Sunday, July 3, 2022
বাড়িউত্তরণ-২০২২দ্বাদশ বর্ষ,তৃতীয় সংখ্যা,ফেব্রুয়ারি-২০২২আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ : ফিরে দেখা

আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ : ফিরে দেখা

  • পঙ্কজ সাহা

পৃথিবীর যেখানে যতজন বাঙালি আছেন, তাদের সবার প্রাণের নেতার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শুধুমাত্র বাংলাদেশের জাতির পিতা নন, কেননা তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন এবং ভাবনাকে রোপণ করেছেন বাঙালির হৃদয়-মনে। আমার মতো একজন অকিঞ্চিৎকর বাঙালির এটা ভাবতেও ভালো লাগে যে তার জন্মশতবর্ষের সময়টাতে আমি জীবিত আছি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও প্রেরণা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কেমনভাবে এই উপমহাদেশে নতুন ইতিহাস রচনা করেছিল তা আমি ভারতের মাটিতে বসে শুধু নয়, মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে কাছে থেকে দেখার, জানার এবং উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছি এবং তা আকাশবাণী মারফত সম্প্রচার করে বহু মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিলাম। এখানে পাঠককে মনে করিয়ে দিই, ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ আবার কী! যুদ্ধ তো করছে আকাশবাণী। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমি আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের তরুণতম কর্মী। সেই সুবাদে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাতের আগে থেকে পূর্ব পাকিস্তানের নানা ঘটনাপ্রবাহ, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং তার কলকাতা তথা ভারত ভ্রমণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার অনেক ব্যক্তিগত স্মৃতি।
আমার জন্ম অবিভক্ত ভারতে বাংলার যে অঞ্চলে, সেটি এখন বাংলাদেশের এক জেলা শহর। চাঁপাইনবাবগঞ্জ। আমার মায়ের পরিবারের বসবাস ছিল সেখানে। আমার বাবার জন্মস্থান ও বেড়ে ওঠা পাবনা জেলার সাতবেড়িয়া গ্রামে। তিনি কৃতী ছাত্র হিসেবে রাজশাহী ডিভিশনে সুপরিচিত হয়েছিলেন এবং তখনকার রাজশাহী কলেজের ছাত্র ছিলেন। আমার পারিবারিক শেকড় যেহেতু আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে, তাই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে আমি স্বাভাবিকভাবেই একাত্ম হয়ে পড়েছিলাম, এবং মুক্তিযুদ্ধ আমারও যুদ্ধ- এই ভাবনা ও অনুভূতি নিয়ে আমি তখন কাজ করেছিলাম। সেই সময়ের কাজ শুধুমাত্র প্রফেশনাল কাজ ছিল না।
সেই সময় আমি যে সমস্ত অনুষ্ঠানের প্রযোজনা করতাম তা সংখ্যায় অনেক, তার কারণ ওই তরুণ বয়সের বিপুল উৎসাহ। তরুণদের নিজস্ব অনুষ্ঠান ‘যুববাণী’ প্রচার তরঙ্গে যে সমস্ত অনুষ্ঠান স্টুডিওর বাইরে গিয়ে রেকর্ড করে এনে প্রযোজনা করতে হতো, যুববাণী’র সূচনার দিন থেকে সে-সব অনুষ্ঠান প্রযোজনা করার দায়িত্ব ছিল আমার। তার মধ্যে ‘যুবজগৎ’ এবং ‘শহরের ঝলক’- এ দুটি অনুষ্ঠান ছিল সম্পূর্ণ সংবাদমূলক। বিশেষ করে, এ দুটি অনুষ্ঠানের সূত্রে আমার প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় সিনিয়র সহকর্মী উপেন তরফদারের সঙ্গে আমার নিবিড় ঘনিষ্ঠতা ও বোঝাপড়া গড়ে উঠেছিল। কোনো অনুষ্ঠান বা ঘটনার রেকর্ডিংয়ে হয় আমি যেতাম কিংবা উপেনদা যেতেন। তারপর সেই রেকর্ডিং প্রয়োজনমতো উপেনদা তার ‘সংবাদ বিচিত্রা’ অনুষ্ঠানে এবং আমি আমার অনুষ্ঠান দুটিতে ব্যবহার করতাম। কখনও কখনও ঘটনার গুরুত্ব অনুযায়ী আমরা দুজনে একসঙ্গেও যেতাম। তখন আকাশবাণীতে ডাব-এডিটিং প্রথা চালু ছিল, তাতে ফাইনাল অনুষ্ঠানটি তৈরি করার সময় একসঙ্গে ৩টি মেশিন ব্যবহার করা হতো বলে একজনের সহায়তা দরকার