Sunday, September 24, 2023
বাড়িকূটনীতিআফগান-মার্কিন শান্তিচুক্তি ‘শান্তি চাই - স্বাধীনতা চাই’

আফগান-মার্কিন শান্তিচুক্তি ‘শান্তি চাই – স্বাধীনতা চাই’

সাইদ আহমেদ বাবু: আফগানদের মতো স্বাধীনচেতা জাতি বিশ্বে বিরল। তারা সব সময় যুদ্ধ করেছে তাদের চেয়ে বেশি শক্তিসম্পন্ন শক্তির সঙ্গে। এ নিয়ে কখনও আফগানরা বিব্রতবোধ করেনি। আফগানিস্তান একটি রুক্ষ অনুর্বর মরুসদৃশ পাহাড়-পর্বতসংকুল দুর্গম দেশ হলেও তেল-গ্যাসসহ মূল্যবান খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এ-কারণেই মূলত সময়ে সময়ে বিদেশিদের কুদৃষ্টি পড়েছে দেশটির ওপর। গত দেড়শ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আফগানিস্তানের মাটিতে পরাজিত হয়েছে তিন তিনটি পরাশক্তি। সেই তালিকার প্রথমে রয়েছে উপনিবেশিক ব্রিটিশ শক্তি, এরপর সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সবশেষে মহাশক্তিশালী আমেরিকা। সামরিক ও নৈতিক, উভয় ক্ষেত্রেই মার্কিনরা তালেবানদের সঙ্গে পেরে উঠতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তারা যুদ্ধ শুরু করে এবং তা তালেবানদের ধ্বংস না করা পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে-যুদ্ধে ডেকে আনে ইউরোপের মিত্রশক্তিগুলোকেও। এত অর্থ ব্যয় ও রক্তপাতের পরও আফগানিস্তানের অধিকাংশ এলাকা রয়ে গেছে তালেবানদের নিয়ন্ত্রণে। এমন পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানে তালেবানদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জয়ের কোনো আভাস দেখা যাচ্ছে না। তাই এই পরাশক্তির প্রয়োজন হয়েছে আফগানিস্তান ছাড়ার ‘সম্মানজনক’ সুযোগ। ‘শান্তি’র পথেই যদি যুক্তরাষ্ট্র হাঁটতে চায়, তাহলে কেন ১৮ বছর যুদ্ধ চালিয়ে ধ্বংস করা হলো একটি দেশ বা একটি দেশের জনজীবন?
১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সন শান্তিচুক্তির মাধ্যমে ভিয়েতনাম থেকে মার্কিন দখলদার বাহিনীর সরে আসার ব্যবস্থা করেছিলেন। সে-প্রসঙ্গ তুলে ধরে নিউইয়র্ক টাইমসের সংবাদ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে নিক্সনের যেমন প্রয়োজন হয়েছিল ভিয়েতনামে আমেরিকানদের পরাজয় ঠেকানো, তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রয়োজন হয়েছে তালেবানদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনাদের ফেরানোর পথ সুগম করা।
মার্কিন বিমান বাহিনীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানে বিগত ১০ বছরের মধ্যে গত বছর, অর্থাৎ ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি বোমা ফেলা হয়েছে। গত বছরে দেশটিতে ৭ হাজার ৪২৩টি বোমা ফেলেছে মার্কিন বাহিনী। এ পরিপ্রেক্ষিতে সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, এরপরও যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি স্বাক্ষরে এত আগ্রহী কেন? এর সম্ভাব্য কারণের মধ্যে একটি হলো, আগামী নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে এটিকে ট্রাম্পের দল ব্যবহার করবে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা ফিরিয়ে এনেছে। এছাড়া ইতিহাসের দীর্ঘতম এই যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়া ক্রমেই আমেরিকার জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। এর আগে প্রায় ১০ বছরের যুদ্ধে ভিয়েতনামে প্রায় ৫৩ হাজার সৈন্য নিহত হওয়ার পর জনগণের প্রবল চাপে মার্কিন প্রশাসন লজ্জাজনক পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়। আফগানিস্তানে আমেরিকার প্রতি সৈন্যের পেছনে বছরে খরচ হয় ১০ লাখ ডলার। ২০০১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত যুদ্ধের খরচ প্রায় ৯ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার। তালেবানদের বিরুদ্ধে ১৯ বছরের যুদ্ধে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৪০০ মার্কিন সেনাসহ মিত্রবাহিনীর প্রায় সাড়ে ৩ হাজার যোদ্ধা নিহত হয়েছে। আর আহত হয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৬৬০ সেনা। এখনও দেশটিতে প্রায় ১২ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। আর আফগানিস্তানে অবস্থান করে নানা ধরনের ঠিকাদারি কাজ করছে ১০ হাজারেরও বেশি মার্কিন নাগরিক। দীর্ঘ যুদ্ধে অনেক মার্কিন নাগরিকও প্রাণ হারিয়েছেন। তাছাড়া প্রায় ৬০ হাজার আফগান সেনা এবং লক্ষাধিক বেসামরিক নাগরিক এ যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে। ২০১৮ সালের হিসাবমতে বিশ্বব্যাপী ২৫ লাখ আফগান শরণার্থী বসবাস করছে। যদিও শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সামাজিক উন্নয়ন, বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে আফগানিস্তান অনেকদূর এগিয়েছে; কিন্তু দুর্নীতি ও জাতিগত বিভাজনের কারণে কাবুল সরকার তালেবানের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।
