Friday, February 23, 2024
বাড়িSliderআফগানিস্তানে তালেবানদের প্রত্যাবর্তন, একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা

আফগানিস্তানে তালেবানদের প্রত্যাবর্তন, একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা

ইমতিয়াজ আহমেদ: আফগানিস্তানে তালেবানদের প্রত্যাবর্তনের ঘটনা পর্যালোচনা করতে গেলে নিঃসন্দেহে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। ব্যাপ্তির বিচারে নয়; বরং রাজনৈতিক রফা যেখানে তখন এবং এখন তালেবানরা ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল। ২০ বছর আগে তালেবানদের সঙ্গে ছিল সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আফগান মুজাহিদদের সহযোগিতায় এই তিন শক্তি একত্রিত হয়েছিল সোভিয়েতের বিপক্ষে। আর কমিউনিস্ট শাসনকে রক্ষা করতে ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তান আক্রমণ করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ দাউদ খানের নেতৃত্বে, ঘটনাক্রমে যিনি ছিলেন রাজা জহিরশাহের চাচাতো ভাই ও সোভিয়েত-বিরোধী, ১৯৭৩ সালে রাজতন্ত্র উৎখাতের পর নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে কমিউনিস্টরা তা তাদের অনুকূলে ব্যবহার করতে সমর্থ হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসে একটি রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে, যা পরিচিত পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আফগানিস্তানের নূর মোহাম্মদ তারাকির নেতৃত্বে সংঘটিত ‘সাউর বিপ্লব’ নামে। ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তারাকি আততায়ীর হাতে নিহত হন এবং ক্ষমতা চলে যায় হাফিজুল্লাহ আমিনের কাছে। কিন্তু আফগান পরিস্থিতির এত দ্রুত অবনতি হতে থাকে যে পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে নিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে আফগান আক্রমণ করে। এই হামলায় হাফিজুল্লাহ আমিন নিহত হন এবং বারবাক কারমালকে সোভিয়েতরা ক্ষমতায় বসায়। এবং এটি সোভিয়েতের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের যৌথ সমর্থনপুষ্ট মুজাহিদীনদের সহিংস আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে। প্রায় ১০ বছরের কাছাকাছি যুদ্ধের পর এবং মুজাহিদদের পরাজিত করতে ক্রমাগত ব্যর্থতার পর ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সোভিয়েত তাদের প্রত্যাহার করে নেয়।
আফগানিস্তানে সোভিয়েত হামলার ৩টি পরিণতি দেশটিতে নতুন বিন্যাস ঘটায়। প্রথমত; তালেবানদের উত্থান। সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহার এবং দেশজুড়ে নৈরাজ্যের প্রেক্ষিতে মুজাহিদীনদের মধ্য থেকে পরবর্তীতে তাদের উত্থান। দ্বিতীয়ত; ওসামা বিন লাদেন, আলকায়দা, আইএসআইএস এবং অন্যান্য উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠীকে শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত করাসহ আফগানিস্তানে সৌদিকরণ কিংবা ওহাবীয়করণ। এবং তৃতীয়ত; সহনশীল ইসলামকে সামান্য কিংবা কোনো ছাড় না দিয়েই এককতার রাজনীতির ভিত্তি তৈরি করা, যা ছিল আফগানিস্তানের অতীতকালের বৈশিষ্ট্য। যারা রবি ঠাকুরের কাবুলিওয়ালা কিংবা সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে-বিদেশে পড়েছেন, তাদের হয়তো জানা আছে যে একই পরিমাণ সরলতা, মহত্ত্ব এবং উদারতার পাশাপাশি আফগানরা কতটা অহংকারী, সাহসী এবং যুদ্ধপ্রিয় ছিল।
যা হোক, তালেবানদের উত্থানের সঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট বিষয় রয়েছে। তালেবান নেতৃত্বের বেশির ভাগ এসেছে পশতুভাষী এলাকা থেকে, যারা সোভিয়েত-বিরোধী লড়াইয়ে আহত হয়েছে। পাকিস্তানে অবস্থিত আফগান শরণার্থী শিবির থেকে বেশিরভাগ সদস্য সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু কান্দাহারের চরম নৈরাজ্যের মধ্যে একজন ধর্ষককে, একজন স্থানীয় কমান্ডার যে কি না দুজন বালক এবং একজন নারীকে বলাৎকার করেছিল, ফাঁসি দিয়ে ধর্ষিতার প্রতি তাৎক্ষণিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে তালেবানরা সুনাম অর্জন করে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তালেবানদের সুখ্যাতি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, যা কাবুলের দুর্নীতিগ্রস্ত বিচার-ব্যবস্থা করতে পারেনি। সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারে শূন্যতা সৃষ্টি হলে এবং সৌদি ও পাকিস্তানের সমর্থন পেয়ে তালেবানদের আমেরিকানপন্থি তাজিকনির্ভর উত্তরাঞ্চলীয় জোটসহ অন্যান্য অভ্যন্তরীণ আগ্রহী গোষ্ঠীগুলোকে পরাস্ত করতে বেগ পেতে হয় না এবং ১৯৯৬ সালে ক্ষমতা দখল করে।
