Saturday, July 13, 2024

আমার দেখা নয়াচীন

‘আমার দেখা নয়াচীন’
তরুণ জাতীয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৫২ সালের গণচীন ভ্রমণের অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা একটি ডায়েরি। তার রচিত তৃতীয় গ্রন্থ। বাংলা একাডেমি ২০২০ সালে বইটি প্রকাশ করে। উত্তরণ-এর মুজিবপ্রেমী পাঠকদের জন্য সেই বই থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে।
[পূর্ব প্রকাশের পর]

আমাদের সভা চললো, বক্তৃতা আর শেষ হয় না। এত বক্তৃতা দেওয়ার একটা কারণ ছিল। প্রত্যেক দিন সভায় যে আলোচনা হয় এবং যারা বক্তৃতা করেন তাদের ফটো দিয়ে বুলেটিন বাহির হয়। এই লোভটা অনেকেই সংবরণ করতে পারেন নাই। ‘আর আমার বক্তৃতা দেওয়া ছিল এই জন্য যে, বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিব।’
যে হলে আমাদের সভা হয় তাহা বড় চমৎকার। কলকাতা কাউন্সিল হাউসের মতো, বুঝি একটু বড়ই হবে। একদিকে সভাপতিমণ্ডলীরা বসেছেন, আর সামনে ডেলিগেটরা বসেছেন। সভাপতিমণ্ডলীদের ঠিক পিছনে ৩৭টা দেশের পতাকা একইভাবে উড়ছে। হলের গেটেও ৩৭টা পতাকা লাগাইয়া দেওয়া হয়েছে। আমাদের পাকিস্তানের পতাকাটা খুব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সিল্কের কাপড় দিয়ে করা ভারতের ও আমাদের পতাকা পাশাপাশি। হলের ভিতর ফ্ল্যাশ লাইট মাঝে মাঝে জ্বলে ওঠে- যখন ফটো নেওয়া হয়। ১০/১৫ জন ফটোগ্রাফার অনবরত ফটো নিচ্ছে। পাশ দেখাইয়া হলে ঢুকতে হয়। পাশের রুমে চা খাবার বন্দোবস্ত আছে। দরকার হলেই যেয়ে খেতে পারেন। পিছনে ফুলের বাগান ও মাঠ রয়েছে, রয়েছে বসার জায়গা। যখন বিশ্রামের জন্য সভাপতি সময় দেন, তখন একে অন্যের পাশে বসে আলাপ করে ঐ ফুলের বাগানে যেয়ে।
সম্মেলন ১১ দিন চলে। সকাল বিকাল এইভাবে চলতে থাকে। অনেক দেশের প্রতিনিধির সাথে আলাপ হয়। অস্ট্রেলিয়ার এক প্রতিনিধি আমার সাথে আলাপ করতে করতে বললেন, “তোমার দেশের রাষ্ট্রদূতরা মনে করে দুনিয়ার মানুষ আহাম্মক!” আমি বললাম, “কেন এ কথা বলছেন?” তিনি উত্তর করলেন যে, “রাষ্ট্রদূত ও কর্মচারীরা যেভাবে থাকেন, আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীও সেভাবে থাকতে পারে না। অন্যান্য যে সকল দেশের জনগণের অবস্থা খুব ভালো, খায়ও অনেক এবং পরিমাণে বেশি আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেন, রাশিয়া ও অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রদূতরা যে অবস্থায় থাকে, তার চেয়েও অনেক ভালো অবস্থায় থাকে এবং যা-তা ভাবে অর্থ ব্যয় করে। আমাদের বোঝাতে চায় যে, তোমরা কত ভালো আছ। আমরা রাজনীতি করি, দেশ-বিদেশের খবর রাখি। তোমাদের দেশের মাথাপ্রতি আয় কত? দেশের লোক না খেয়ে মরে, কাপড় পর্যন্ত জোগাড় করতে পারে না। এ সব খবর আজ দুনিয়ার শিক্ষিত সমাজ ভালো করেই জানে। দেশের মানুষ না খেয়ে মরে আর সেই দেশের কর্মচারী অথবা রাষ্ট্রনায়করা যেভাবে বাজে খরচ করে তা ভাবলে আমাদেরও লজ্জা করে।” আপনারা বুঝতেই পারেন কী উত্তর আমি দিবো! হ্যাঁ-না করে কেটে পড়লাম। লজ্জা হয়। যারা দুনিয়ায় ঘুরে বেড়ায়, আমেরিকা অথবা গ্রেট ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূতদের সাথে পাল্লা দিয়া খরচ করে- আর তাদের কাছে আবার ভিক্ষা চায়, “আমাদের সাহায্য দেও, আমাদের মিলিটারি সাহায্য দেও”- যা বলবা তাই শুনবো। তোমাদের অস্ত্র তোমাদের মত ছাড়া ব্যবহার করবো না। কাঁচামাল আছে তোমাদের দেবো। তারপর যাহা থাকবে অন্যকে দেবো। সেসব দেশের মানুষ আমাদের নেতাদের বাহাদুরি দেখলে হাসবে না কেন?
দক্ষিণ আমেরিকার একটা দেশের ডেলিগেটের সাথে আলাপ হলো। তিনি বললেন, পাকিস্তান কি একটা স্বাধীন দেশ না ভারতের একটা প্রদেশ? আমি আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইলাম।

[চলবে]
সূত্র : আমার দেখা নয়াচীন, শেখ মুজিবুর রহমান

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য