Friday, February 23, 2024

আমার বঙ্গবন্ধু পরিচয়

সুলতানা কামাল : বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সাথে আমাদের পরিবারের প্রথম সাক্ষাৎ সেই আইয়ুব আমলের শুরুতে। ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মীর্জাকে হটিয়ে সেনাবাহিনী প্রধান আইয়ুব খান দেশটিতে সরাসরি বন্দুকের নলের সাহায্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের সংস্কৃতির প্রবর্তন করেন। সামরিকতন্ত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট অনুযায়ী প্রথমেই শাসকগোষ্ঠী জনগণের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় শুরু করে যথেচ্ছ ধরপাকড়।
ক্ষমতার প্রতি হুমকি স্বরূপ মনে হয়েছে এমন যে কেউ তিনি যে-ই হউন না-কেন এই অবৈধ দখলদারদের রোষানলে পড়েছেন এবং গ্রেফতার ও নানাবিধ হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ইতিহাস সাক্ষী, শাসকদের ‘পছন্দের মানুষটি’ নিঃসন্দেহে ছিলেন আওয়ামী লীগের সবচেয়ে তুখোড় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ক্ষমতা দখলের প্রথম লগ্নেই আইয়ুব খান তার শত্রুদের তালিকায় এক নম্বরে যে নামটি লেখেন সেটি শেখ মুজিবুর রহমানেরই।
এখন আসি আমাদের পরিবারের সাথে পরিচয়ের কথায়।
শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতারের সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তান (তদানীন্তন) আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এসে পড়ে অন্যতম নেতা আমেনা বেগমের ওপর। স্বাভাবিকভাবেই আমার মা সুফিয়া কামালের সাথে তার যোগাযোগ ছিল। সামরিক শাসন জারির অল্প কিছুদিনের মধ্যেই একদিন আমেনা বেগম একজন মহিলাকে সঙ্গে করে আমাদের অভয় দাস লেনে তারাবাগের বাড়িতে এলেন। জানা গেল, তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী। শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের পরপরই তাদের বাড়িওয়ালা বলে দিয়েছেন তিনি একজন রাজবন্দির পরিবারকে বাড়িতে রাখতে পারবেন না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। ৪টি সন্তান নিয়ে মহিলা কোথায় যাবেন, আদৌ কোনো বাড়ি ভাড়া পাবেন কি না, এত অল্প সময়ে এসব কিছু তাদের কোনো বিবেচনার বিষয় না। সামরিক শাসকদের হাতে বন্দি রাজনৈতিক ব্যক্তির পরিবারকে বাড়ি ভাড়া দিয়ে তারা বিপদে পড়তে রাজি নন। সুফিয়া কামাল তার পরিচিত সুহৃদ আশরাফউদ্দিন চৌধুরী, সেই সময়কার প্রগতিশীল মহলে সুপরিচিত একজন আইনজীবী, সেগুন বাগিচায় যার বেশ কয়েকটা বাড়ি ছিল, তাকে একটা চিরকুট পাঠালেন। চিরকুটে লিখলেন : “ভাই আমার এই মুহূর্তে একটা বাড়ি দরকার, কার জন্য জিজ্ঞাসা করতে পারবেন না।” উত্তর এসেছিল, “আপনি বাড়ি চেয়েছেন, বাড়ি পাবেন।”

`আইয়ুব সরকার এই সময়ে তাকে একটানা দু-সপ্তাহও কারাগারের বাইরে মুক্ত জীবন কাটাতে দেয়নি। দেশের মানুষ, দল, পরিবার ও প্রিয়জন থেকে মানুষটাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে সবরকম নির্যাতনমূলক পন্থা অবলম্বন করেছে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটি। তার বাড়িতে সব সময় একটা ‘হোল্ড অল’ গোছানো থাকত, কখন কারাগারে যাবার ডাক পড়ে! এরই মধ্যে ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলনে ঢাকার রাজপথে রক্ত ঝরেছে। ’৬৬-তে ৬-দফা ঘোষিত হয়েছে। রচিত হয়েছে ১১-দফা।’

শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রী তার সন্তানদের নিয়ে সেই বাড়িতে উঠলেন। কিছুদিন পরে আমেনা বেগম আবার মা’র কাছে এলেন। বাংলাদেশের বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তার বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলে দিয়েছে তাকে আর বিদ্যালয়ে রাখা হবে না। আবারও একই কথা। রাজবন্দির সন্তানকে প্রতিষ্ঠানে রাখার ঝুঁকি নিতে রাজি নয় তারা। মা তখন হাসিনাকে লীলা নাগ প্রতিষ্ঠিত নারী শিক্ষা মন্দিরে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করে দিলেন। আমিও সেই সময় ঐ বিদ্যালয়ে একই শ্রেণির ছাত্রী। একজন নাগরিককে শত্রু ঠাওরে তাকে বিনাবিচারে কারাগারে নিক্ষেপ করেই ক্ষান্ত হয়নি অত্যাচারী সামরিক শাসকরা, তার পরিবারের সদস্যদের জীবনও কীভাবে অতিষ্ঠ করে তোলা যায় সেটিরও সব ব্যবস্থা করতে উঠেপড়ে লেগেছিল তারা। বোধগম্য কারণেই অনেকেই তাদের শুভাকাক্সক্ষী হওয়া সত্ত্বেও সেই পরিস্থিতিতে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে সাহস পায়নি। দলের লোকেরাও বিপন্ন। তবে সর্বজনবিদিত যে সুফিয়া কামাল এবং কামালউদ্দিন খান সেই ভয়ভীতির তোয়াক্কা করেননি কখনও। সেই থেকে এই দুই পরিবারের মধ্যে বন্ধুত্বের সূচনা। কাকতালীয়ভাবে ষাটের দশকের প্রথমে আবার সেই অক্টোবর মাসের একই তারিখে আমরা দুই পরিবার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রাস্তার নিজেদের বাড়িতে এসে উঠি এবং সেই থেকে ’৭৫ পর্যন্ত প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করি। তাই শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সাথে আমাদের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে ’৭১ সাল অবধি একে অপরকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাই আমরা। এর পরে ইতিহাসের ধারা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়।
ষাটের দশকে দেশটির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক- এমনকি নারী অধিকার আন্দোলনেও নতুন মাত্রা যোগ হতে থাকে। ততদিনে ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে এদেশের মানুষ তাদের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের ঔপনিবেশিক মনোভাব চিহ্নিত করতে পেরে গেছে। অর্থনৈতিক শোষণের সাথে সাথে পূর্ব বাংলার মানুষকে সামাজিকভাবে হেয় করে রাখা, তাদের সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করা, রাজনৈতিক নিপীড়ন চালিয়ে যাওয়া, শিক্ষা-ব্যবস্থাকে প্রকট সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়াÑ সব কিছু এমনভাবে মাত্রা ছাড়িয়ে গেল যে শুধুমাত্র সচেতন নাগরিক সমাজ নয়, সাধারণ মানুষের উপলব্ধিতেও পাকিস্তানি শাসকদের এই বৈষম্যমূলক, অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী চরিত্রটি ধরা পড়তে শুরু করল।
এক সময়ে যারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন, তাদেরও অনেকে পাকিস্তানি শাসনের এই রূপ আর মেনে নিতে পারছিলেন না। এটা সকলের বোধে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে এর পরিবর্তন আনতেই হবে এবং সেটা প্রগতিশীল রাজনীতির হাত ধরেই হতে হবে। প্রথমে এ অঞ্চলের মানুষ পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই এই পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে। ’৫৪-র নির্বাচন সেই সাক্ষ্য দেয়। এর পরে ঘটনা অনেক দ্রুতগতিতে এগিয়ে যায়। ’৫৪-র সংসদ ভেঙে যাওয়া, ’৫৮-তে সামরিক শাসন জারি হওয়াÑ অন্যান্য আনুষঙ্গিক রাজনৈতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে এদেশের মানুষ যাকে তাদের নেতা হিসেবে চিনে নিল, তিনি আর কেউ নন, শেখ মুজিবুর রহমানÑ যিনি মানুষের কাছে হয়ে উঠলেন ‘এই আমাদের লোক’ শেখ মুজিব!