হতো। বিদেশে যেমন সেই সময় ‘কাট-এডিটিং’ ব্যবস্থা ছিল, অর্থাৎ টেপের প্রয়োজনীয় অংশটুকু কেটে নিয়ে বাকি অংশটা ফেলে দেওয়া হয়, আমাদের দরিদ্র দেশে তেমন ব্যবস্থা ছিল না। তাই রবিবার ছুটির দিনে যখন আকাশবাণীর স্টুডিও অনেকটাই ফাঁকা থাকত, তখন আমি উপেনদাকে ‘সংবাদ বিচিত্রা’ এডিটিংয়ে সহায়তা করতাম। উপেনদা আবার আমার অনুষ্ঠান দুটি এডিটিংয়ে তার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। এই সুবাদে আমার এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা হয়।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ
আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের মাস্টার কন্ট্রোল রুমের লাগোয়া এডিটিং রুমে একটি মেশিন ছিল, সেটির নব ঘুরিয়ে সারা পৃথিবীর নানা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শোনা যেত এবং সেই মেশিনে টেপ বসিয়ে রেকর্ড করে নেওয়া যেত। সেদিন বিকালবেলা আমার অনুষ্ঠান দুটির এডিটিং হয়ে গেছে। আমি উপেনদাকে সহায়তা করার জন্য অপেক্ষা করছি। উপেনদা ‘সংবাদ বিচিত্রা’ তৈরি করার জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ঘটনার রেকর্ডিং থেকে যে অংশগুলো নেবেন, সেগুলো বাছাই করছেন। আমি একটি বাংলা বেতার তরঙ্গে একটি বক্তৃতা সম্প্রচারিত হচ্ছে শুনে কৌতূহলী হয়ে বোঝার চেষ্টা করছি। উপেনদা আমাকে তাড়া দিলেন, তিনি তৈরি, তাকে ‘সংবাদ বিচিত্রা’ এডিটিংয়ে সহায়তা করার জন্যে। বললেন, টেপ বসিয়ে রেকর্ড করে নিলেই তো হয়, পরে শুনে নেবে। এখন আমায় হেল্প করো। টেপ বসিয়ে রেকর্ডিংয়ে দিয়ে উপেনদাকে সহায়তা করলাম। ‘সংবাদ বিচিত্রা’ এডিটিং হয়ে গেলে সেই রেকর্ডিং চালিয়ে বুঝলাম পূর্ব পাকিস্তানের সম্প্রচার। মনে পড়ে গেল, আজ তো ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের সভা আছে। তখনও আমরা বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বরের সঙ্গে তেমন পরিচিত নই। কিন্তু শুনতে গিয়ে মনে হলো এ নিশ্চয়ই সেই সভা। ব্যস্ত হয়ে উপেনদাকে ডাকলাম। আমরা দুজনে একসঙ্গে শুনে বুঝলাম না জেনে, না বুঝে, খেলার ছলেই যেন আকস্মিকভাবে এক অসাধারণ ব্রডকাস্টিং মেটিরিয়াল রেকর্ড করে ফেলেছি। উপেনদা বললেন, এই রেকর্ডিংটা পাবার পরে তো, এখন যে ‘সংবাদ বিচিত্রা’ তৈরি করলাম, সেটা দেবার কোনো মানে হয় না। এটা দিয়ে নতুন করে করতে হবে। বিদেশি বেতারের সম্প্রচার রেকর্ড করে ‘সংবাদ বিচিত্রা’য় প্রচার করা যাবে কি না, তার অনুমতির জন্যে উপেনদা তখনকার স্টেশন ডিরেক্টরকে ফোন করলেন, রবিবার ছুটির দিন। তাকে বাড়িতে পেলেন না, তখন মোবাইলের যুগ নয়। সহকারী স্টেশন ডিরেক্টর বিমান ঘোষকেও উপেনদা বাড়িতে পেলেন না। দ্বিধায় পড়ে গেলেন তিনি। আকস্মিকভাবে এত অসাধারণ মেটিরিয়াল হাতে; কিন্তু বিনা অনুমতিতে দেওয়া ঠিক হবে কি না। আমি বললাম, এই বক্তৃতা দিয়েই তুমি নতুন করে যে ‘সংবাদ বিচিত্রা’ করবে ভাবছ, তা-ই করো। পরে আপত্তি হলে আমার ওপর দায়িত্ব দেবে, বলবে, আমি তোমাকে চাপ দিয়েছি। অফিস বুঝবে আমি অনভিজ্ঞ, তোমাকে ভুল পথে চালিত করেছি। আমি দায়িত্ব স্বীকার করব। চাকরি গেলে আমার চাকরি যাবে। বয়স কম আমার, একটা কিছু ঠিক জুটে যাবে। তুমি ফ্যামিলিম্যান, তাই দায়িত্ব¡ আমি নিচ্ছি। কিন্তু রেকর্ডিংয়ে বক্তৃতার খানিকটা অংশই তো এসেছে। তাতে তোমার ‘সংবাদ বিচিত্রা’র পুরো সময়টা তো ভরবে না। উপেনদা ভেবে বললেন, তিনি সংগীতশিল্পী অংশুমান রায়ের কণ্ঠে একটি গান ক’দিন আগে শুনেছেন, সেই গানটি এই বক্তৃতার সঙ্গে খুব সুন্দর যাবে। বললেন, অংশুমানকে ডাকছি, গানটা শোনো। অংশুমানদা এলেন। আকাশবাণীর ক্যান্টিনে টেবিল বাজিয়ে গানটি শোনালেন। অসাধারণ উপযুক্ত মনে হলো গানটি। উপেনদা বললেন, আমার মাথায় আইডিয়া