল্যাণমুখী একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের জন্ম, বিকাশ, নীতি ও আদর্শ নির্ধারণ, সংগঠনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য গঠন, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ এবং চেতনা ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে জনগণকে সুসংগঠিত করে আওয়ামী লীগকে গণমানুষের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে এই সংগঠনের প্রত্যেকটি সম্মেলনই ছিল ইতিহাস বিনির্মাণের এক একটি স্তম্ভ।
১৯৭০ সালের ৪ জুন আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত সভাপতির ভাষণে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতা, নীতি, আদর্শ ও লক্ষ্যের অভিসারী।’ একইভাবে ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘চারটি আদর্শ ছাড়া রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান টিকতে পারে না। তা হলো- আদর্শ, সঠিক নেতৃত্ব, নিঃস্বার্থ কর্মী ও সংগঠন। আওয়ামী লীগের জন্ম থেকে এই চারটি ছিল বলেই আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছে, স্বাধীনতা এনেছে ও ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছে।’
আওয়ামী লীগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, যে ‘আদর্শ, সঠিক নেতৃত্ব, নিঃস্বার্থ কর্মী ও সংগঠন’ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ এদেশের সর্ববৃহৎ ও প্রধানতম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, তার গতিপথ নির্ণিত হয়েছে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনসমূহের মধ্য দিয়ে। গত ৭৩ বছরে আওয়ামী লীগের ২১টি কাউন্সিল এবং ৬টি বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২১টি কাউন্সিলে নেতৃত্ব নির্বাচন ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কর্মপন্থা প্রণীত হয়েছে। এছাড়া সময়ের প্রয়োজনে কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য আরও ৬টি বিশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে সবগুলো কাউন্সিলেই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র সংশোধন এবং বিভিন্ন দাবি, অঙ্গীকার, প্রস্তাবাবলি, নীতিমালা, কর্মপন্থা ও কর্মসূচি প্রণীত হয়েছে। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে যা আমাদের জাতিগত মুক্তির সোপান হয়ে উঠেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম; অতঃপর দীর্ঘ স্বৈরশাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট বাঙালি জাতিকে মুক্তি দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং বাঙালি জাতির ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার পর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অভিযাত্রা সব কিছুই অর্জিত হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটি কাউন্সিল অধিবেশনে বাঙালির এই সাফল্য সংগ্রামের শক্তিশালী ভীত রচিত হয়েছে।
১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে মুসলিম লীগ-বিরোধী প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের বিশেষ এক অধিবেশনে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্নে সংগঠনের নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। প্রতিষ্ঠালগ্নে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রতিষ্ঠাকালীন অধিবেশনেই খসড়া মেনিফেস্টো প্রণয়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত এবং খসড়া মেনিফেস্টোর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির সামনে আওয়ামী লীগের নীতি, আদর্শ ও অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়। প্রথম মেনিফেস্টোতে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, উদার সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করে। পরবর্তীতে যা গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ শিরোনামে সংগঠনের চার মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আওয়ামী লীগ যখন প্রতিষ্ঠিত হয় শেখ মুজিবুর রহমান সে-সময় জেলে। তখন বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলছে। যে সংগ্রামের মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিব। তাই জেলে থেকেও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা এবং বিকাশে তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল। প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা মুস্তাফা সারওয়ার ১৯৭৪ সালে কাউন্সিল উপলক্ষ্যে প্রকাশিত ক্রোড়পত্রে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, “শেখ মুজিব-এর ন্যায় একজন উদ্যোগী, সাহসী ও সক্রিয় কর্মী আওয়ামী লীগের জন্মকাল থেকে ছিলেন বলেই দলটি সুপ্রতিষ্ঠা লাভ করে।”