এ-সময় পরবর্তী যত আন্দোলন, যত সংগ্রাম তার নেতৃত্বে অবধারিতভাবে এই মানুষটিকে চেয়েছে এদেশের মানুষ, তাকেই পেয়েছে নিঃশর্তভাবে।
আইয়ুব সরকার এই সময়ে তাকে একটানা দু-সপ্তাহও কারাগারের বাইরে মুক্ত জীবন কাটাতে দেয়নি। দেশের মানুষ, দল, পরিবার ও প্রিয়জন থেকে মানুষটাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে সবরকম নির্যাতনমূলক পন্থা অবলম্বন করেছে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটি। তার বাড়িতে সব সময় একটা ‘হোল্ড অল’ গোছানো থাকত, কখন কারাগারে যাবার ডাক পড়ে! এরই মধ্যে ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলনে ঢাকার রাজপথে রক্ত ঝরেছে। ’৬৬-তে ৬-দফা ঘোষিত হয়েছে। রচিত হয়েছে ১১-দফা। শেখ মুজিব পাকিস্তান সরকারের কাছে মূল ‘ট্রাবল মেকার’ বলে পাকাপোক্তভাবে চিহ্নিত হয়েছেন। একের পর এক মামলা দিয়ে তাকে জর্জরিত করে ফেলার চেষ্টা চলেছে। কিন্তু শেখ মুজিবের মনোবলের ওপর তারা বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেনি, যেমন পারেনি তার স্বভাবজাত মানবিক বোধের ওপরে। কারাবাস সত্ত্বেও তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন সব ধরনের আন্দোলনকে। রক্ষা করে চলেছেন তার সামাজিক, দলীয় দায়বদ্ধতা। এমনই এক সময়, আমি তখন নেহাতই অল্প বয়সের এক ছাত্রীÑ ৩২ নম্বর রাস্তাটা পায়ে হেঁটে বড় রাস্তায় এসে কোনো যানবাহন নিয়ে গন্তব্যে যাব বলে বেরিয়েছি। পথে শেখ মুজিবের বাড়ি। আমি সেই বাড়ি অতিক্রম করে যাওয়ার সময় তিনি গাড়ি করে বেরিয়েছেন। আমাকে দেখে গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় যাব? আমরা তাকে মামা বলে সম্বোধন করতাম বলে তিনিও আমাদের মামা বলে কথা বলতেন। জানালাম গন্তব্য। তিনি আমাকে গাড়িতে তুলে নিলেন। কুশলাদি জিজ্ঞাসা করে বললেন, “মামা, তুমি কিছু মনে করো না। আমি আগে নেমে যাব। কারণ আমার কোর্টে যেতে হবে। আমি আসামি। অনুপস্থিত থাকলে এক্সপার্টি রায় দিয়ে দেবে। ড্রাইভার তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসবে।” এ-কথাগুলো একজন আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করা নেতার এক সাধারণ ছাত্রীর প্রতি! এমনই আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তার সবাইকে কাছে টানার, সবার কাছের মানুষ হয়ে থাকার।
আগেই বলেছি তিনি সেই সময় প্রতিনিয়ত শাসকগোষ্ঠীর অন্যায় অত্যাচারের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের নেতা হিসেবে তার জনপ্রিয়তা আর রাজনৈতিক প্রভাব ধীরে ধীরে কিন্তু অবিচলভাবে এদেশের মানুষকে এক নতুন স্বপ্নের পথে ধাবিত করতে শুরু করেছে। পাকিস্তানের অংশ হয়ে আর থাকা সম্ভব কি না বা থাকার প্রয়োজন আছে কি না- সে প্রশ্ন শুধুমাত্র গুঞ্জনেই থেমে থাকল না।
তাই শাসকগোষ্ঠী আরও বেশি মরিয়া হয়ে তার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে এর ভয়াবহতা প্রদর্শন করার জন্য তাকে এবং তার সহযোগী বলে চিহ্নিত ব্যক্তিদের সামরিক আইনের আওতায় বিচারের নামে সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরের ভিতরে নিয়ে আটক করে রাখল। ততদিনে ৬-দফা আর ১১-দফাকে কেন্দ্র করে ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের সূচনা ঘটে গেছে। প্রতিদিন চলছে মিটিং-মিছিল-জনসমাবেশ। রাত্রিবেলা মশাল মিছিলের আগুনে সারাদেশ যেন প্রতিবাদে জ্বলন্ত। গগন বিদারি ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো’ সেøাগানে জনতার শপথ নিয়ত প্রত্যায়িত। নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতে উচ্চারিত হতে থাকল আর এক সেøাগানÑ ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা’। সেই উত্তাল গণ-আন্দোলনের চাপে আইয়ুব শাহীর ভিত টলে গেল।