ওসামা বিন লাদেন, আইএসআইএস এবং আফগানিস্তানের অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীকে আফগানিস্তানে আশ্রয় দেওয়ার কারণে ১৯৯৬ সালের পর থেকে তালেবান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে এবং এটি আরও খারাপ হয় বামিয়ানে বৌদ্ধদের প্রতœতাত্তিক নিদর্শন ধ্বংসের ঘটনা, সংগীত চর্চা এবং চলচ্চিত্রে নিষেধাজ্ঞা, কঠোর পর্দাপ্রথা, নারী ও মেয়েদের প্রতি কঠোর বিধিনিষেধ। আফগান গোত্রীয় কট্টর রক্ষণশীলতায় ওহাবি মতবাদের অনুপ্রবেশ ঘটায় পিতৃতান্ত্রিকতার একটি হিংস্র রূপ সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাক্রমে এটি হচ্ছে সেই সময় যখন যুক্তরাষ্ট্রে কমিউনিস্ট বিরোধিতা প্রতিস্থাপিত হয় ইসলাম-ফোবিয়া’তে এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মুসলিম জঙ্গিদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল। ‘ভালো তালেবান’ রাতারাতি পরিণত হয় ‘খারাপ তালেবানে’! যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ৯/১১-এর সন্ত্রাসী হামলা আফগানিস্তানে মার্কিন হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র তৈরি করে, যদিও এই সন্ত্রাসী হামলায় কোনো আফগান যুক্ত ছিল না। হামলার ঘটনায় বিন লাদেনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য তালেবানরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল, এমনকি তাকে তৃতীয় (নিরপেক্ষ) একটি রাষ্ট্রে হস্তান্তরের কথাও বলেছিল; কিন্তু সেটিও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তার পরিবর্তে ৯/১১-এর মাত্র এক মাস পরেই ২০০১ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে বোমা হামলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। মজার ব্যাপার হলো, এখন প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে ৯/১১-এর পর দেশের অভ্যন্তরীণ অভিঘাত এবং অসন্তোষ প্রশমিত করতে যুক্তরাষ্ট্র একটি মুসলিম রাষ্ট্রে, যে কোনো একটি মুসলিম রাষ্ট্র, বোমা হামলা চালাতে চেয়েছিল। যদিও অধিকাংশ সন্ত্রাসী ছিল সৌদি আরবের; কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল বন্ধু-রাষ্ট্র বলে তাদের ওপর হামলা করা হয়নি। আর দুর্ভাগ্যবশত ৯/১১-এর হামলার মার্কিন জবাবে ওসামা বিন লাদেনের, একজন একক মানুষ, টার্গেটে পরিণত হওয়াসহ কোপের মুখে পড়ল আফগানিস্তান।
বিমান হামলা নিশ্চিতভাবে তালেবানদের আতঙ্কগ্রস্ত করেছিল; কিন্তু ‘আমেরিকা এবং তালেবানদের মধ্যে সম্পাদিত একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার’ মাধ্যমে পূর্বতনরা আবার কাবুলে প্রবেশ করে এবং তাদের পছন্দের সরকার গঠন করে। তালেবানরা দ্রুত পালিয়ে যায় এবং গ্রামাঞ্চলের দিকে চলে যায়। আসলে তালেবানদের কিছু অংশ আশা করেছিল যে আমেরিকার আগমন আফগানিস্তানের অন্ধকারাচ্ছন্ন অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার করবে। শুরুর দিকে, সবকিছু স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল এবং সহিংসতাও যথেষ্ট পরিমাণে কমে যাচ্ছিল। কিন্তু তারপর, অন্যান্য ঔপনিবেশিক শক্তির মতোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও নির্বিচারে হত্যা ও নির্যাতন করেই শুধু নয়, তালেবান সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের নামে বাড়িঘরে ঢুকে তছনছ করে আফগানদের অপদস্ত করে। সন্দেহভাজন তালেবান সদস্য কিংবা জঙ্গি আস্তানা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলাসহ পরিচালিত বিমান হামলায় শিশু ও নারীসহ অসহায় নিরীহ মানুষ মারা গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। আবদুল হকের আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের শুরুর সময়কার তালেবানবিরোধী আফগান নেতা, যাকে পরবর্তীতে দুঃখজনকভাবে কাবুল শাসক অভিযুক্ত করে হত্যা করেছিল, একটি বিদ্রƒপাত্মক বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য :
যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করছে তার শক্তি প্রদর্শন করতে, একটি বিজয় অর্জন করতে এবং বিশ্বের সকলের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করতে। আফগানদের কষ্ট অথবা কতজন মানুষ আমরা হারালাম তাতে তাদের কিছুই যায়-আসে না। কারণ এসব আরব উগ্রগোষ্ঠীর কারণে আফগানদের এই দুর্ভোগ সইতে হচ্ছে। কিন্তু আমরা জানি, ১৯৮০ সালে কারা এসব আরবদের আফগানিস্তানে নিয়ে এসেছিল, তাদের অস্ত্র দিয়েছিল এবং তাদের একটি শক্ত ভিত্তি দিয়েছিল। এটি করেছিল আমেরিকা এবং সিআইএ। আর যখন এই বছরগুলোজুড়ে আফগানরা এসব আরব এবং তাদের মিত্রদের দ্বারা ভুগেছে, তখন যেসব আমেরিকান এগুলো করেছিল, তারা সবাই পদকে পেয়েছে এবং পদোন্নতি পেয়েছে। এখন আমেরিকা যখন আক্রান্ত হয়েছে, তখন আমেরিকার যেসব ব্যক্তি এর জন্য দায়ী তাদের পরিবর্তে আফগানদের তারা শাস্তি দিচ্ছে।
আমেরিকান ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুসারে ২০০১ সাল থেকে আফগানিস্তানে মার্কিন দখলদারিত্বের সময়কালে প্রায় ২ লাখ ৪১ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। আহতদের সংখ্যাও ছাড়িয়েছে হাজার হাজার এবং এছাড়াও রয়েছে তারা যারা আক্রান্ত হয়েছে ‘অদৃশ্য আঘাতে’। ২০০৯ সালের এক হিসাব বলছে ‘পুরো দুই-তৃতীয়াংশ আফগান মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত হামলায় ঘরবাড়ি এবং মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার মূল্যের শস্য ধ্বংস হয়েছে। প্রাণহানি এবং দেশজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ তালেবান জঙ্গিত্বের সঙ্গে ঔপনিবেশিকবাদ-বিরোধী বিক্ষোভ একাকার হয়ে প্রতিরোধের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