এসেছে, এই গানটির একটি অংশ আর শেখ মুজিবের বক্তৃতার খানিকটা অংশ। আবার খানিকটা গান, খানিকটা বক্তৃতা এইভাবে নেব। তাতে ডিউরেশনও মেকআপ হবে, চলো, রেকর্ড করে নিই গানটা। স্টুডিওতে গিয়ে অংশুমানদার কণ্ঠে সেই গান রেকর্ড করা হলোÑ “শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি আকাশে-বাতাসে ওঠে রণি, বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ।” তারপর তার পরিকল্পনামতো উপেনদা ‘সংবাদ বিচিত্রা’ সেদিন নতুন করে তৈরি করলেন। আমি যথারীতি উপেনদাকে সহায়তা করলাম। এক ঐতিহাসিক বক্তৃতাকে কেন্দ্র করে আরেক ইতিহাস যে তৈরি হচ্ছে, সেদিন তা বুঝিনি। আজ তো ইতিহাসের পাতায় সব লেখা হয়ে গেছে। প্রায় খেলাচ্ছলে করা একটা রেকর্ডিং যে এইভাবে কাজে লাগবে এবং ইতিহাস তৈরি করবে, তা ভাবতে এখনও বিস্ময়বোধ হয়। কিন্তু প্রযোজক হিসেবে উপেনদার জহুরির চোখ বড় কথা। ওইভাবে অংশুমানদার গানটির কথা মনে করে, তাকে ডেকে পাঠিয়ে সেই গান রেকর্ড করে এমন অব্যর্থভাবে ব্যবহার করেছিলেন বলেই সে অনুষ্ঠান ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। আমি যে ঘটনাচক্রে ওইভাবে জড়িয়ে ছিলাম, তা ভাবতে এতদিন পরে শুধু ভালো লাগে না, গর্ববোধ করি। এটাকে খুব বড় ভাগ্যলিখন বলে মানি।
১০ জানুয়ারি ১৯৭২, ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২
১০ জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন এবং ১৯৭২-এর ৬ ফেব্রুয়ারি তার কলকাতায় আসার দিন। এই দুটি দিনের স্মৃতি আমার মনে এক সুতোয় গাঁথা হয়ে আছে। ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় এসে বঙ্গবন্ধু ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কলকাতায় ছিলেন। এক সুতোয় গাঁথা হয়ে থাকার কারণটি বলি।
১০ জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে ফেরেন স্বাধীন বাংলাদেশে। এই যাত্রাপথে বঙ্গবন্ধুর কলকাতায় একবার নামবার কথা হয়েছিল এবং তার জন্যে সমস্তরকম প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। তাকে দেখবার জন্যে দমদম বিমানবন্দরে বিপুল জনসমাগম হয়েছিল। এসব কথা এখন কারও স্মৃতিতে আছে কি না জানি না; কিন্তু আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। যাদের স্মৃতিতে থাকতে পারত, সেইসব মানুষ বয়সের কারণে এখন আর জীবিত নেই; কিন্তু আমি তখন নেহাতই এক তরুণ বাংলাদেশপ্রেমী বেতার সাংবাদিক ছিলাম বলে আশ্চর্য স্মৃতির ভা-ার নিয়ে জীবিত আছি। আকাশবাণীর তরুণ কর্মী হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমি বাংলাদেশ সংক্রান্ত অনুষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলাম। তাই আমাকে বলা হলোÑ দমদম বিমানবন্দরে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর কলকাতায় নামার বিষয়টি নিয়ে অনুষ্ঠান করতে। বিমানবন্দরে পৌঁছে দেখলাম, মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা দেবার জন্যে, মাইক ইত্যাদি প্রস্তুত। ধীরে ধীরে লোক জমতে শুরু করল এবং ক্রমে এক বিশাল জনসমাগমে পরিণত হলো। স্লোগান উঠতে শুরু করল- ‘শেখ মুজিব ফিরে এসো, ফিরে এসো, জয় শেখ মুজিব, জয় বাংলা’ ইত্যাদি। তখন আমরা আউটডোর রেকর্ডিংয়ের জন্য সোনি রেকর্ডার কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে যেতাম। আমি দ্রুত সেই জনতার মধ্যে গিয়ে তাদের ছোট ছোট মন্তব্য, মতামত, সাক্ষাৎকার রেকর্ড করতে লাগলাম। সকলেই বললেন, তারা অধীর হয়ে আছেন, কখন শেখ মুজিবকে দেখতে পাবেন, তাকে সম্মান জানাতে পারবেন। তখন বঙ্গবন্ধু নামটি এখানে তেমন প্রচলিত হয়নি। সেই রেকর্ডিং পরিক্রমায় ধরা পড়ল, অনেকে এসেছেন অনেক দূর দূর থেকে, অনেকক্ষণ তারা অপেক্ষা করছেন। বঙ্গবন্ধু যে বেঁচে আছেন