জানা গেছে, আফগানিস্তানে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে ২০০২ থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর প্রতিদিন গড়ে ১.৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ পপিগাছ থেকে তৈরি করা হয় মাদক হেরোইন।
মার্কিন প্রশাসন তালেবানদের সঙ্গে সম্পাদিত শান্তিচুক্তি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও এ নিয়ে আফগানদের মধ্যে দেখা গেছে হতাশা-আক্ষেপ। চুক্তি অনুসারে আমেরিকা ধীরে ধীরে সব সৈন্য ফিরিয়ে নিবে আফগানিস্তান থেকে। কিন্তু, গত ১৮ বছরে এই দেশটিতে যে অপরিসীম ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে তার কী হিসাব হবে? সেখানে এত হত্যার দায় কে নেবেন? আফগানিস্তানকে কি আমেরিকা রেখে যাচ্ছে ধর্মান্ধ তালেবান গোষ্ঠীর হাতে? তাই যদি হয়, তাহলে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির শান্তিপ্রিয় মানুষের ভাগ্যে কী জুটবে? এমন হাজারো প্রশ্ন উঠে আসছে গণমাধ্যমে।
আফগানিস্তানে দীর্ঘ এক দশকের (১৯৭৯ সালে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক সামরিক আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ার মৌলবাদী তালেবানের জন্ম হয়। পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে মাদ্রাসা ছাত্রদের নিয়ে ১৯৯৪ সালে মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে তালেবানের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত গৃহযুদ্ধে আফগানিস্তানের প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ নিহত হন। ১৯৯৬ সালে প্রেসিডেন্ট বুরহানুদ্দিন রব্বানির সরকার উৎখাত করে রাজধানী কাবুল দখল করে তালেবানরা। আফগানিস্তানের ৯০ শতাংশ এলাকা দখলে নিয়ে সরকার গঠন করে তারা।
ক্ষমতায় আসার পর কঠোর ইসলামি শরিয়াহ আইন প্রবর্তন করে তালেবান গোষ্ঠী।
আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারিত্বের সময় থেকেই প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে আমেরিকা তালেবান তৈরি করে। পরে সোভিয়েত বাহিনীর পরাজয় হলে আমেরিকা ভোল পাল্টে নানা ছলচাতুরতায় তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। সোভিয়েত ইউনিয়নকে তাড়াতে আমেরিকার মদদে যে তালেবানি শক্তির উত্থান ঘটেছিল, আজ সেই শক্তি বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে আমেরিকার জন্য। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান শাসন করেছে তালেবান। তালেবানরা আফগানিস্তানে কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন এবং নারীদের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণের অভিযোগ রয়েছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আত্মঘাতী বিমান হামলায় নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর এর দায় পড়েছিল আফগানিস্তানে তালেবানদের আশ্রয়ে থাকা ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়দা জঙ্গিগোষ্ঠীর ওপর। হামলার পর থেকেই আফগানিস্তানের মাটিতে মার্কিন সামরিক জোট ন্যাটো তাদের আগ্রাসন চালাতে থাকে। ২০০১ সালে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাধ্যমে কান্দাহারে তালেবান সরকারের উৎখাত ও পতন ঘটায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রশক্তি। সে-সময় এই দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মোল্লা ওমর। মোল্লা ওমরের মৃত্যুর পর তালেবান বাহিনীর নেতৃত্ব দেন তার সহকারী মোল্লা আখতার মনসুর। ২০১৬ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় তিনিও নিহত হন। বর্তমানে তালেবানদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মৌলবি হাইবাতুল্লাহ আখুনজাদা। তিনি ধর্মীয় প-িত হিসেবে আফগানিস্তানে বেশ সুপরিচিত। তালেবান আদালতের সাবেক প্রধান বিচারক হাইবাতুল্লাহ শুরু থেকেই তালেবানদের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ছিলেন। তিনি দক্ষিণ কান্দাহার প্রদেশের ইশাকজাই গোত্রের সদস্য।