কিন্তু এখন এখানে প্রশ্ন তোলা উচিত, যুক্তরাষ্ট্র কি আফগানিস্তানে গিয়েছিল তালেবানদের পরাজিত করতে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে এবং সেখানকার নারী ও মেয়েদের রক্ষা করতে, না-কি সেখানে গিয়েছিল সামরিক-শিল্প গাঁটবন্ধনকে (military-industrial complex) পুনরুজ্জীবিত করতে? এখানে লক্ষণীয় যে আমেরিকার ৩৪তম প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি আইজেনহাওয়ার ১৯৬১ সালের তার মেয়াদের শেষলগ্নে বিদায়ী ভাষণে সামরিক-শিল্প গাঁটবন্ধনের ‘ধ্বংসাত্মক প্রভাব’ সম্পর্কে আমেরিকানদের সর্তক করেছিলেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে আফগান যুদ্ধটাই ছিল বেআইনি, যদিও সামরিক-শিল্প গাঁটবন্ধন এতে ব্যাপকভাবে লাভবান হয়েছিল। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে ২.২৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে অথবা ২০ বছর ধরে প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যার অর্থ দাঁড়ায় আফগানিস্তানের ৪ কোটি মানুষের জন্য মাথাপিছু ৫০ হাজার ডলার। যা হোক, বেশিরভাগ মুনাফা করেছে বোয়িং, রেথিওন, লকহিড মার্টিন, জেনারেল ডিনামিকস, নরথর্প গ্রুমান কর্পোরেশন এবং ডাইনকর্প ইন্টারন্যাশনাল, কেবিআর ও ফ্লর কর্পোরেশনের মতো বড় বড় কর্পোরেশন, যারা যুদ্ধে লড়ার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র অথবা লজিস্টিকস দ্রব্যাদি সরবরাহ করেছে। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় আরও হিসাব করে দেখেছে, আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের সুদের খরচের পরিমাণ ২০৫০ সালের মধ্যে ৬.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়াবে। আর এটি আমেরিকার সাধারণ মানুষকে খোঁচাবে, কারণ প্রতিটি মার্কিন নাগরিক প্রতি এর পরিমাণ দাঁড়াবে ২০ হাজার ডলার। আর এ কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্প আফগান যুদ্ধের ইতি টানার সিদ্ধান্ত নেন, যা শুধুমাত্র নিষ্ফলই নয়; যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য অপচয় বটে। বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান অক্ষুণœ রাখতে দেশের অভ্যন্তরে বহু কাজ করতে হবে।
দোহা শান্তি প্রক্রিয়া ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট; এটি শুরু হয় ২০১৮ সালের জুলাইয়ে এবং ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং তালেবানের মধ্যে চুক্তি সম্পাদনের মধ্য দিয়ে যার সমাপ্তি ঘটে। বিভিন্ন কারণে টুক্তিটি ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। প্রথমত; এটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং দলিলানুসারে ‘ইসলামিক এমিরেটস অব আফগানিস্তান’, যা রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত নয় এবং তালেবান হিসেবে পরিচিত, এর মধ্যে সম্পাদিত একটি চুক্তি। এটি বিরল একটি ঘটনা এ-কারণে যে একটি অরাষ্ট্রীয় এবং ‘সন্ত্রাসী’ সত্তার সঙ্গে একটি রাষ্ট্র চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। দ্বিতীয়ত; রাশিয়া, চীন এবং পাকিস্তান এই চুক্তি প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত ছিল। তারা সবাই এই চুক্তিতে সম্মত হয়েছে, যা চুক্তি অনুসারে ২০২০ সালের ১০ মার্চ জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিল কর্তৃক সর্বসম্মতভাবে অনুমোদিত হয়। তালেবানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং দোহা শান্তি প্রক্রিয়ার মূল সমঝোতাকারী কারাগার থেকে মার্কিন অনুরোধে আবদুল ঘানি বারাদার’কে মুক্তি দেওয়াতে আফগানিস্তান বিষয়ে পাকিস্তান তার অবস্থান ফিরে পেয়েছে। দোহা শান্তি আলোচনাকে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় উপনীত হতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে। তৃতীয়ত; যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল সরকার আখ্যা দিয়ে তালেবানরা তাদের সঙ্গে বসতে অস্বীকৃতি জানালে আশরাফ ঘানির নেতৃত্বাধীন আফগান সরকারকে এই শান্তি আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তালেবানদের এ অবস্থানের কিছুটা যথার্থতাও ছিল, বিশেষ করে ২০১৮ সালের আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে। ৩ কোটি ১৬ লাখ জনগণের মধ্যে মাত্র ৯৭ লাখ নিবন্ধিত ভোটার। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যালট জালিয়াতিসহ সহিংসতা এবং ব্যাপক অনিয়মের মধ্যে মাত্র ১৮ লাখ মানুষ ভোট দিয়েছিল। বিভিন্ন কারণে ঘানি সরকারের আফগানিস্তান শাসনের নৈতিক অধিকার ছিল না এবং তালেবানদের বিশ্বাস ছিল যে সীমিত সংখ্যক বাদে বেশিরভাগ আফগান তাদের সঙ্গে রয়েছে।