তা অনেকে ভাবতেই পারেননি। তাই তাকে চোখে একবার দেখার জন্য সবাই ব্যাকুল হয়ে আছেন। অনেকের হাতে ফুলের মালা, অনেকের হাতে ধরা হাতে লেখা পোস্টারÑ ‘শেখ মুজিব ফিরে এসো’, ‘জয় বাংলা’, ‘শেখ মুজিব দীর্ঘজীবী হোন’। সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। আমি যখন সমবেত জনতার মধ্যে ঘুরে ঘুরে রেকর্ডিং করছি, তখন এক ভদ্রলোক আমাকে চিৎকার করে ডেকে বললেন, আপনি আকাশবাণী থেকে তো? আপনি এখুনি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল রুমে ছুটে যান। একটা জরুরি মেসেজ আসবে, সেটা আপনাকে রেকর্ড করতে হবে। আমি বললাম, আপনি চলুন, আমি জায়গাটা চিনি না। আপনার পিছন পিছন আমি যাচ্ছি। তাকে অনুসরণ করে গ্রাউন্ড কন্ট্রোল রুমে পৌঁছানোমাত্র আমাকে বলা হলো, রেকর্ডিং অন করে রাখুন। যে কোনো মুহূর্তে মেসেজ আসবে। কার মেসেজ, কোথা থেকে আসবে, কিছুই বুঝতে পারছি না। মেশিন অন করে দাঁড়িয়ে রইলাম। সেখানে তখন অসম্ভব উত্তেজনা ও কর্মতৎপরতা চলছে। একটু পরেই শুনতে পেলাম সেই অবিস্মরণীয় জলদগম্ভীর, স্বর্গীয় কণ্ঠস্বর। যে কণ্ঠস্বর তখন আমাদের খুব চেনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠ ভেসে আসছে আকাশ থেকে। স্পিকারের কাছে মাইক নিয়ে গিয়ে রেকর্ড করলাম। বঙ্গবন্ধু বলছেন, “ভাইবোনেরা, বন্ধুরা, আপনারা কলকাতা বিমানবন্দরে আমার জন্যে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন। আপনাদের জানানো হয়েছে, আমি দেশে ফেরার পথে কলকাতায় নামব, আপনাদের সঙ্গে দেখা করব। আপনাদের কিছু বলব। তাই আপনারা আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু এখন কলকাতার আকাশে এসে আমার ইচ্ছে হচ্ছে, আমি সবার আগে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আমার স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করতে চাই। তাই আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইছি, আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন। কিন্তু আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, প্রথম সুযোগেই কলকাতাতে এসে আপনাদের সঙ্গে দেখা করব। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধে আপনারা কলকাতার, পশ্চিম বাংলার, ভারতের মানুষ আমার দেশের দুঃখী মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যেভাবে আপনারা আমাদের সাহায্য করেছেন, তার জন্যে স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের কাছে চিরঋণী। স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ থেকে আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা জানাই। জয় বাংলা।”
রেকর্ডিং করা এই ঐতিহাসিক আকাশবার্তা কাঁধে নিয়ে আমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। গ্রাউন্ড কন্ট্রোল রুমে তখন সব উত্তেজনা, সব কর্মব্যস্ততা যেন থেমে গেছে। সবাই চুপ করে আছেন। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বরে, তার আকাশবার্তায় যা শুনলাম, তার রেশ যেন কাটতেই চায় না। বঙ্গবন্ধুর দেশের প্রতি ভালোবাসা কতটা গভীর, তা এই বার্তায় স্পষ্টভাবে ফুটে আছে। সবার আগে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করতে চান।
বাইরে বেরিয়ে এসে মঞ্চের মাইকের সামনে রেকর্ড করা বঙ্গবন্ধুর বার্তা বাজিয়ে শোনালাম। সমবেত জনতা হতাশ হলেন; কিন্তু তারা অসন্তুষ্ট হলেন না। শেখ মুজিব দীর্ঘজীবী হোন, জয় বাংলা ধ্বনি উঠল। কিন্তু তার মধ্যে হতাশাও ফুটে উঠল। আমি সেই জনতার মধ্যে নেমে পড়ে তাদের হতাশাকে নানা প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে রেকর্ডারে ধরে রাখলাম। সেদিন সন্ধ্যায় একটি বিশেষ অনুষ্ঠান হিসেবে সবটাই প্রচার করলাম। নাম দিয়েছিলামÑ ‘প্রত্যাশা ও হতাশা’। বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক আকাশবার্তা ছিল ওই অনুষ্ঠানে।