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এই প্রথম আফগানিস্তান সফর করলেন ট্রাম্প। মার্কিন সৈন্যদের সামনে বক্তব্য রাখা ছাড়াও সেদেশের প্রেসিডেন্ট আশরফ গনির সঙ্গে আলোচনাও করলেন তিনি। এক সপ্তাহ আগে বন্দিবিনিময়ের ফলে তালেবানের সঙ্গে স্থায়ী শান্তিচুক্তির আশা আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প বলেন, তালেবান শান্তিচুক্তি করতে চায়। এমনকি অতীতে অস্ত্রবিরতির শর্তে রাজি না হলেও তালেবান এখন আপত্তি তুলে নিচ্ছে। তার প্রশাসনও এ নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে।
অবশেষে আফগান তালেবানদের সাথে যুক্তরাষ্ট্র গত ২৯ ফেব্রুয়ারি কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং তালেবান নেতাদের উপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট ও কাবুল সরকারের যুদ্ধবিরতির ধারাবাহিকতায় একটি শান্তিচুক্তি সই হয়। আফগান বিষয়ে মার্কিন বিশেষ দূত জালমি খলিলজাদ ও তালেবানের পক্ষে মোল্লা আবদুল গনি বারদার ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তালেবানদের দেওয়া শর্ত মেনেই যুক্তরাষ্ট্র এ চুক্তিতে সই করেছে। চুক্তি অনুষ্ঠানে বিশ্বের ৩০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন, তবে আফগান সরকারের কোনো প্রতিনিধি ছিল না। যার অংশ হিসেবে আগামী ২০ সপ্তাহের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে নিজেদের প্রায় ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৪ মাসের মধ্যে অর্থাৎ আগামী মে মাসের মধ্যে আফগানিস্তান ছাড়তে হবে মার্কিন ও ন্যাটো সেনাদের। এখন থেকে আফগানিস্তানে কোনো হামলা চালাবে না তালেবান। নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে আল-কায়দাকে কোনো তৎপরতা চালাতে না দেওয়ারও অঙ্গীকার করেছে তারা। চুক্তির পর মনে করা হচ্ছে আফগানিস্তান থেকে সব সেনা সরিয়ে নেবে আমেরিকা।
আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত আফগানিস্তানের সবচেয়ে বেশি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ করেছে তালেবান। তালেবান আমেরিকার কথামতো ক্যাম্প ডেভিডে আলোচনা করায়ও রাজি হয়নি। ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্প ডেভিডেই তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের উদ্যোগে, বিতর্কিত ‘মধ্যপ্রাচ্য শান্তিচুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল ইসরায়েলের সাথে। উল্লেখ্য, গত সেপ্টেম্বর মাসে তালেবানের হিংসালীলার কারণ দেখিয়ে আমেরিকায় ক্যাম্প ডেভিডে দু-পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনা বাতিল হয়ে যায়। অতীতে তাদের যুদ্ধবিরতির মাঝে সহিংস ঘটনার সূত্রে তালেবানের সাথে শান্তি আলোচনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিনবিরোধী এই গোষ্ঠীটি আফগান সরকারকে মার্কিন পুতুল ও অবৈধ আখ্যা দিয়ে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা নয় বলে জানালেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তারা ঠিকই বৈঠক করেছে। তালেবান সব সময়ই বলে এসেছে, আফগান ভূমি থেকে সব বিদেশি সৈন্য সরিয়ে নিতে হবে এবং দেশটিতে সত্যিকার জনপ্রতিনিধিত্বকারী সরকার যেন কায়েম হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাশা, ‘দোহা চুক্তির শর্তগুলো তালেবান মেনে চলবে এবং আফগান ভূমিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা পাবে।’ তালেবানরা আশা করে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। চুক্তি অনুযায়ী আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে আমেরিকা। তবে তালেবান নেতৃত্ব আফগান সরকারের সঙ্গে কেমন আচরণ করছে সেদিকে নজর রাখবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