আক্ষরিকভাবে আশরাফ ঘানির নেতৃত্বাধীন আফগান সরকারকে না জানিয়ে ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট শেষরাতে বাগরাম এয়ারবেস পরিত্যক্ত করে যখন আমেরিকানরা আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু করে তখন এর সত্যতা প্রমাণিত হয়। তালেবানরা তখন বিনা প্রতিরোধে একের পর এক শহর দখল করে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা ৩ লাখ সৈন্য নিয়ে শক্তিশালী আফগান বাহিনী বিনা যুদ্ধে তালেবানদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। আফগান বাহিনীর সেনারা সামরিক পোশাক ছেড়ে এবং জনতার ভিড়ে মিশে যেতে এতটাই ব্যাকুল ছিল যে নির্ধারিত সময়ের প্রায় দু-সপ্তাহ আগেই তালেবানদের অরক্ষিত কাবুল শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে হয়। আশরাফ ঘানি গোপনে পালিয়ে যায় এবং এক বা একাধিক দেশ পেরিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আশ্রয় গ্রহণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কার্যত তালেবানদের সম্মতিতেই কাবুলের হামিদ কারজাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কারণে যারা দেশ ছেড়ে পালাতে চায়Ñ এ-রকম হাজার হাজার আফগানদের নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। দেশ ছেড়ে যেতে এবং পশ্চিমা দেশে থিতু হতে ভীতসন্ত্রস্ত আফগানদের যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী যে সাহায্যের চেষ্টা করছে, তার প্রতি বিশ্ব মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সহানুভূতি আদায়ের জন্য এই বিশৃঙ্খলার কিছুটা ইচ্ছেকৃতভাবে তৈরি হতে পারে। পরিশেষে বিমান বন্দরের এই চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনাও ঘটতে দেখা যায়, যাতে ১৩ মার্কিন সেনাসহ অন্ততপক্ষে ১৭৫ জন নিহত হয়েছেন, যার দায় ইসলামিক স্টেট ইন খোরাসন প্রভিন্স (আইএসকেপি) দাবি করেছে। যা হোক, আত্মঘাতী হামলার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও ছিল একই রকম ভয়াবহ ও বেদনাদায়ক, যেখানে আইএসকেপি’র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ড্রোন হামলায় একই পরিবারের ১০ জন আফগান নিহত হয়, যার মধ্যে চারজনের বয়স দুই থেকে চার বছরের মধ্যে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আফগান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের শেষ দিনগুলোর কথা যখন স্মরণ করা হবে তখন আইএসকেপি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের কথাটিও অনেকে স্মরণ করবে।
কিন্তু এই ড্রোন হামলা অন্যকিছুর ইঙ্গিত দেয়। একটি হচ্ছে প্রস্তুতিতে যুদ্ধের রূপ এবং সামরিক-শিল্প গাঁটবন্ধনের ক্ষমতা। দ্বিতীয়ত; তালেবানের এ সত্যটির প্রতিও তালেবানদের সজাগ থাকতে হবে যে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার পুনরায় প্রবেশের ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে অন্যভাবে, যদি এবং যখন প্রয়োজন পড়বে। তৃতীয়ত; এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এটি কারও জন্য এত সহজ নয়, একটি পরাশক্তির জন্য তো নয়ই অপমান সহ্য করতে পারা। সুতরাং আমেরিকার জনগণ, বিশেষ করে যারা হাল ছেড়ে দিতে অথবা বিশ্বে আমেরিকার বর্তমান অবস্থার যে পরিবর্তন ঘটেছে সেটি মানতে নারাজ, তাদের অহমের তুষ্টির জন্য সামরিক শক্তিমত্তার প্রদর্শন জরুরি হয়ে পড়েছে। তার মানে হচ্ছে, নিকট-ভবিষ্যতে স্থিতিশীল আফগানিস্তান দূরাশামাত্র। বাস্তবিক অর্থে তালেবানদের অধীনে আফগানিস্তানে যে কোনো ধরনের স্থিতাবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে আরও সমালোচনা তৈরি করবে এবং শাসক দলের দুর্ভাগ্যক্রমে ডেমোক্রেটসদের, সম্ভাবনাকে, সরকারের আইন বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগে ক্ষমতা ফিরে পাওয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ভিন্নভাবে দেখলে, মার্কিন বৈরিতার মুখে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা হবে তালেবানদের বড় চ্যালেঞ্জ, যা কি না পরবর্তীতে বিস্তৃত হতে পারে আফগানিস্তানের ব্যাংক সম্পদ জব্দ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপে এবং দেশ বাঁচানোর নামে তালেবানবিরোধী শক্তিসমূহের তৎপরতার সুযোগ সৃষ্টিতে।
যা হোক, প্রত্যাহার-উত্তর যুক্তরাষ্ট্র-আফগান সম্পর্ক একটি ভিন্ন খাতে মোড় নিয়ে কিছুটা নমনীয় ও বন্ধুত্বপূর্ণ হতে পারে এবং এর মধ্যে হতে পারেÑ এক. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ কোনো ঘটনায় জেগে উঠতে পারে এবং যুদ্ধ ও বিরোধ থেকে মুনাফা অর্জন বন্ধে সামরিক-শিল্প গাঁটবন্ধনকে বাধ্য করতে পারে; দুই. আফগান পরাজয় স্মৃতি থেকে মুছে ফেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে সম্পৃক্ত হতে পারে, যেমনটি করেছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের বেলায়। আগে আদর্শবাদের কথা বলে, পরে বাস্তবতার দোহাই দিয়ে। কিন্তু পরিশেষে উভয়পক্ষকে খুশি করার জন্য এটি হতে পারে উভয়ের সমন্বয়ে।