যে জনসমাবেশ দেখতে পাচ্ছিলাম, তার ধারাবিবরণী রেকর্ড করেছিলাম। সমবেত জনম-লীর অনেকের মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া রেকর্ড করেছিলাম। সেসব অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল অনুষ্ঠানে। সবচেয়ে বড় কথা, বঙ্গবন্ধুর ওই ভরাট আবেগময় কণ্ঠে আকাশবার্তা ছিল অনুষ্ঠানটিতে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বিমানযাত্রার মধ্যেই তৎকালীন নেতা সিদ্ধার্থশংকর রায় বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেন কলকাতায় নামতে। তিনি তাকে বলেন, আপনাকে দেখার জন্য কলকাতার মানুষ ব্যাকুল হয়ে আছে। এই অনুরোধ পাঠানোর পর সরকারিভাবে আমরা জানতে পেরে বিমানবন্দরে ছুটে গিয়েছিলাম।
কলকাতার আকাশে এসে বঙ্গবন্ধু তার বার্তায় যে কথা দিয়েছিলেনÑ তিনি প্রথম সুযোগেই কলকাতায় আসবেন, সে-কথা রেখেছিলেন। সেই ১৯৭২-এর ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় এলেন তিনি। চারদিকে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনাÑ বঙ্গবন্ধু কলকাতায়। ৬ তারিখ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত তিনি কলকাতায় ছিলেন। এটাই বঙ্গবন্ধুর প্রথম বিদেশ সফর। পাকিস্তান জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি লন্ডন থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সময় অবশ্য দিল্লি হয়ে এসেছিলেন। সেই সময় দিল্লিতেই ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়। অবশ্য লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরুর আগে ওই বিমানবন্দরেই টেলিফোন করে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রথমে আধ ঘণ্টা এবং পরে প্রায় এক ঘণ্টা কথা বলেন, নানা বিষয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করেন। বঙ্গবন্ধু তখন হিথরো বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে অবস্থান করছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে কলকাতায় আনলাম। আমরা গেলাম ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। গড়ের মাঠে তাকে বিপুলভাবে সংবর্ধনা দেওয়া হলো। জনসমুদ্র হয়ে গিয়েছিল গড়ের মাঠ। বঙ্গবন্ধু ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে গড়ের মাঠে আসার অনেক আগেই আকাশবাণী থেকে আমরা সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি আকাশবাণী মারফত লাইভ সম্প্রচার করা হয়। এই লাইভ ব্রডকাস্টে ধারাবিবরণী দেবার জন্যে দুই প্রবাদপ্রতিম বেতার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আমি ছিলাম। ওই দুই ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র এবং দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন রেডিওর যুগ। পৃথিবীর নানা দেশের বেতারের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বেতারের ধারাবিবরণী দেবার জন্যে খুব বড় একটি উঁচু মঞ্চ তৈরি করে নেওয়া হয়েছিল। ওই উঁচু থেকে অনেক দূর পর্যন্ত জনসমাবেশ আমরা খুব ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম। মঞ্চটি আবার মূল বক্তৃতা মঞ্চের কাছেই এমনভাবে করা হয়েছিল, যাতে আমরা বঙ্গবন্ধু, ইন্দিরা গান্ধীসহ সমস্ত ভিআইপিকে ভালোভাবে দেখতে পাই। সেখানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর জোরালো কণ্ঠস্বর মাইক্রোফোনের মাধ্যমে যেমন আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম, আবার এমনিও শোনা যাচ্ছিল। সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ধারাবিবরণী দেবার সময় পৃথিবীর এত দেশের ভাষা