প্রতিষ্ঠার পর প্রথম ১৯৫৩ সালের ৩, ৪ ও ৫ জুলাই ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন। কাউন্সিলে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওই কাউন্সিলে আওয়ামী লীগকে অসাম্প্রদায়িকীকরণ, বাংলাকে রাষ্ট্রাভাষা হিসেবে স্বীকৃতি, বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার, ভাত ও ভোটের অধিকার এবং সামন্তবাদের বিনাশসহ বিভিন্ন গণমুখী দাবি ও কর্মপন্থা গ্রহণ করা হয়। এরপর ১৯৫৩ সালের ১৪ ও ১৫ নভেম্বর ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে সংগঠনকে অসাম্প্রদায়িকীকরণ, প্রদেশের হাতে অধিক ক্ষমতা হস্তান্তর এবং যুক্তফ্রন্ট গঠন ও ২১-দফা প্রস্তাব অনুমোদনসহ বেশ কিছু ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
১৯৫৫ সালের ২১, ২২ ও ২৩ অক্টোবর ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগকে অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান ঘোষণা করা হয় এবং সংগঠনের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে সংগঠনের নাম রাখা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’। কাউন্সিলে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালের ১৯ ও ২০ মে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে রাজবন্দিদের মুক্তি দাবিতে প্রস্তাব গ্রহণ, পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর খাদ্যনীতির তীব্র সমালোচনা, পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি, বৈদেশিক নীতি, দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটি গঠন, কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের দাবি উত্থাপন করা হয়।
১৯৫৭ সালের ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারীতে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতি, পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবির পুনরুল্লেখ, কেন্দ্র ও প্রদেশসমূহে সাধারণ নির্বাচন ব্যবস্থা এবং সংখ্যাসাম্য প্রতিষ্ঠার দাবিসহ প্রায় ৪০টি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ১৯৫৭ সালের ১৩ ও ১৪ জুন ঢাকার আরমানিটোলা নিউ পিকচার হাউসে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতি অনুমোদন নিয়ে দ্বিমত দেখা দেয়। প্রস্তাবটির পক্ষে ৭৭৫ কাউন্সিলর এবং বিপক্ষে মাত্র ২৫ জন ভোটদান করেন। কাউন্সিলে মওলানা ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু মওলানা ভাসানী পদত্যাগের ঘোষণা দেন। আওয়ামী লীগ কাউন্সিলের ওই সভা মওলানা ভাসানীকে তাহার পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে প্রস্তাব পাস করে এবং মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সে-সময় লন্ডনের ‘টাইমস’ পত্রিকায় আওয়ামী লীগ কাউন্সিলের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
১৯৬৪ সালের ৬, ৭ ও ৮ মার্চ ঢাকার হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল সভায় ৫ মার্চ হতে পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত বলে ঘোষণা করা হয়। কাউন্সিলে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কাউন্সিলে জনসাধারণের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পার্লামেন্ট ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নির্বাচন এবং পরিষদের প্রাধান্য স্বীকার করে একটি পূর্ণ গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন, পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রভৃতি প্রবর্তনের দাবি জানিয়ে ৩৭ প্রস্তাব গৃহীত হয়। এ সময় আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করার বহু বিরোধিতা আসে এবং বেশ কয়েকজন নেতা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে চলে যান। আইয়ুব খানের ষড়যন্ত্রে আওয়ামী লীগে ভাঙন সৃষ্টির প্রচেষ্টা চলে।
১৯৬৬ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কাউন্সিলে উপস্থিত ১,৪৪৩ জন কাউন্সিলারের ভোটে শেখ মুজিবুর রহমান উত্থাপিত ৬-দফা অনুমোদিত হয়। ১৯৬৭ সালের ১৯ আগস্ট হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগ ৬-দফা বনাম পিডিএমপন্থি দুই ভাগে বিভক্ত হলে কাউন্সিলরদের ভোটে ৬-দফাভিত্তিক গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ সময় বেশ কয়েকজন পিডিএমপন্থি নেতা ভাঙন সৃষ্টির চেষ্টা করেন।