’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে সকল সহযোগীসহ শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলো। আনন্দিত, উদ্বেলিত বিশাল জনতা রেসকোর্স ঐতিহাসিক জনসভায় তাদের প্রিয় নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে আবারও তার নেতৃত্বের প্রতি নতুন করে আস্থা প্রকাশ করল। এককালের তরুণ রাজনৈতিক কর্মী শেখ মুজিবুর রহমান ক্রমশ জনতার প্রিয় নেতা ‘শেখ মুজিব’ থেকে বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে উঠলেন। প্রিয় নেতার প্রত্যাবর্তনে ’৬৯-এর ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, সাধারণ জনতার আন্দোলন নতুন প্রাণ পেল। ‘আইয়ুব শাহী-মোনেম শাহীর ধ্বংস চাই’ স্লোগান প্রকৃতই শাসকদের ধ্বংস নিশ্চিত করল। আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলেন। তবে পাকিস্তানি সামরিক শক্তি সুচতুরভাবে আর এক জেনারেলকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে সামরিক শাসনই বজায় রাখল। বাংলার মানুষ অবশ্য হাল ছাড়ল না। গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলন আরও বেগবান হলো। তারা তাদের নেতা হিসেবে পেয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে- যার সাহসী নেতৃত্ব ও তার প্রতি জনগণের আস্থা এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পরিবেশের সৃষ্টি করল। বঙ্গবন্ধুকে মাথায় রেখে বাংলার মানুষ এক নতুন বাসভূমির স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। সামরিক সরকার গণ-আন্দোলনের চাপে সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করতে বাধ্য হলো। ’৭০-এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সমগ্র

পাকিস্তানেরই সরকার গঠন করার ম্যান্ডেট পেল। প্রত্যুত্তরে শুরু হলো পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কূটচাল। এ পর্যায়ের ইতিহাস অল্প বিস্তর সবার জানা। ’৭০-এর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ছলেবলে কৌশলে ক্ষমতা হস্তান্তর বানচাল করার সবরকম চেষ্টা অব্যাহত রাখল। পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধু সাড়ে ৭ কোটি মানুষের নির্বাচিত নেতা হিসেবে প্রাণপণে গণতান্ত্রিক পন্থায় এর সমাধানের চেষ্টা করতে থাকলেন। আবারও পাকিস্তানি শাসকদের নিপীড়ন আর নির্যাতনের খাঁড়া নেমে এলো বাংলার মানুষের ওপর। প্রকাশ্যে আসতে না পেরে গোপনে অত্যাচার করার মতো কাপুরুষতাকে অবলম্বন করে এখান-ওখানে গ্রেফতার, হত্যাকা- চালাতে লাগল। জয়দেবপুরে সরকারেরই অস্ত্র কারখানায় বাঙালি সেনা সদস্যদের হত্যা মানুষের মনকে বিষিয়ে তুলল। মানুষ খোলাখুলি পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতার দাবি তুলতে থাকল। পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে যেতে থাকায় মার্চের ৩ তারিখ বঙ্গবন্ধু দেশের ভার নিজের হাতে তুলে নিলেন। শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন। বাংলার মানুষ শতভাগ আনুগত্য নিয়ে পাকিস্তানি শাসন অগ্রাহ্য করে বঙ্গবন্ধুর শাসন মেনে চলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। সবকিছু পরিচালিত হতে থাকল বঙ্গবন্ধুর অঙ্গুলি হেলনে। অফিস-আদালত, হাট-বাজার, যানবাহন, বেসরকারি সংস্থা- প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের জন্য অপেক্ষমাণ থাকত। একই সাথে রাজপথে চলছে দৃপ্ত উচ্চারণ- ‘আমার নেতা, তোমার নেতা, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’। জনতার দ্ব্যর্থহীন রায় ‘তুমিই আমাদের লোক’। জনতার মিছিল সারা পথ-পরিক্রমার শেষে ৩২ নম্বরে এসে দাঁড়ায় নেতাকে এক পলক দেখবে বলে। একটি নয়, দুটি নয়, সহস্র মিছিলের যাত্রা একই গন্তব্যেÑ ৩২ নম্বর! নেতাকে এক পলক দেখার আকাক্সক্ষা। নেতা অমানুষিক ব্যস্ততার মাঝেও বারান্দায় এসে দাঁড়ান। জনতা নতুনভাবে উদ্দীপিত হয়ে আন্দোলনে মনোনিবেশ করে।
এলো ৭ই মার্চ। তদানীন্তন রেসকোর্সের মাঠ লোকে লোকারণ্য। যখনই সেই সমাবেশের কথা স্মরণে আসে, ভাবি সমুদ্র কি এর চেয়ে গভীর আর উত্তাল হতে পারে? এর চেয়ে বিশাল হতে পারে?
বঙ্গবন্ধু এলেন, মঞ্চে উঠলেন। ‘ভায়েরা আমার’ বলে ভাষণ শুরু করলেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের দিক-নির্দেশনা দিলেন। স্পষ্ট ভাষায় বললেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।” তার আগে এও বললেন যে এদেশের মানুষ বাঁচতে চায়, এদেশের মানুষ মুক্তি চায়। আর সেই মুক্তি হতে হবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক। বললেন, অসহযোগ চলবে কিন্তু দরিদ্র অসহায় মানুষের যেন কষ্ট না হয় সেটা দেখার দায় ভোলা যাবে না। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষকে একে অপরের প্রতি দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিলেন। একটি ভাষণের মধ্য দিয়েই যেন জন্ম নিল ‘বাংলাদেশ’ নামের নতুন রাষ্ট্রটি। বঙ্গবন্ধু হলেন একটি জাতির পিতা। তাই ইউনেস্কো এই ভাষণকে ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিলের স্বীকৃতি দিয়ে সারাবিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের সম্পদের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। এরই মাঝে আমার অভিজ্ঞতায় ঘটল এক অভূতপূর্ব ঘটনা। ‘আমার নেতা তোমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব’ স্লোগানটি এমনই ব্যাপ্তি লাভ করেছিল যে ছোট শিশুদের মনেও ‘শেখ মুজিব’ নামটি গেঁথে গেছিল। আমাদের প্রতিবেশীর পাঁচ কি ছয় বছরের শিশু ‘শেখ মুজিবকে দেখবো’ বলে বায়না ধরল। আমার বাবার কাছে নিত্যদিন এসে বসে থাকে শিশুটি। তার অধ্যবসায় দেখে বাবা আমাকে বললেন, কোনো ব্যবস্থা করা যায় না-কি? বন্ধুত্বের সুবাদে শেখ হাসিনার সাথে যোগাযোগ করে শিশুটিকে নিয়ে তাদের বাড়িতে গেলাম। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে তারিখটি ছিল একাত্তরের ৬ মার্চ। বঙ্গবন্ধু পরদিন বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণটি দেবেন। শিশুটি তাকে দেখতে এসেছে শুনে তার চা খাওয়ার অবসর সময়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। কোনো দর্শনার্থী তার গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিয়েছিল। সেটা তখনও তার গলায় শোভা পাচ্ছে। তিনি শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে আদরে ভরিয়ে দিয়ে নিজের গলার মালাটা পরিয়ে দিলেন! এই আমার দেখা, আমার চেনা বঙ্গবন্ধু। একটি শিশুকেও যিনি চরম ব্যস্ততার মাঝেও বুকে টেনে নিতে পারেন!
বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন না কৌশলগত কারণে; কিন্তু তার ভাষণের অন্তর্নিহিত বার্তা পৌঁছে গেল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কাছে। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে গণতন্ত্রকামী সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যার মতো ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের কারণে ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট গণহত্যাকারী দেশ হিসেবে নিজের নাম লিখালো পাকিস্তান। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে বন্দি রাখল পাকিস্তানে। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তার সহযোগীরা স্বাধীনতা ঘোষণা করল। মুক্তিবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ইতিহাসের ৯ মাসব্যাপী এক চমকপ্রদ যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে ১৬ ডিসেম্বর ৩০ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় অর্জন করল। দেশের মানুষের আরও একটি মাস অপেক্ষা করতে হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পেতে। বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশের মাটিতে পা রাখলেন। লক্ষ মানুষ তেজগাঁও বিমানবন্দরে তাদের প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানাল। বিরাট সিংহহৃদয় পুরুষ সমস্ত দূরত্ব ঘুঁচিয়ে আনন্দ-বেদনা মিশ্রিত চোখের জলে ‘আমি তোমাদেরই লোক’ বলে সেই জনতাকে বুকে তুলে নিলেন। এর পরে অবশ্য দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তী পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখার আর সুযোগ ঘটেনি। আমার তাকে শেষবারের মতো দেখা ’৭৫-এর ২০ জুলাই। শেখ কামালের বিবাহোত্তর অনুষ্ঠানে। ইতোমধ্যে বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মা বাকশালে যোগ দেননি বলে বহুজন মাকে বলার চেষ্টা করেছেন যে শেখ মুজিব সেটা ভালো চোখে দেখবেন না এবং এর ফলে মা’র প্রতি তিনি প্রতিহিংসাপরায়ণও হয়ে উঠতে পারেন। তবে কামালের বিয়েতে আমরা নিমন্ত্রিত হলাম প্রত্যাশিতভাবেই। মা আর আমি যখন অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছলাম, বঙ্গবন্ধু তখন দোতলার উন্মুক্ত স্থানে বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে কথা বলছিলেন। মাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে তিনি সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন। সম্ভাষণ জানিয়ে উপর দিকে তাকিয়ে তার সেই অবিস্মরণীয় দরাজ গলায় ডেকে বললেন, “কামাল কোথায়? কামালকে বল ওর ফুফু এসেছেন।” কামাল এলো, মাকে সালাম করল। কামালকেও সেদিনই আমাদের শেষ দেখা। মাত্র এক মাস পরেই দুটি বোন ছাড়া পিতা-পুত্র ও পরিবারের অন্য সকলে আততায়ীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন।
বিরাট হৃদয়ের মানুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু, ছিলেন বিশাল উচ্চতার। তাকে তার জন্মশতবার্ষিকীতে স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধায়।

লেখক : মানবাধিকার কর্মী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য