একসঙ্গে শুনতে পাচ্ছিলাম, যা আগে কখনও শোনার অভিজ্ঞতা হয়নি। কলকাতায় তখন টেলিভিশন আসেনি, আসার কোনো কথাও হয়নি। দিল্লিতে ছিল অবশ্য টিভি। বাংলাদেশে কিন্তু অনেক আগেই টিভি এসে গেছে। ময়দানে সভাস্থলে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ওবি ভ্যান এসেছিল বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সংবর্ধনা লাইভ টেলিকাস্ট করার জন্য। অনুষ্ঠান শুরুর আগে সেই ওবি ভ্যানের ভেতরে গিয়ে টেলিভিশনের কাজ কীভাবে হয় তা খুব কৌতূহল নিয়ে দেখে এসেছিলাম। তখন ভাবতে পারিনি কয়েক বছর পর কলকাতায় টেলিভিশন এলে সেটাই হবে আমার প্রায় সারাজীবনের প্রফেশন। বঙ্গবন্ধুর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের সঙ্গে আমার ভবিষ্যৎ পেশাজীবনের যেন এক যোগসূত্র তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু সেদিন তার মহতী সংবর্ধনা সভায় যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা নানা জায়গায় মুদ্রিত আছে। পরের দিন সংবাদপত্রগুলোতে বিস্তারিত ছাপা হয়েছিল। কিন্তু একটি বিষয় আলাদা করে কোথাও উল্লেখ করা হয় না, সেই বিষয়টিকে আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।
বঙ্গবন্ধু সেদিন তার বক্তৃতার মধ্যে তার উদাত্তকণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার অংশবিশেষ বললেন। দর্শকম-লী খুব প্রীত হয়ে হাততালি দিলেন। কিছুক্ষণ বক্তৃতা চলার পরে দর্শক-শ্রোতারা বললেন, মুজিব সাহেব, আরেকটা কবিতা বলুন, আরেকটা কবিতা। বঙ্গবন্ধু একটু হেসে তাদের আরজি মঞ্জুর করেন, তার স্মৃতি থেকে রবীন্দ্রনাথের আরেকটা কবিতা শোনালেন। একটু পরেই আবার সমাগত জনতা আবদার করল মুজিব সাহেব, আবার কবিতা বলুন, আরেকটা কবিতা। বঙ্গবন্ধু তখন জনতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কবিতা শুনতে চান আপনারা, আচ্ছা তাহলে রবীন্দ্রনাথের এই লাইনগুলো বলি, বলে তিনি তার স্মৃতি থেকে আরেকটি কবিতার অংশবিশেষ শোনালেন। তার বক্তৃতা চলার সময় জনতা মাঝে মাঝেই আবদার করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে কবিতা বলার জন্য, বঙ্গবন্ধু প্রত্যেকবার হেসে শ্রোতাদের আবদার বা দাবি মঞ্জুর করেছিলেন। তিনি তার স্মৃতি থেকে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন কবিতার অংশবিশেষ শোনাচ্ছিলেন। লক্ষ করছিলাম যে, সব কবিতাই তিনি তার স্মৃতি থেকে বলছেন, সব কবিতাই রবীন্দ্রনাথের। রবীন্দ্রনাথ যে তার জীবনের খুব বড় প্রেরণার স্থান দখল করে আছেন, তা বুঝতে পারছিলাম। উপলব্ধি করছিলাম কবিতার প্রতি তার গভীর ভালোবাসাও। বোঝা যাচ্ছিল যে, ঝোড়ো রাজনীতির মধ্যে তার জীবন কেটেছে কিন্তু তবু তার মনকে তিনি রেখেছেন রসসিক্ত। বঙ্গবন্ধু যখন সভার শ্রোতাদের অনুরোধে কবিতা শোনানোর সময় তার বক্তৃতার সেই মুহূর্তের বিষয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে কবিতা তৎক্ষণাৎ নির্বাচন করছিলেন। সেইসব কবিতার খ-াংশ তার বক্তব্যকেই যেন আরও পরিস্ফুট করে তুলছিল।
ইন্দিরা গান্ধী এবং বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা আরম্ভের আগে আমাদের ধারাভাষ্য বা রানিং কমেন্ট্রি করেছি। বঙ্গবন্ধুর সেদিনের অসাধারণ ঐতিহাসিক ভাষণের পরে সমাগত বিপুল জনতা হাততালিতে চারদিক মুখরিত করে তুলল। আমার জীবনের এ এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা শেষ হতেই আকাশবাণীর এক গাড়িচালক আকাশবাণীর মুক্তিযুদ্ধ সময়ের স্টেশন ডিরেক্টর দিলীপ সেনগুপ্তর পাঠানো একটি চিরকুট আমার হাতে ধরিয়ে দিল। তিনি আমাকে জরুরি তলব করেছেন। আকাশবাণী ভবনে ফিরে তার ঘরে যেতেই তিনি বললেন, তোমাকে ডেকে পাঠালাম, কেননা সিদ্ধান্ত হয়েছে, দিল্লিতে ভারত-বাংলাদেশ দুই সরকারের সম্মতিতে