আওয়ামী লীগকে সব সময় বহু ঘাত-প্রতিঘাত, চড়াই-উতরাই ও ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু, ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত, বাধা-বিপত্তি অত্যাচার-নির্যাতন মোকাবিলা করে সাংগঠনিক গতিশীলতা ধরে রাখতে হয়েছে। ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চলেছে সংগঠনের অভ্যন্তরেও। ১৯৫৩ ও ৫৫ সালে আওয়ামী লীগের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেওয়ার প্রশ্নে, ১৯৫৭ সালে বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে এবং ১৯৬৪ সালে দল পুনঃপ্রতিষ্ঠার সময় আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়। ১৯৫৭ সালে বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ হতে বের হয়ে ‘ন্যাপ’ গঠন করেন এবং ১৯৬৪ সালে পুনঃপ্রতিষ্ঠার সময় দলের বেশ কয়েকজন নেতা এনডিএফ-এ থেকে যান। তারপরও শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গণমুখী আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৮ সালের ১৯ ও ২০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের ৪ ও ৫ জুন হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কাউন্সিলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ, ৬-দফাভিত্তিক আন্দোলনকে দুর্বার গতি সঞ্চার, ৬-দফাভিত্তিক নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।
১৯৭২ সালের ৭ ও ৮ এপ্রিল ১১২ সার্কিট হাউস রোডস্থ তৎকালীন কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণে স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি এবং জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কাউন্সিলে শাসনতন্ত্রের মূলনীতি, অর্থনৈতিক আদর্শ ও কর্মসূচি, জাতীয়করণ ও সরকারি নিয়ন্ত্রণ, আয়কর ব্যবস্থা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, শিল্পব্যবস্থা, কৃষি-বিপ্লব, ভূমিব্যবস্থা সম্পর্কিত মেনিফেস্টো গৃহীত হয়।
১৯৭৪ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে এএইচএম কামারুজ্জামান সভাপতি এবং জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন এবং ৩ নভেম্বর কারাগারের অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এএইচএম কামারুজ্জামান ও এম মনসুর আলী নিহত হন। এরপর আওয়ামী লীগের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ নির্যাতনের স্টিম রোলার।
এরপর ১৯৭৬ সালে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবনের পর মহিউদ্দীন আহমেদ (ভারপ্রাপ্ত সভাপতি) ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী (ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাাদক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালের ৩ ও ৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়িকা করে আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। এরই মধ্যে ১৯৭৮ সালের ৩, ৪ ও ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে আবদুল মালেক উকিল সভাপতি এবং আবদুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালের ১১ আগস্ট মিজানুর রহমান চৌধুরীর ধানমন্ডির বাসায় কতিপয় নেতার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মিজানুর রহমান চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে আওয়ামী লীগ নাম দিয়ে পাল্টা কমিটি গঠন করা হয়। মিজান চৌধুরীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের অবৈধ কমিটি গঠনের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ১৯৭৮ সালের ২৩ নভেম্বর বিশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও ১১-দফা কর্মসূচি অনুমোদন হয়।
১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে এবং আওয়ামী লীগের শক্তি পুনরুদ্ধারে বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আবদুর রাজ্জাক। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা দীর্ঘ ছয় বছর নির্বাসন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলে গতিশীল হয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক রাজনীতি। কিন্তু এরই মধ্যে ১৯৮২ সালে সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক দল ত্যাগ করলে সংকট সৃষ্টি হয়। তখন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে সেই সংকট মোকাবিলা করে এগিয়ে চলে আওয়ামী লীগ।
১৯৮৭ সালের ১, ২ ও ৩ জানুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। এ সময় স্বৈরচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বে দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের নাগপাশ থেকে মুক্তি পায় বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু-কন্যার নেতৃত্বে বাঙালি জাতির ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৯২ সালের ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা সভাপতি এবং জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কিন্তু তখনও অনাকাক্সিক্ষত এক সংকটের মুখোমুখি হয় আওয়ামী লীগ; আবার সেই ভাঙনের অপচেষ্টা! ১৯৯৩ সালের আগস্ট মাসে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে ২৯ আগস্ট গণফোরাম নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন ড. কামাল হোসেন। একদিকে বঙ্গবন্ধুর খুনিচক্রের হামলা, প্রাণনাশের অপচেষ্টা, ক্ষমতাসীনদের অত্যাচার-নির্যাতন, নানা বাধা-বিপত্তি, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে সংগঠনের অভ্যন্তরেও প্রতিকূল পরিবেশসহ নানামুখী সংকট এবং পাহাড় সমান প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা।
