Saturday, July 13, 2024
বাড়িক্রীড়াআবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে জয় ফুটবলের

আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে জয় ফুটবলের

আকাশি-নীল আর সাদা কালোর লড়াইটা কাগুজে হলেও এর ভেতরে একটা তীব্র উন্মাদনা থাকেই। তা হোক দর্শকশূন্য মাঠ। ফুটবল বিশ্লেষকদের বেশিরভাগেরই ধারণা, দেশের ফুটবলের উন্নতি হওয়ার আগে প্রয়োজন এই দু-দলের উন্নতি।

আরিফ সোহেল: ৩০ মে, কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়াম। সুপার কাপের ফাইনাল। মুখোমুখি আবাহনী-মোহামেডান। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ শেষে দীর্ঘ ১৪ বছর পর শিরোপা জিতেছে তারুণ্যনির্ভর মোহামেডান। আবাহনী ২-০ লিড নিয়ে প্রথমার্ধ্ব শেষ করেও শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকে হেরে গেছে। যদিও ম্যাচের নায়ক থেকে মহানায়ক হয়েছেন সোলেমান দিয়াবাতে। তিনি একাই হ্যাটট্রিকসহ ৪ গোল করে হারিয়ে দিয়েছেন আবাহনী লিমিটেডকে। ধানমন্ডির অভিজাত আকাশি-নীলের দলটি তীব্র-প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে হেরে গেলেও জিতেছে ফুটবল। হারিয়ে যাওয়া ফুটবলের ধ্রুপদী লড়াইয়ে ফাইনাল শুরু হয় ৩টায়। কিন্তু আর্শ্চযের ঘটনা; তার আগে পুরোপুরি স্টেডিয়াম উপচিয়ে দর্শক। বাইরে হাজারও দর্শকের বাঁকাপথে গ্যালারি প্রবেশ করার অপেক্ষা।
একটু ফিরে যেতে মন চায় আশির দশকে। ওই সময়ে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ মানে শুধু ঢাকা নয়; সারাদেশে টানটান উত্তেজনা। সমর্থকদের বাড়িতে বাড়িতে প্রিয় দলের পতাকা। পাড়া-মহল্লায় চায়ের টেবিলে কথার বাহাস, কথা কাটাকাটি- এমন কী হাতাহাতি থেকে রক্তারক্তির ঘটনাও ঘটেছে। এ ছিল ম্যাচের আগের নিত্যদিনের চিত্র।
ম্যাচের দিন তার ব্যাপক ছায়া প্রবলভাবে পড়ত গ্যালারিতে। ফাইনাল বলে কথা নয়। যে কোনো ম্যাচেই একই রূপ; তা হোক যে কোনো আসর। ম্যাচ নিজ দলের গোলের উৎসব-উদযাপনে উন্মাদনা; প্রতিপক্ষ দুয়োধ্বনিতে তাতিয়ে তোলা; আগবাড়িয়ে নানা খিস্তি-খেউড়ে তপ্ত হয়ে উঠত। ঢিল ছোঁড়াছুঁড়ি; গ্যালারির রেলিং ভেঙে অন্য গ্যালারিতে প্রবেশের প্রচেষ্টা ঘটেছে অহরহই। সে-কারণে ১৯৮৭ সালে আবাহনী-মোহামেডানের খেলাকে ঘিরে সমর্থকদের সম্ভাব্য সংঘর্ষ ও রক্তপাতের আশঙ্কায় দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কতটা উত্তেজনা বিরাজমান থাকলে খেলার মাঠ ছাপিয়ে মাঠের বাইরে এ-ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে! ঢাকার ফুটবলের ঐতিহ্যের এই ছবিকে কোনোভাবে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। আবারও দীর্ঘ বছর পর তেমন ম্যাচ মনে করিয়ে দিয়েছে স্মৃতি-জাগানিয়া দৃশ্যপটের।