ঠিক হয়েছে, আজ কলকাতায় সফররত শেখ মুজিবুর রহমানকে সম্মান জানানোর জন্যে আকাশবাণী কলকাতা থেকে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হবে। সেটি বাংলাদেশ বেতার রিলে করবে। তার মানে দুই দেশের দুই প্রধান বেতার কেন্দ্র থেকে অনুষ্ঠানটি একই সঙ্গে সম্প্রচারিত হবে। হাতে সময় খুব কম। দ্রুত একটা মনে রাখার মতো অনুষ্ঠান করতে হবে। তাই তোমাকে ডেকে আনলাম। তোমাকেই করতে হবে এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি। এক্ষুনি লেগে পড়ো। বুঝলাম, আমার সামনে একটা খুব বড় চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়াল। মনে মনে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম। সঙ্গে সঙ্গে মাথায় খেলে গেল অনুষ্ঠানটির একটি নাম, ‘শেখ মুজিবের বাংলাদেশের প্রতি’। ঠিক করলাম, ইতিহাস, বিজ্ঞান, নাটক, চলচ্চিত্র ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা এই বাংলার প্রধান, তাদের নিয়ে অনুষ্ঠান করব। এক এক করে সবাইকে ফোনে যোগাযোগ করে কাঁধে সোনি সাউন্ড রেকর্ডার নিয়ে যখন বেরোচ্ছি, তখন দেখি আকাশবাণী ভবনের ফ্লোরে শম্ভু মিত্র দাঁড়িয়ে আছেন। নাটকক্ষেত্রে তাকেই ঠিক করেছি, ফোনে কথা হয়ে গেছে তার সঙ্গে যে আমি তার কাছে রেকর্ডিং করতে যাব। শম্ভু মিত্রর কাছে গিয়ে বললাম, এ কী শম্ভুদা, আপনি এখানে! আমি তো আপনার কাছেই রেকর্ডিং করতে যাচ্ছি। শম্ভু মিত্র বললেন, আজ কি তোমার যাবার দিন, না আমার আসার দিন! বঙ্গবন্ধু কলকাতায়, কলকাতায় যেন এক উৎসব, সবার মন ফুরফুরে, সবার মনে আনন্দের একটা সুর বাজছে। মনে হচ্ছে যেন এক দেওয়াল ভেঙে গেছে, দুই বাংলা এক হয়ে গেছে। শম্ভু মিত্রর কথায় আজকের আবেগ, আজকের মনোভাব ফুটে উঠল। শম্ভু মিত্রকে স্টুডিওতে নিয়ে গিয়ে রেকর্ড করলাম। তিনি বাংলাদেশ সৃষ্টিকে ইতিহাসের এক বিরাট ঘটনা বলে বর্ণনা করলেন। এই জয় সার্বিকভাবে বাঙালির জয়Ñ এ-কথা বললেন তিনি। বললেন, এখন দুই বাংলার শিল্প সাহিত্য নাটক চলচ্চিত্র এসব ক্ষেত্রে আদান-প্রদান শুরু হওয়া খুব দরকার। সেদিন সত্যজিৎ রায় কলকাতায় ছিলেন না। সম্ভবত বিদেশে ছিলেন। তাই চলচ্চিত্র থেকে মৃণাল সেনকে ঠিক করেছিলাম। মৃণাল সেন বললেন, চারদিকে এমন একটা পরিবেশ, এমন একটা মনোভাব সবার মধ্যে যে দুই বাংলা যেন এক হয়ে গেল। কিন্তু বাস্তব তো তা নয়। তিনি বললেন, ভারত ভেঙে দুটি দেশ হয়েছিল। এখন এই উপমহাদেশে দুটি থেকে ভেঙে ৩টি দেশ হলো।
মৃণাল সেনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছুটলাম বিরাট সংগীতব্যক্তিত্ব পঙ্কজকুমার মল্লিকের বাড়ির দিকে। সেবক বৈদ্য স্ট্রিটে। সময় কম, গাড়িতে বসে স্ক্রিপ্ট লিখতে লিখতে যাচ্ছি। সমস্ত মন অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্টের দিকে। একটা ছোট রাস্তা থেকে বড় রাস্তায় পড়ার মুখে পুলিশ গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল। চোখ তুলে দেখি বঙ্গবন্ধু নমস্কার করে আছেন। হতচকিত হলাম। কিছু না বুঝে গাড়ি থেকে নেমে ধাতস্থ হয়ে বুঝতে পারলাম, ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। তিনি পার্ক সার্কাস এলাকায় বাংলাদেশ মিশনে যাচ্ছেন।
পঙ্কজকুমার মল্লিকের কাছে গিয়ে বললাম, আপনার কণ্ঠে গান দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করব। “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী।” গানটি অনুষ্ঠানের জন্যে ভেবেছি জেনে খুব খুশি হয়ে বললেন, আমিও এই গানটির কথাই ভেবেছি। গানটির রেকর্ডিং শেষ হলে বললেন, আজ বিশেষ করে এই অনুষ্ঠানের জন্যে গানটি রেকর্ড করতে গিয়ে যেন অন্য এক তাৎপর্যে গানটি আমার কাছে ধরা পড়ল।