তালেবানদের প্রত্যাবর্তনে একান্ত পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রসমূহে কি কোনো আশু প্রভাব ফেলবে? প্রথমেই পাকিস্তানের কথা মনে আসবে, আফগানিস্তানের সঙ্গে দেশটির ২ হাজার ১৬০ কিলোমিটার সীমান্ত থাকার কারণে নয়; বরং তালেবান সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে দেশটিকে যে দোষের সম্মুখীন হতে হয়েছে সে-কারণে। নিশ্চিতভাবে এর সত্যতাও কিছুটা রয়েছে। দৃশ্যমান কারণের মধ্যে রয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-র নির্দেশে পরিচালিত পাকিস্তানের ভেতরে অবস্থিত শরণার্থী শিবিরের মক্তবসমূহ (মুসলিম প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র) যেগুলোর শিক্ষা পদ্ধতি ব্যাপকভাবে সালাফি এবং ওহাবি ঘরানার ইসলাম দ্বারা প্রভাবিত। পরবর্তীতে সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ প্রচেষ্টায় আফগানিস্তান থেকে কমিউনিস্টদের উৎখাতে উভয় দেশের নির্দেশনায় সমানভাবে প্রভাবিত হয়েছে। বাস্তবিক, কম মূল্যে তেল সংগ্রহ নিশ্চিত করতে এবং কমিউনিজমকে প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে সমর্থন দেয় এবং পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ওহাবি মতবাদের বিস্তারে তাদের দোসরে পরিণত হয়। পরিণতির কথা না ভেবে পাকিস্তান তড়িঘড়ি করে ঈশ্বর-বিরোধী সোভিয়েতের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসী’দের দলে যোগ দেয়। বিগত ২০ বছর ধরে এবং এমনকি তার পূর্ব থেকেও আফগানিস্তানের যুদ্ধ ও দ্বন্দ্বের কারণে পাকিস্তানকে ভুগতে হচ্ছে। এক হিসাবে দেখা যায়, উত্তর পাকিস্তানভিত্তিক আলকায়দা এবং তালেবান শক্তির বিরুদ্ধে ২০০৪ সালে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের আংশিক-গোপন ড্রোন অভিযানে ২৩ হাজার সাধারণ মানুষসহ ৫৬ হাজার ৬৬১ জন পাকিস্তানি নিহত হয়। অধিকন্তু, ১৪ লাখ আফগান দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং পাকিস্তানের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়। এই যুদ্ধের ব্যয়ভার পাকিস্তানকে বহন করতে হয়, যদিও তারা নিশ্চিত নয় যে এটি এই এলাকাকে অস্থিতিশীল করার তৎপরতাকে নিবৃত্ত রাখবে এবং নতুন করে তাদের জন্য আর কোনো সংকট সৃষ্টি করবে না; বরং পাকিস্তান আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা চেয়েছিল, যা কি না সম্ভবত দোহা শান্তি প্রক্রিয়াকে সফল করতে এতটাই আসন্ন করে তুলেছিল। সেখানে অবশ্যই পাকিস্তানের সামরিক স্বার্থও ছিল, যাতে জাতীয় এবং আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব ও শত্রুতা থেকে সমানভাবে লাভবান হয়। পাকিস্তানের জনগণ এবং রাজনীতিবিদরা সামরিক বাহিনীকে কতটা তাদের ব্যারাকে ধরে রাখতে পারবে, সেটিও একটি লক্ষণীয় বিষয়।
ভারতের আফগাননীতি অনেকটাই পাকিস্তানকেন্দ্রিক এবং সেখানেই এর দুর্বলতা। নেতিবাচক একটি অবস্থানে থেকে একটি দেশ কিংবা তার জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা, এমনকি সহযোগিতা করা সব সময় একটি ভ্রান্ত ধারণা। কূটনীতির সারকথাটি যা নীতি-নির্ধারকরা পরে প্রায়ই ভুলে যান, মূলত আদর্শগত এবং বিভিন্ন বিষয়ে পূর্বোক্ত ধারণা আঁকড়ে থাকার জন্য। প্রকৃতপক্ষে, গত ২০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি এবং কাবুলের পুতুল সরকারের ওপর আস্থা রেখে ভারত তার সবগুলো ডিম এক ঝুঁড়িতে রেখেছে। এটি সান জু থেকে শুরু করে চাণক্য কৌটিল্য পর্যন্ত কূটনীতির সব চিরায়ত শিক্ষার পরিপন্থী। এর পরিণতি ভালো কিছু হতে পারে না। তালেবানরা ফিরে দেখে যে ভারতীয় কর্মকর্তারা দ্রুত তাদের মিশন এবং কান্দাহার, মাজার-ই-শরিফ, জালালাবাদ ও হেরাত থেকে কনস্যুলেট গোটাতে ব্যস্ত।
যদিও দুটি বিষয় রয়েছে বিভ্রান্তিকর। প্রথমত; ভারতীয় মিশন কয়েকবার আত্মঘাতী বোমা হামলার শিকার হয়েছেÑ ২০০৮, ২০০৯ এবং ২০১৪ সালে। তারপরও তারা না তাদের অফিস পরিত্যাগ করেছে, না কাবুলে অবস্থানরত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত তার সহকর্মীসহ দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। কিন্তু এবার এটি ঘটেছে, সম্ভবত তারা আগে থেকে ভেবেছে তালেবানদের বিশ্বাস করা যায় না, বিশেষ করে পাকিস্তান যখন তার পাশে। কূটনৈতিক সম্প্রদায়ের কোনো ক্ষতি হতে দেবে না এবং তালেবানরা তাদের নিরাপত্তা প্রদান করবে মর্মে তালেবানদের নিশ্চয়তা প্রদান সত্ত্বেও, কী ভারতকে এমন একটি শঙ্কিত অবস্থানে নিয়ে গেল। অবশ্যই তালেবানদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ভারতের ছিল না। এটি আমার কাছে দ্বিতীয় ধাঁধা।
