Saturday, July 13, 2024
বাড়িকূটনীতিআরোপিত বিধিনিষেধে বাংলাদেশও ভুক্তভোগী

আরোপিত বিধিনিষেধে বাংলাদেশও ভুক্তভোগী

চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত বা বিশেষ সামরিক অভিযান; যা-ই বলি না কেন, তা এখন আর রাশিয়া-ইউক্রেনে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে আরও অনেকে পক্ষে বা বিপক্ষে জড়িয়ে পড়েছে।

উত্তরণ ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক বলেছেন, রাশিয়ার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও ভোগান্তি সৃষ্টি করেছে, যা মোটেও কাম্য নয়। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও এখন এর ভুক্তভোগী। এ বিধিনিষেধ কারও জন্যই সুফল বয়ে আনবে না। তারিক আহমেদ সিদ্দিক রাশিয়ায় গত ১৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত একাদশ মস্কো কনফারেন্স অন ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির দ্বিতীয় প্লেনারি সেশনে বক্তব্য রাখেন।
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজিত দিনব্যাপী এ সম্মেলনে ৭৫টি দেশ ও ৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থার ৮০০ প্রতিনিধি অংশ নেন। মস্কোর প্যাট্রিয়ট কংগ্রেস অ্যান্ড এক্সিবিশন হলে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে তাস জানিয়েছে, সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যে পুতিন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সংঘাত নিরসনে আন্তর্জাতিক মহলের সম্মিলিত প্রয়াস গ্রহণ, বাধা ও হুমকি প্রশমন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ১৫ আগস্ট মস্কো কনফারেন্স অন ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির দ্বিতীয় প্লেনারি সেশনে মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের ইংরেজিতে দেওয়া বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে তুলে ধরা হলো :