১৯৯৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় এবং ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিলের জন্য এক বছর সময় বৃদ্ধি করা হয়। ১৯৯৭ সালের ৬ ও ৭ মে আউটার স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে জননেত্রী শেখ হাসিনা সভাপতি এবং জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
২০০০ সালের ২৩ জুন পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত বিশেষ কাউন্সিলে ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিলের জন্য এক বছর সময় বৃদ্ধি করা হয়। ২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর জননেত্রী শেখ হাসিনা সভাপতি এবং মো. আবদুল জলিল সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তথাকথিত মাইনাস টু ফর্মুলার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে নির্বাসনে পাঠাবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলে আবারও সংকটের মুখোমুখি হয় আওয়ামী লীগ। তখন আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশ্নে আপোসহীন সমর্থন জানিয়ে রাজপথে সোচ্চার হয়ে ওঠে। ফলে ব্যর্থ হয় ষড়যন্ত্রকারীদের সকল পাঁয়তারা। ২০০৯ সালের ২৪ জুলাই বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা সভাপতি এবং সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা সভাপতি এবং সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে জননেত্রী শেখ হাসিনা সভাপতি এবং ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালের ২০ ও ২১ ডিসেম্বর জননেত্রী শেখ হাসিনা সভাপতি এবং ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
গত চার দশকের বেশি সময় বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। বঙ্গবন্ধু-কন্যার কালজয়ী নেতৃত্বে অনিশ্চয়তার গিরিখাদ থেকে সাফল্যের উচ্চ শিখরে অবস্থান করছে আজকের আওয়ামী লীগ। তার দূরদর্শী ও ভিশনারি নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আজ অনেক শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু-কন্যার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের গণমুখী কর্মসূচির কারণেই বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত রাষ্ট্র থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত হয়েছে। বিশ্বসভায় বাংলাদেশ আজ আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
গত ২৮ অক্টোবর কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমরা দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি এবং কাজ করে যাব। আমার কথা হচ্ছে, আমাদের উন্নয়নের কথাগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। ঠিক তেমনি ভবিষ্যতের জন্য যে আমরা পরিকল্পনা করছি সেটাও মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে।’ বঙ্গবন্ধু-কন্যা বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ এই উপমহাদের পুরনো সংগঠন। এই সংগঠন আরও শক্তিশালী হোক। মানুষের জন্য কাজ করে তাদের হৃদয় জয় করে আমরা ক্ষমতায় এসেছি। জনগণের ভোটে এসেছি, জনগণের আস্থা নিয়ে এসেছি। সেই আস্থা আমরা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। ১৪ বছর আমরা এদেশের মানুষের আস্থা বিশ্বাস ধরে রেখেছি। আওয়ামী লীগ আরও বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এটা আমাদের মাথায় রেখেই এগিয়ে যেতে হবে। আর যারা সন্ত্রাসী, খুনি, দশ ট্রাক অস্ত্র, গ্রেনেড হামলাকারী, বোমা হামলাকারী এদের দেশের জনগণ বিশ্বাস করে না। এদের পাশেও কোনোদিন থাকবে না। এদের ভোটও দেবে না। এটাই হলো বাস্তবতা। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি এবং কাজ করে যাব। আমার কথা হচ্ছে, আমাদের উন্নয়নের কথাগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। ঠিক তেমনি ভবিষ্যতের জন্য যে আমরা পরিকল্পনা করছি সেটাও মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে।’