জাতিসংঘ এবং তালেবান দোহা শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এবং তারপর ২০২০ সালের মার্চে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সেই চুক্তি সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন দিয়েছে। এ সময়টাতে ভারত কী করছিল? তারা কি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছিল এবং ট্রাম্প যদি জিতে ফিরে আসে কিংবা জো বাইডেনের নতুন সরকার উভয় কর্তৃক দোহা চুক্তি বাতিলের সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিল? কেননা বাইডেন হচ্ছে সেই ৭৭ জন সিনেটরের একজন, যারা প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে ইরাকে সামরিক শক্তি প্রয়োগের কর্তৃত্ব দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধনীতির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা এবং ক্ষমতাসীন দলের আদর্শিক অবস্থান ভারতের আফগাননীতির সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের ব্যাখা দিতে পারবে। তবে আফগানিস্তানে বিনিয়োগকৃত ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অক্ষত রাখতে ভারতের দক্ষ কূটনীতিকবৃন্দ আর দেরি না করে দ্রুত সাম্প্রতিক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা নিশ্চিতভাবে করবে। ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট দোহাতে অনুষ্ঠিত তালেবানের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকের মাধ্যমে তার কিছু লক্ষণও ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। বিল ক্লিনটনের একটি কথা এখানে সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য, ‘এটিই হচ্ছে অর্থনীতি, বোকা!’ আফগানিস্তানে ভারতের বিনিয়োগের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্বও তালেবানদের। কিছু সংখ্যক তালেবান সদস্য দেরাদুনে ভারতের সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিল, ভারতের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা যদি এর সদ্ব্যবহার করতে পারে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার এবং তালেবানের প্রত্যাবর্তন রাশিয়া এবং চীনের অনুকূলে নতুন ভূ-রাজনীতির জন্ম দিয়েছে। যা হোক, অনেকটা নির্ভর করবে তালেবানদের অধীনে আফগানিস্তান কতটা স্থিতিশীল হবে তার ওপর। অতীতে তারা আফগানিস্তানকে তার প্রভাব বলয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং তালেবানদের কাছে অপদস্ত হয়েছিল এবং এখন যুক্তরাষ্ট্রও একইভাবে অপদস্ত হয়েছে। তাই রাশিয়াকে এখন আর সেই অপবাদ এবং গ্লানি বহন করতে হবে না বলে রাশিয়ার উৎফুল্ল হওয়ার কারণ অনেক আছে। কিন্তু খুশির আরও কারণ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে উভয়ের স্বার্থে আফগানিস্তানের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক নবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য ‘উত্তর-আধুনিক’ ইসলামি রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে রাশিয়া ২০ বছর আগের চেয়ে এবার তালেবানদের সঙ্গে যে কোনো ধরনের চুক্তি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে।
বিগত ২০ বছরে চীনও বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে এবং লেনদেনে উত্তরণ ঘটিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের বিষয়টি তখন আসে যখন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের পুনরুত্থানকে প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়। আমি বলছি ‘পুনুরুত্থান’, কারণ ১৮ শতকে চীন ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম অর্থনীতি। দুই শতক ধরে অবস্থান হারালেও দেং শিয়াও পিং-এর নেতৃত্বকালে (১৯৭৮-১৯৮৯) তার উদ্ভাবনী কৌশলে চীন তার ভাষার সদ্ব্যবহার করতে সক্ষম হয় এবং পুঁজিঘেঁষা কমিউনিজম (পধঢ়র-পড়সসঁহরংস) নামের অনবদ্য একটি রাজনৈতিক অর্থনীতির জন্ম দেয়। অন্যথায় চীনকে একটি বৈরিতাপূর্ণ ও অনাকাক্সিক্ষত এমনকি আধিপত্যবাদী সমাজের জন্ম দিয়ে বহির্শক্তি ভাবমূর্তি নিয়ে থাকতে হতো। চীন নিশ্চিতভাবে এখন আর কমিউনিজম রপ্তানি করতে চায় না। এতে তালেবানরাও আশ্বস্ত, কারণ অবকাঠামোগত উন্নয়নে চীনের সাহায্য তাদের প্রয়োজন, যা চীন দিতেও প্রস্তুত। যদি তারা নিশ্চয়তা পায় যে আফগানিস্তানের সঙ্গে ৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত, ওয়াখান করিডোর তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হবে না, সীমান্তে নৃতাত্ত্বিক মুসলিম উইঘুর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে চীনের আচরণ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সমালোচনা সত্ত্বেও। আবারও এর দায়িত্ব নির্ভর করছে তালেবানদের ওপর, যদি ওয়াখান করিডোরের সদ্ব্যবহার তারা করতে চায় এবং তাদের স্বার্থে প্রাচীন সিল্ক রোডকে পুনরুজ্জীবিত করতে চায়। কিন্তু তারপরও বিবদমান যুক্তরাষ্ট্র-চীন বৈরিতা, চীনের অনুকূলের এই ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা কীভাবে দেখছেÑ সেটিও একটি বিবেচ্য বিষয়।