এরপর যে দুই বিরাট ব্যক্তিত্বের কাছে গেলাম, তারা বললেন একেবারে ভিন্ন ধরনের ধাক্কা দেবার মতো কথা। প্রথমে বিজ্ঞান আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কাছে গেলাম। তার মতো এত বড় বিজ্ঞান প্রতিভা আমাদের দেশে খুব কমই জন্মেছেন। তিনি বললেন, আমি বাংলাদেশকে খুব ভালোভাবে জানি, সেখানকার মানুষকে ভালো করে চিনি। আমি দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছি। বাংলাদেশের মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবে না। ও দেশেরই একদল মানুষ ও দেশের মানুষদের জীবনে অশান্তি ডেকে আনবে। এরপর ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের কাছে। ভারতের সবচেয়ে বড় ইতিহাসবিদ বলে আমি তাকে মনে করি। তিনি বললেন, আমি বহু বছর পূর্ববঙ্গে বাস করেছি, দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলাম। ওখানকার মানুষকে ভালো করে জানি, ওখানকার ইতিহাসও আমি বিশেষভাবে চর্চা করেছি, আমি যদি কিছুমাত্র ইতিহাস বুঝে থাকি, তাহলে বলবÑ বাংলাদেশের পরিবেশ বেশি দিন শান্ত থাকবে না। নিজেদের মধ্যে কলহ শুরু হবে। সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দেবে। অসাম্প্রদায়িক যে মনোভাব প্রাথমিকভাবে আছে, এটা নষ্ট হয়ে যাবে। বাংলাদেশে মিলিটারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। বাংলাদেশের মাটি রক্তাক্ত হবে। শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর আক্রমণ আসবে, তার জীবনও চলে যেতে পারে। আমি তো রেকর্ডিং করতে গিয়ে কেঁপে কেঁপে উঠেছি। ভাবছি, এসব কথা আজ কী করে সম্প্রচার করব?
আকাশবাণী ভবনে ফিরে এসে স্টেশন ডিরেক্টরকে সব বললাম। তিনি সব শুনে খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন, বললেন, জানি না তুমি কী করবে। কিন্তু ড. সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, কারও একটা লাইনও তুমি বাদ দিতে পার না। কেননা একজন দেশের সবচেয়ে বড় ইতিহাসবিদ, আর অন্যজন ভারতের জাতীয় অধ্যাপক ড. সত্যেন্দ্রনাথ বসু।
এই বিশেষ অনুষ্ঠান শেখ মুজিবুর রহমান নিজে রাজভবনে বসে শুনবেন। তাকে সম্মান জানানোর জন্যে অনুষ্ঠান, তার কর্মসূচি অনুযায়ী প্রচারের সময় ঠিক করা হয়েছে। জানি না এরপর তো মার চাকরি রাখা যাবে কি না?
মনে আছে, অনুষ্ঠানে ওই দুজনের বক্তব্য দেবার আগে আমি ভাষ্য করেছিলাম, এই দুই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব শুধু জ্ঞানী নন, তারা কালজ্ঞ ও বহু দূর পর্যন্ত সময়কে দেখতে পান। তাই তারা সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের মানুষকে সতর্ক করেছেন। ইতিহাস যেন সেদিকে না যায়। এই বলে বক্তব্য দুটি অনুষ্ঠানে দিয়ে দিই। শ্রোতাদের খুব ভালো লেগেছিল। সেই অনুষ্ঠানের অনেক আলোচনা হয়েছিল তখন। আমার চাকরি যায়নি। পরের দিন রাজভবনে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার, তাকে প্রণাম করার ও শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ হলো। ভয়ে ভয়ে আমার অনুষ্ঠানের কথা জিজ্ঞাসা করলাম তাকে। বঙ্গবন্ধু বললেন, আমি শুনেছি, খুব ভালো লেগেছে অনুষ্ঠান। এখানকার এত বড় বড় সব মানুষ আমার দেশের কথা বলেছেন, এ তো আমাদের গর্বের বিষয়।
বিশেষ তাৎপর্যের যেটা, সেটা হলো, ওই দুই প্রাজ্ঞ ব্যক্তি যা বলেছিলেন তা ইতিহাসে সত্য হয়েছে। বাংলাদেশের মাটি রক্তাক্ত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। বিশেষ করে ইতিহাসবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারই সেই ব্যক্তি, যিনি ওই ঐতিহাসিক দিনটিতে যা উচ্চারণ করেছিলেনÑ ইতিহাসে পরবর্তী সময়ে সেটাই ঘটেছে।

লেখক : ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননাপ্রাপ্ত

আরও পড়ুন
- Advertisment -spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য