“উপস্থিত সম্মানিতজন, বিশিষ্ট অংশগ্রহণকারীরা; শুভদিন। আমরা জানি, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং উন্নয়নের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। এখানে আরও অনেক বিষয় আছে, যেগুলো বক্তব্য সংক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে আমি বাদ দিয়ে যাব, কারণ আমার আগের বক্তারা তা এরই মধ্যে বলে গিয়েছেন। ঐতিহ্যগতভাবেই যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছে এবং নিজের নেতৃস্থানীয় ভূমিকাকে ধরে রাখার উদ্দেশ্যকেও পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে সুখবর ও দুঃসংবাদ হলো সবকিছুই অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। এবং কয়েক দশক ধরে এর কেন্দ্র পাশ্চাত্য থেকে প্রাচ্যে সরে আসতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমানে তা এ অঞ্চলে অর্থাৎ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে সরে আসছে। এ কারণে অনেক বড় বড় পক্ষের চোখ এখন এ অঞ্চলে।
অন্যদিকে চীন এ অঞ্চলের অনেক দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। রাশিয়া, জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোও এখানকার অনেক দেশের সঙ্গে কার্যকর অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। পরিবর্তনশীল এ প্রেক্ষাপটে সমৃদ্ধ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন আমরা সবসময়ই বলেছি, আমরা উন্নত হচ্ছি এবং অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এমন প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। কয়েক বছরে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি প্রবাহের ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের কৌশলগত অবস্থান এবং বঙ্গোপসাগর ও অন্য কিছু প্রণালি এখন বৃহৎ বাণিজ্যপথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে।
জ্বালানি নিরাপত্তা এখন এ অঞ্চলের সিকিউরিটি ল্যান্ডস্কেপের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে নৌপথে অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান, মানবপাচার, জলদস্যুতা ইত্যাদির মতো অসামরিক হুমকি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। উপরন্তু সাগর এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু দ্বীপের ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা বা প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিরোধ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে বিদ্যমান পরিস্থিতির ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত বা বিশেষ সামরিক অভিযান; যা-ই বলি না কেন, তা এখন আর রাশিয়া-ইউক্রেনে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে আরও অনেকে পক্ষে বা বিপক্ষে জড়িয়ে পড়েছে। আমি বিশেষ করে বলব, রাশিয়ার ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের কারণে এ অঞ্চলসহ গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ভুগছে, যা আমি মনে করি মোটেও কাম্য নয়। বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটানোর পাশাপাশি বর্তমান সংকট ইউরোপীয় দেশগুলোকেও তাদের নিরাপত্তা হুমকি, বাণিজ্য নীতি ও সার্বিকভাবে শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশে বাধ্য করেছে। একই সময় ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলকেও ইউক্রেন সংকটের কারণে বড় ধরনের ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপ-অঞ্চলের প্রতি অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত মনোযোগ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য ঐতিহ্যগত অংশীদার এ অঞ্চলে তাদের তৎপরতা বাড়িয়েছে, যা এ অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জিং ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবং তারা মনে করছে অন্যান্য শক্তির বিশেষ করে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এ অঞ্চলে তাদের প্রভাব ও স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করছে। ক্রমবর্ধমান এ কৌশলগত প্রতিযোগিতা এখন এ অঞ্চলের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলোর মধ্যে এক ধরনের বিভেদের আশঙ্কা তৈরি করছে, যেখানে কেউ চীনের পাশে থাকছে আর অন্যরা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ঐতিহ্যগত অংশীদারদের সঙ্গে থাকছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ জলবায়ু পরিবর্তনের মতো নিরাপত্তার অপ্রথাগত ক্ষেত্রগুলো এখন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে সমুদ্রপৃষ্ঠের অনাকাক্সিক্ষত উচ্চতা বৃদ্ধিও। এর ধারাবাহিকতায় দেখা দিতে পারে খাদ্য, পানি ও বাসস্থানের অভাব, গণ-অভিবাসন ইত্যাদি।
অভিবাসনের কথা আসায় আমি সংক্ষিপ্তভাবে আরেকটি সমস্যার কথা বলতে চাই, যা আলোচ্য বিদ্যমান সংকট থেকে উদ্ভূত নয়, সেটি হলো মিয়ানমার থেকে আমাদের দেশে অভিবাসন। ২০১৭ সালে ১১ লাখের বেশি মানুষ আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সদয় হয়ে তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির অভিযোগে তারা পালিয়ে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী আশ্রয় দেয়ার সময় আশাবাদী ছিলেন, মিয়ানমার তাদের ফিরিয়ে নেবে। বর্তমানে এ নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু আমার উদ্বেগের জায়গা হলো, আমরা এখনও আমাদের প্রতিবেশী ও বন্ধু-দেশ মিয়ানমারের কাছ থেকে ইতিবাচক কোনো সাড়া পাইনি। উদ্বাস্তু হয়ে আসা এ জনগোষ্ঠী এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। যদিও আমরা এর উন্নয়ন ঘটানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু তারা এখন মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ বিস্তার ঘটানোর সহজ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তবে আমি এও নিশ্চিতভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কোনো আউটফিট নেই, যেটা ২০০৯ সালের আগে ছিল। এ উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী শুধু আমাদের বা মিয়ানমারের জন্য সমস্যা করবে তা নয়। এ সংকট সার্বিকভাবে গোটা অঞ্চলকেই ভারসাম্যহীন করে তুলতে পারে।
আপনারা জানেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ ও দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে, যেখানে আমাদের অনেক যন্ত্রণা ভুগতে হয়েছে। তবে সে-সময় আমাদের প্রতিবেশী ভারত আমাদের অনেক সহায়তা করেছে। এবং আমাকে অবশ্যই এ-ও বলতে হবে সে-সময়কার সুপারপাওয়ার তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের জোর সমর্থন দিয়েছে। এসব না হলে হয়তো আমরা এখনও স্বাধীন হতাম না। এ স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের জাতীয় প্রেরণার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তির অনুঘটক হিসেবেও কাজ করেছে। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তির বিষয়টি যে আমাদের বিবেচনায় থাকা উচিত, সেটিও তিনি আমাদের সংবিধানে যুক্ত করেছেন।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ‘সংঘাতের নয় সহযোগিতার’ সংস্কৃতি, শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধের সমাধান এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টেকসই শান্তি-স্থিতিশীলতার ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখেন। সব শেষে আমি বলতে চাই, বৈশ্বিক নিরাপত্তা খাতে বর্তমান পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এশিয়া প্যাসিফিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ স্থিতিশীলতা শুধু এ অঞ্চলের দেশগুলোর সমবেত-সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব। যদিও এক্ষেত্রে অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোর পারস্পরিক বিশ্বাস ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। অঞ্চল সংক্রান্ত ছোটখাটো যেসব বিরোধ রয়েছে, সেগুলো সমঝোতার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
এজন্য আমি প্রস্তাব দিচ্ছি, এশিয়া প্যাসিফিকের দেশগুলোর অভিন্ন আকাক্সক্ষার সঙ্গে সংগতি রেখে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অভিন্ন তাগিদের ভিত্তিতে কার্যকর নিরাপত্তা সহযোগিতা অর্জনে নতুন করে প্রয়াস শুরু করতে হবে। বঙ্গোপসাগর-তীরবর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন অংশগ্রহণমূলক, মুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল নিশ্চিতের ওপর জোর দিচ্ছে।” [সূত্র : বণিক বার্তা]

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য