তালেবানদের প্রত্যাবর্তন ভূ-রাজনৈতিকভাবে সম্ভবত ইরানেরও অনুকূলে রয়েছে, যা পরবর্তীতে পুবের নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসা এবং বিনিয়োগের একটি লাভজনক সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। এটিও যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের একটি মাথাব্যথার কারণ হতে পারে, বিশেষ করে ইসরায়েলের যেহেতু তারা ইতোমধ্যে শিয়া বলয়ের হুমকির মুখে রয়েছে। একই সময়, অধিক চর্চিত লিঙ্গ-সম্পর্ক মোকাবিলাসহ একটি সামাজিক-রাজনৈতিক সিস্টেম গড়ে তুলতে ইরান তালেবানদের জন্য একটি মডেল হতে পারে, যা কি না নষ্ট হয়েছিল ২০ বছর আগে যখন ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে ওহাবি জঙ্গিরা বিশ্বজুড়ে তাদের নিজস্ব ধরনের জিহাদের প্রসার ঘটাতে গিয়ে তালেবানদের মিত্রহীন করেছিল। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বাধীন সৌদি আরবও ২০ বছর আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি ভিন্নতর। শিক্ষা পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন, নারীর গাড়ি চালানো ও কর্মক্ষেত্রে অধিক সংখ্যায় মহিলাদের অংশগ্রহণ এবং জনগণের উপভোগের জন্য বিনোদন ব্যবস্থা উন্মুক্তকরণসহ, সৌদি আরব আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি সহনশীল। ২০ বছর আগের সৌদির প্রভাবের চেয়ে এটি তালেবানদের গুণগতভাবে ভিন্নরকম প্রভাবিত করতে বাধ্য করবে।
বাংলাদেশের কী হবে? স্থানিক দূরত্ব এবং সরকারি নীতির কারণে কয়েক দশক ধরে আফগানিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে পার্থক্য তৈরি হয়েছে। কেউ বলতে পারেন বহু শতাব্দী ধরে বাংলা এবং বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে আফগানদের একটি অসাধারণ সম্পর্ক ছিল। বিপরীত দিকে কম হলেও, কিছু সংখ্যক বাংলাদেশি ভালোবেসে মনে রেখেছে আফগানদের আতিথেয়তার কথা যখন ১৯৭১ সালে তারা সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিল। তবে বড় ধরনের কোনো বাণিজ্যিক লেনদেন হয়নি, আসলে ২০২০ সালের অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ মাত্র ১৪৫ লাখ ডলার; বাংলাদেশ রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি করেছে; সম্পর্ককে গভীর করতে প্রণোদনা ছিল খুবই সামান্য। আবার বাংলাদেশ থেকে আফগানিস্তানে রপ্তানি মূলত ফার্মাসিউটিক্যাল এবং শাক-সবজি জাতীয় পণ্যের মধ্যে সীমিত ছিল, যা ২০২১ অর্থবছরে ছিল মাত্র ৮৬.৪ লাখ ডলার, যেখানে ২০২০ সালের অর্থবছরে আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে ৯২.৭ লাখ ডলারের পণ্য, প্রধানত খনিজ এবং রাসায়নিক পণ্য।
কিন্তু সোভিয়েত আক্রমণের পর, আফগানিস্তান বাংলাদেশে একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়, তবে মজার বিষয় হচ্ছে যে সরকারের পক্ষ থেকে আক্রমণের ব্যাপারে খুব একটা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি। আসলে খুবই সামান্য, তবে আফগানিস্তানে কম্যুনিজম প্রতিরোধে সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে মুষ্টিমেয় মুজাহিদপন্থি সমর্থকের সাড়া বেশি ছিল। আফগান থেকে সোভিয়েতের প্রত্যাহারের পর এবং তালেবানের ক্ষমতা গ্রহণের পর তথাকথিত সেই আফগান যোদ্ধারা আফগানিস্তান থেকে দেশে ফিরে হুজি-র (হরকাতুল জিহাদ অব বাংলাদেশ) ব্যানারে ‘আমরা হবো তালেবান, বাংলা হবে আফগান’ সেøাগান দিয়ে সহিংস রাজনীতি শুরু করে। কিন্তু সন্ত্রাসের প্রসঙ্গ এলে আমাদের মনে রাখতে হবে যে রাষ্ট্রীয় মদদ ছাড়া বড় ধরনের কোনো সন্ত্রাসী হামলা সম্ভব নয়। এ-ধরনের মদদে সরকারের ভেতরের ব্যক্তিবিশেষ বা কোনো মহলবিশেষ সন্ত্রাসকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হয় জঙ্গিদের ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করে এবং সহনশীল থাকে অথবা কথাবার্তা ও কাজের মাধ্যমে তাদের উৎসাহিত করে। প্রকৃতপক্ষে, ২০ বছর আগে, এ-ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনায় রাষ্ট্রীয় মদদের কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার এ দৃশ্যপটটি একদম বদলে গেছে, বিশেষ করে ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলার পর। বাংলাদেশে সন্ত্রাস এবং সশস্ত্র জঙ্গিবাদকে প্রতিহত ও মোকাবিলা করতে কয়েকটি সংস্থা তৈরি করাসহ বর্তমানে সন্ত্রাসের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে রাষ্ট্র। কার্যত, এ কারণে আফগানিস্তানে তালেবানের প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেÑ এ ধারণাকে উড়িয়ে দেওয়া যায়, কারণ এর কোনো ভিত্তি নেই। প্রকৃতপক্ষে, ঢাকার পুলিশ কমিশনার (ডিপিসি) যখন মিডিয়াকে বলেছে যে ‘বিনির্মাণ-প্রক্রিয়ায়’ অংশগ্রহণের জন্য কিছু সংখ্যক বাংলাদেশি কাবুলের উদ্দেশে দেশ ত্যাগ করেছে এবং ভারতে আটক হয়েছে, তখন কোনো তথ্য-প্রমাণ প্রদান করা হয়নি। এটি একটি মজার ব্যাপার। কারণ ডিপিসি, স্থানীয় পুলিশি তৎপরতার অংশ হিসেবে সীমান্তের বাইরে বাংলাদেশি সন্ত্রাসবাদের যদি হয়ে থাকে, গোপন প্রতিবেদন প্রকাশের অধিকার রাখে না, যদিও তার বক্তব্য দেশে এবং দেশের বাইরে মিডিয়া চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, বিগত ২০ বছরে যখন তালেবানদের সবচেয়ে খারাপ সময় গেছে এবং বেশি প্রয়োজন ছিল তখন কোনো বাংলাদেশি আফগানিস্তানের জন্য দেশ ছেড়ে যায়নি। আর তালেবানরা আমন্ত্রণ না করলে এখনই বা তারা যাবে কেন? আমরা আশা করি, সরকারি কর্মকর্তা এবং মিডিয়া আরও অনেক বেশি দায়িত্বশীল এবং প্রমাণনির্ভর হবে। এর ব্যত্যয় হলে বাংলাদেশের একটি নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হবে এবং দেশি এবং বিদেশি উভয় উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত করবে। যা হোক, তার মানে এই নয় যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ তার অবস্থান আলগা করবে। প্রকৃতপক্ষে, সমকালীন সন্ত্রাসবাদের প্রকৃতি অনুসারে, কোনো দেশই সেটি করতে পারে না। কিন্তু তার জন্য ভুল বিপদসংকেত দেওয়ার দরকার নেই, বিশেষ কর যখন এ-ধরনের সংকেত বাংলাদেশের একটি নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে এবং দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশকে এখন অপেক্ষা করতে হবে এবং দেখতে হবে আফগানিস্তানে কী ধরনের সরকার গঠিত হয়, নিকটবর্তী প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো কীভাবে তাতে সাড়া দেয়, বাকি বিশ্ব কীভাবে তাতে সাড়া দেয়। তারপর আফগানিস্তানের তালেবান-শাসিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, কারণ এ অঞ্চলের অন্য অনেক দেশের মতো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু একই সময়ে তালেবানরা যদি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারে এবং একটি স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ তার অন্যের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের নীতির আলোকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং মানব উন্নয়নের একটি শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি করে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে।
পরিশেষে, খুবই প্রাসঙ্গিক যে প্রশ্নটি কেউ এড়াতে পারে না : তালেবানরা কি আসলেই বদলে গেছে? তাদের কি বিশ্বাস করা যায়? সন্ত্রাসবাদ এবং নারীর প্রতি সহিংসতা থেকে তারা কি নিবৃত্ত থাকবে? সবচেয়ে সহজ উত্তরটি হতে পারে : হ্যাঁ এবং না! নেতৃবৃন্দ নিশ্চিতভাবে অনেক বেশি সজাগ থাকবে; কিন্তু অধস্তনরা যে শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে আগত নির্দেশাবলি সব সময় মানবে তার কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। যদিও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে তালেবানদের মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে, বিশেষ করে তালেবানরা যেভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং জনসম্মুখে বক্তব্য দিচ্ছে। কিন্তু তারপর, অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি নেতৃত্বকে অনেক বেশি সংকীর্ণ এবং শঙ্কিত করে তুলতে পারে এবং ভয় থেকে, যেমনটি ১২ শতকের আন্দালুসিয়ান প-িত ইবন রুশদ বলেছিলেন, অসহিষ্ণুতা এবং হিংস্রতার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে বিগত ২০ বছরে বাস্তবতা বদলে গেছে। কিন্তু সমস্যাটি পরিবর্তনশীল বাস্তবতার মধ্যে নয়, এটি নিহিত নয়, রয়েছে মানসিক গড়নে, যা কি না ধারণ করা এবং রাতারাতি বদলে ফেলা কঠিন। আর ভয়টা হচ্ছে সেখানেই; কিন্তু এটিও একটি কারণ কেন তালেবানদের সহনশীলতা এবং শ্রদ্ধাবোধের তালিমের প্রতি বেশি দৃষ্টি দেওয়া উচিত। সম্ভাবনাটাও সেখানেই; কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আফগানিস্তানের জনগণ কি সেটি চর্চার সুযোগ পাবে? ইরানি বিপ্লবের শুরুর দিনগুলোর মতোই মিশেল ফুকোর অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ পর্যবেক্ষণ আমরা আশা করতে পারে এবং স্মরণ করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের পরাজয়ে এবং আফগানিস্তানে তালেবানের প্রত্যাবর্তনে এখনও সমভাবে প্রযোজ্য :
বুদ্ধিবৃত্তিক কল্পনার চেয়ে পৃথিবীতে অনেক ধারণা রয়েছে। আর ‘রাজনীতিকের’ চিন্তার চেয়ে এ ধারণাগুলো অনেক সক্রিয়, শক্তিশালী, অনেক বেশি প্রতিরোধক্ষম, অনেক বেশি আবেগতাড়িত। আমাদের থাকতে হবে সেখানে ধারণার জন্মের সময়, তাদের শক্তির বাহ্যিক বিস্ফোরণে : বইয়ের প্রকাশে নয়; কিন্তু এই শক্তির উদ্ভাসনের ঘটনায়, ধারণার চারপাশে তাদের পক্ষের অথবা বিপক্ষের সংগ্রামে। ধারণা বিশ্বকে শাসন করে না। কিন্তু এটি এ কারণে বিশ্বের ধারণা আছে (এবং কারণ এটি প্রতিনিয়ত তাদের সৃষ্টি করে) যে যারা এর নেতা অথবা কী চিন্তা করা উচিত, যারা এটি শেখাতে চায়, শেষবারের মতো তাদের দিয়ে এটি নিষ্ক্রিয়ভাবে শাসিত হয় না।

লেখক : প্রফেসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং পরিচালক, সেন্টার পর জেনোসাইড স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুবাদ : মো. সাদিকুর রহমান চৌধুরী পরাগ

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য