ফাইনালে দল হিসেবে আবাহনী লিমিটেড ছিল সমৃদ্ধ। তাদের জাতীয় দলের সাতজন খেলোয়াড় থাকার বিপরীতে মোহামেডানে ছিল না একজনও। তবে তারুণ্যনির্ভর মোহামেডানে ভরসার নাম জাপানি উরু নাগাতা ও মালির সোলেমান দিয়াবাতে। আবাহনীর কোচ মারিও লেমোসের কাছে এই ম্যাচ ছিল অন্য ৮-১০টা ম্যাচের মতো। ঢাকা ডার্বির ১৯৭৩ সালে প্রথম ম্যাচেই জয় পেয়েছিল আবাহনী। দুই দল ১২৯ বার মুখোমুখি লড়াইয়ে আবাহনীর ৫৪ এবং মোহামেডান ৪১ ম্যাচে জয় পেয়েছে। ২১ ম্যাচে ড্রয়ের বিপরীতে পরিত্যক্ত হয়েছে তিন ম্যাচ। তবে ১৪ বছর পর মুখোমুখি আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচ ঘিরে সব হিসাব-সমীকরণ ছাপিয়ে যাওয়া সম্ভাবনাই ঠিক হয়েছে। আসরটির ফাইনালে এটি হতে যাচ্ছে দুই দলের একাদশ মোকাবিলা। আগের ১০ লড়াইয়ে ছয়বার জিতেছে মোহামেডান; আবাহনী জিতেছে দুই ম্যাচ। বাকি দুটি ফাইনালে শিরোপা ভাগ করে নিয়েছে দুই দল।
এত নাটকীয়তা, এমন রুদ্ধশাস লড়াই, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এমন টানটান উত্তেজনাÑ আবাহনী-মোহামেডানের এমন ফাইনাল দীর্ঘদিন দেখেনি ফুটবলপ্রেমীরা। ১৪ বছর পর ফুটবলপ্রেমীদের বুঁদ করে কী দুর্দান্ত এক ম্যাচে মন-প্রাণ-চোখ জুড়িয়েছেন অভ্যাগতরা। ম্যাচ পেন্ডুলাম হেলেছে একেকবার একেক দিকে, নির্ধারিত সময় শেষে ৩-৩ ও অতিরিক্ত সময় শেষে স্কোরলাইন ৪-৪। টাইব্রেকারে মোহামেডানের বাজিমাত; ৪-২ গোলে। দলীয় জয়-পরাজয় ছাপিয়ে সত্যিকারের জয় হয়েছে বাংলাদেশের ফুটবল। ম্যাচে ফুটবলের সোনালি অতীত বারবার ফিরে এসেছে। সেই দশকে দর্শকে ঠাসা স্টেডিয়াম, তীব্র উত্তেজনা, ক্ষণে ক্ষণে রোমাঞ্চকর আক্রমণ; পাল্টা আক্রমণ; প্রতি আক্রমণে ম্যাচটি ছিল জমজমাট। দুর্দান্ত সব সেভ, গোলের পসরা স্নায়ুর অগ্নিপরীক্ষা, টাইব্রেকার রোমাঞ্চ। গ্যালারিতে দুই দলের সমর্থকদের উত্তাপ। গ্যালারিতে সমর্থকদের জার্সি গায়ে উপস্থিতি; হাতে ব্যানার-ফেস্টুন, দলীয় পতাকা। সব মিলিয়ে ফাইনাল ম্যাচটি দেশের ক্লাব ফুটবলের দারুণ বিজ্ঞাপনই হয়ে রইল।
ম্যাচের প্রথমার্ধ্বে খুব একটা পাত্তা পায়নি মোহামেডান। ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল তারা। সেখান থেকে দ্বিতীয়ার্ধ্বে বিদেশি সোলেমান দিয়াবাতে ঝলকে সমতায় ফেরে তারা। আরেক দফায় পিছিয়ে পড়ার পর আবারও মালির ফরোয়ার্ডের হ্যাটট্রিক গোলে সমতায় ফেরে সাদা-কালো শিবির। অতিরিক্ত সময়েও দিয়াবাতে দলকে লিড এনে দিয়েছিলেন। দিয়াবাত একাই করেছেন ৪ গোল।
এমন রুদ্ধশ্বাস ম্যাচকে ফুটবলের জয় উল্লেখ করে মোহামেডানের কোচ আলফাজ বলেন, ‘অবিশ্বাস্য একটি ম্যাচ ছিল। আবাহনীর মতো বড় দলের বিপক্ষে পিছিয়ে থেকে কামব্যাক করা, লিড নেওয়া আবার ড্র; উত্তেজনাকর একটা ম্যাচ। এটা বলে বোঝানো যাবে না। মোহামেডান-আবাহনীর খেলায় কেউ জয়ী হয়নি, ফুটবলের জয় হয়েছে।’ তিনি যোগ করেন, ‘অনেকদিন পরে বাংলাদেশের মানুষ, যারা টিভিতে দেখেছেন বা স্বচক্ষে মাঠে দেখেছেন, তারা উপভোগ করেছেন ফুটবল কত আনন্দের।’
এর আগে সেমিফাইনালে শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রকে ৩-০ গোলে হারিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপ ফেডারেশন কাপ ফাইনালে উঠেছে আবাহনী লিমিটেড। অন্যদিকে বসুন্ধরা কিংসকে হারিয়ে আগেই ফাইনাল নিশ্চিত করে মোহামেডান।