এদেশের যা কিছু অর্জন তা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই অর্জিত হয়েছে। তাই এদেশের জনগণের সকল প্রত্যাশা আওয়ামী লীগকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটি কাউন্সিল অধিবেশনই সংগঠনের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য এবং আত্মত্যাগের মহীমান্বিত আহ্বানকে ধারণ করে আগামীর স্বপ্ন জয়ের অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছে সব সময়। আগামী ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য আওয়ামী লীগের ২২তম কাউন্সিল অধিবেশন ঘিরেও দেশবাসীর প্রত্যাশা অনেক। দলীয় নেতাকর্মী ও জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগও সচেষ্ট। আওয়ামী লীগ সভাপতির ভাষণে উচ্চারিত হয়েছে তারই প্রতিধ্বনি। তিনি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের আগামী কাউন্সিল সাদামাটাভাবে করা হবে। বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের কারণে ব্যয় কমাতে হবে ২২তম জাতীয় সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতায়। তাই খরচ কমানোর জন্য আয়োজন হবে সাদামাটা। তিনি বলেছেন, যেহেতু বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা যাচ্ছে, ফলে এবারের সম্মেলন আমরা কোনো সান-শওকত করে করব না। খুব সীমিত পরিসরে, অল্প খরচে, সাদাসিদেভাবে আমাদের সম্মেলন করতে হবে।’
বঙ্গবন্ধু-কন্যা আওয়ামী লীগের ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের সংগঠনের অভ্যন্তরে গ্রুপিং ও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক পরিত্যাগ করে সকলকে আদর্শের পতাকা তলে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থাকলে কোনো অপশক্তিই আমাদের দলকে হারাতে পারবে না।’ তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালের ৪ জুন আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে দলীয় নেতাকর্মী এবং দেশবাসীর প্রতি যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, তারই মর্মবাণী প্রতিধ্বনিত হয়েছে। সেদিন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের ইতিহাস- বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষা আর জেল-জুলুম-নির্যাতন বরণের ইতিহাস, সংগ্রামের ইতিহাস। সে ইতিহাসের পাতায় পাতায় ছড়াইয়া আছে বহু রক্তের দাগ। সাধারণ নির্বাচনকে সম্মুখে রাখিয়া তাই আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মী ভাইদের প্রতি আমার আবেদন, এ রক্তের ডাক যেন আপনারা ভুলিয়া না যান। ভুলিবেন না, এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য কত ভাই আমাদের রক্ত দিয়াছে, কত বোন বিধবা হইয়াছে, কত মায়ের কোল শূন্য হইয়াছে, কত মানুষের সোনার সংসার ছারখার হইয়াছে। যে বন্ধুরা বুকের রক্ত ঢালিয়া কারাগার বা সামরিক ছাউনির বন্দী নিবাস হইতে আমাদের ফিরাইয়া আনিয়াছে, দেশের মানুষের দাবি আদায়ের জন্য বাংলার শহর-নগর, গ্রাম-গঞ্জের পথ-ঘাট রক্তে রঞ্জিত করিয়াছে, তাহাদের যেন আমরা ভুলিয়া না যাই। তাহাদের রক্তের সঙ্গে কেহ যেন বিশ্বাসঘাতকতা করিবার সাহস না পায়।’ [সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ৫ জুন ১৯৭০]
প্রকৃতপক্ষে, আওয়ামী লীগ আর পাঁচটা রাজনৈতিক সংগঠনের মতো গড়ে ওঠেনি। এই দল বহু ত্যাগ-সংগ্রাম বিসর্জন ও শ্রমের বিনিময়ে গণমানুষের সংগঠনে পরিণত হয়েছে। জনগণই আওয়ামী লীগের প্রাণÑ আওয়ামী লীগের শক্তি। আদর্শের জন্য এবং মাতৃভূমির স্বাধীনতা-মুক্তি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আওয়ামী লীগের যে পরিমাণ নেতাকর্মী আত্মদান করেছে পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আর কোনো রাজনৈতিক সংগঠন খুঁজে পাওয়া যাবে না। সে-কারণে আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতা-কর্মীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। ২২তম কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে লাখো শহিদের স্বপ্নস্বাদ একটি উন্নত-সমৃদ্ধ শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণকর বাংলাদেশ বিনির্মাণের সংগ্রামে আত্মনিবেদিত কর্মী হিসেবে স্বপ্নজয়ের নবতর অঙ্গীকারে উদ্ভাসিত হতে হবে।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের আসন্ন কাউন্সিল অধিবেশনের তাৎপর্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বিশেষত বৈশ্বিক মহামারি করোনা-পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী যে চরম অর্থনৈতিক সংকট ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, তার ভয়াবহ অভিঘাত মোকাবিলায় কার্যকর কর্মপন্থা নির্ধারণে আওয়ামী লীগের আসন্ন কাউন্সিল অধিবেশনকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক অগগ্রতি ধরে রাখা; ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করা এবং ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে সংগঠনের নতুন ঘোষণাপত্র প্রণীত হবে। একইভাবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন, সাংগঠনিক গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং কর্মসূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রেও সংগঠনের ২২তম ত্রি-বার্ষিক জাতীয় সম্মেলনের গুরুত্ব অত্যধিক। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলন অধিবেশন সফল হোক- এটাই জাতির প্রত্যাশা। আওয়ামী লীগের জয় হোক। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।

লেখক : গবেষণা সহকারী, উত্তরণ­

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য