দীর্ঘ সময়ের দুঃশাসনে, কুশাসনে, স্বৈরশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবের মধ্য দিয়ে আফগান সমাজে নাগরিক চিন্তা-ভাবনা ও মূল্যবোধের অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। রাজনৈতিক চরিত্রেরও পরিবর্তন ঘটেছে। তাই ট্রাম্প-সূচিত যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান চুক্তির অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পরিপ্রেক্ষিতে আফগান-নারীদের ঘোষণা : ‘শান্তি চাই, স্বাধীনতাও চাই’। স্বদেশে বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি অবাঞ্ছিত, অবাঞ্ছিত বিদেশি প্রভূত্বের স্বদেশি শাসন। অবসান চাই এসবের। কিন্তু সেই সঙ্গে অব্যক্ত যন্ত্রণার্ত বাণী হলো : তালেবানি শাসনও চাই না। চাই প্রকৃত নারীবান্ধব গণতান্ত্রিক শাসন। দীর্ঘদিনের এই সংকট সমাধানের আগমুহূর্তে আশায় বুক বেঁধেছেন আফগানিস্তানের মানুষ। তাদের বিশ্বাস, আফগানিস্তানে আর কোনো সহিংস ঘটনা ঘটবে না। এ উদ্যোগকে তারা পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে স্বাগতও জানিয়েছেন।
সকলের প্রত্যাশাÑ সংঘাত নয়, সংলাপের মাধ্যমে আফগান ইস্যুর সমাধান হবে। তালেবানরা এতে রাজি হয়েছে এবং নিজেরা এখন থেকে সংলাপমুখী, উদার ও গণতান্ত্রিক হবে বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে, তারা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয়, ৫ হাজার বন্দীকে মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত আমরা আফগান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় যোগ দেব না। ঘানি ১০ মার্চ তালেবানদের এক হাজার বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার এবং আফগান সরকারকে প্রায় ৫ হাজার বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অবশেষে ক্রমাগত চাপে পড়েই কারাগারে বন্দী তালেবানদের মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দিল আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি, যাতে তালেবানদের আর হিংসাত্মক মনোভাব না বৃদ্ধি পায় এবং নতুন করে যুদ্ধ না হয় সে-কারণেই তিনি এই কাজ করেছেন। আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন আশরাফ ঘানি।
সম্প্রতি যুদ্ধক্লান্ত মার্কিন সেনারা সদা-আতঙ্কের জাহান্নাম আফগানিস্তান থেকে পালাতে চায়। যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একাধিক কারণে কাবুল থেকে সেনা সরিয়ে আনতে চান। কাবুলে শান্তি এখন আর দ্বিপক্ষীয় নয়। একাধিক শক্তির স্বার্থ এর সঙ্গে জড়িত। আফগান যুদ্ধে সরাসরি তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটো লিপ্ত থাকলেও অন্যান্য দেশ পরোক্ষভাবে জড়িত। বড় শক্তি হিসেবে রাশিয়া, চীন, ইরান, পাকিস্তান ও ভারতের স্বার্থে কারা আফগানিস্তানে ক্ষমতায় থাকবে তা নির্ভরশীল। চীন, রাশিয়ার আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার ও বাণিজ্যিক কারণে আফগানিস্তানের বিষয়ে আগ্রহী হলেও পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতময় সম্পর্ক এবং কাশ্মীর সংকটে আফগানিস্তানের ভূরাজনীতিতে ভারতের বড় রকমের স্বার্থ রয়েছে।
নাইন ইলেভেনের আগে অথবা পরে আমেরিকা যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় এগোলে লাখ লাখ আফগানি ও মার্কিন সৈন্যের মৃত্যু না ঘটিয়েই তালেবানের সাথে একটি কার্যকর শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারত। তবে দেরিতে হলেও এখন তারা তালেবানকে একটি রাজনৈতিক শক্তি মেনেই তালেবানের সাথে চুক্তি করছে। একে আমেরিকার পরাজয় ছাড়া অন্য কোনো ভাষা দেওয়া যায় না। যদিও ইতোমধ্যে আফগান জনগণ প্রথমবারের মতো একটি গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র রচনা এবং সেই শাসনতন্ত্রের অধীনে নির্বাচিত সংসদ ও রাষ্ট্রপ্রধান পেয়েছে; কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, বিশেষ করে পাক-আফগান সীমান্ত অঞ্চলে তালেবানের প্রভাব রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবান চুক্তি আশাব্যঞ্জক মনে করা হলেও, কূটনৈতিক পর্যায়ে জটিল ও কঠিন কাজ বাকি রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক সমাধানের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে মার্কিন-তালেবান সমঝোতা। মন্দের ভালো এই চুক্তিটি সত্যিকারের বিজয় অর্জিত না হলেও সুরঙ্গ শেষে আলোর পথ দেখা যেত যদি তালেবান আফগান শাষকগোষ্ঠী ও আমেরিকানদের মধ্যে অর্থাৎ ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে আগামীদিনের আফগান সকল নাগরিকের জন্য একটি ঐক্য সরকার উপহার দিতে পারত।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য