সুপার লিগে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত ফাইনালে আবাহনী-মোহামেডান সর্বশেষ মুখোমুখি হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে নিরাপত্তায় ছিল বেশ কড়াকড়ি। সেই ম্যাচেও জয়ী হয়েছিল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেড। ফুটবলে নানা ঘটন-অঘটন; দলীয় পর্যায়ে অবনমনে সমর্থক বিমুখ হয়ে পড়ছিল গ্যালারি। তবুও দর্শকদের মধ্যে আগ্রহের কোনো কমতি ছিল না। মাঠ ছাপিয়ে দর্শক স্টেডিয়ামের বাইরে অবস্থান করছিল।
আকাশি-নীল আর সাদা কালোর লড়াইটা কাগুজে হলেও এর ভেতরে একটা তীব্র উন্মাদনা থাকেই। তা হোক দর্শকশূন্য মাঠ। ফুটবল বিশ্লেষকদের বেশিরভাগেরই ধারণা, দেশের ফুটবলের উন্নতি হওয়ার আগে প্রয়োজন এই দু-দলের উন্নতি। আবাহনীর তো আছে, এখন প্রয়োজন মোহামেডানের। এই দুয়ের জাগরণে জেগে উঠতে পারে থেতিয়েপড়া ফুটবল। কারণ আবাহনী-মোহামেডান লড়াইটা বাংলাদেশের এল ক্লাসিকো; ঢাকা ডার্বি-র মতো। নব্বই দশকেও ঢাকাসহ সারাদেশ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যেত এই দু-দলের লড়াইয়ের আগে। মাঠের লড়াই চলে যেত, পাড়া-মহল্লায়, অফিস-আদালত-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই; হালে শেখ জামাল, শেখ রাসেল কিংবা বসুন্ধরা কিংসের মতো দলের উত্থান হয়েছে। তারা ভালো খেলছে; ভালো দল গড়ছে। কিন্তু আবাহনী-মোহামেডানের মতো দর্শকহৃদয় ছুঁয়ে যেতে পারেনি। ইতিহাস-ঐতিহ্যে মোহামেডান এগিয়ে থাকলেও আবাহনী সৃষ্টি হওয়ার পর পাল্টে গেছে ফুটবলের দৃশ্যপট। কিন্তু আশার বাতাবরণে ঘুণে ধরেছে নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে। ১৯৯৩ সালে যেখানে বাংলাদেশের ফিফা র‌্যাংকিং ছিল ১২০, এখন সেটি ১৮৭।
২০০১ সালে রংপুরে জাতীয় লিগে ঢাকার বাইরে প্রথম দুই দল বড় ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল, সেবারও আবাহনী জিতেছিল, ব্যবধান ১-০। মৌসুম শুরুর টুর্নামেন্ট ফেডারেশন কাপের গ্রুপ পর্বের লড়াইয়ে গেল ২৩ ডিসেম্বর ২০২৩; ৩-০ গোলের জয় পেয়েছিল আবাহনী। ২০১৮-১৯ প্রিমিয়ার লিগে শেষ সাক্ষাতে আবাহনীকে ৪-০ গোলে হারিয়েছিল মোহামেডান। পরের মৌসুমে আবার ৪-০ গোলে মোহামেডানকে হারিয়ে আবাহনী প্রতিশোধ নেয়।
দীর্ঘ ১৪ বছর পর মোহামেডানের শিরোপা ঘরে তোলার আনন্দে বাড়তি উন্মাদনা ছিল ফুটবল মাঠের চির শত্রু আবাহনী লিমিটেডকে হারানো। সবশেষ ২০১৪ সালে তারা জিতেছিল স্বাধীনতা কাপ। এ-সময়কালে পারফরম্যান্সও এতটা শোচনীয় ছিল যে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনীর বিপক্ষে প্রায় চার বছর জয়হীন ছিল তারা। এক কথায় ঘরোয়া ক্রীড়াঙ্গনে অনেকটাই মøান হয়ে পড়েছিল মোহামেডানের ঐতিহ্য। অনেকের ধারণা, এই জয়ে মোহামেডান প্রাণিত হয়ে উঠবে; তাতে জেগে উঠবে ফুটবল। আবাহনীও এমন দুরন্ত ফাইনাল শেষে কষ্ট পাওয়ার কথা নয়। তারা ভাগ্যের কাছে হেরেছেÑ এই যা। এই জয়-পরাজয় ছাপিয়ে জিতেছে ফুটবল; জিতেছে বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য