Saturday, July 13, 2024
বাড়িSliderআওয়ামী লীগের শক্তির উৎস

আওয়ামী লীগের শক্তির উৎস

আওয়ামী লীগ মানে আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-আদর্শ সুরক্ষা। আওয়ামী লীগ মানে দেশের উন্নতি, সমৃদ্ধি, সাফল্য ও অগ্রগতি। আওয়ামী লীগ মানে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের শান্তি, সম্প্রীতি, সহাবস্থান।

ড. হারুন-অর-রশিদ: আওয়ামী লীগ এদেশের বৃহত্তম, অন্যতম প্রাচীন, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শে বিশ্বাসী ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠা থেকে বর্তমান পর্যন্ত সাত দশকেরও অধিক দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগ জাতীয় রাজনীতির অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্বদান করে আসছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের মাধ্যমে আমরা মহান স্বাধীনতা পেয়েছি। প্রতিষ্ঠা পায় বাঙালির জাতিরাষ্ট্রÑ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগের ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস। আওয়ামী লীগের ইতিহাস বাঙালি জাতির জাতীয় মুক্তির ইতিহাস। আমাদের মহান স্বাধীনতা ও বাঙালির জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। আওয়ামী লীগের ইতিহাস আমাদের জাতীয় উন্নয়ন, অগ্রগতি-সমৃদ্ধি, অর্জন-সাফল্যের ইতিহাস। এতসব অর্জন আর দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের আসনে থাকার পেছনে শক্তির উৎস কীÑ সংক্ষেপে সে-বিষয়ে আলোকপাত করাই বর্তমান লেখার উদ্দেশ্য।
৭৪ বছর পূর্বে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শুরু দিকে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার কে.এম দাস লেনের ‘রোজ গার্ডেন’-এ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা। যাদের উদ্যোগে এই দলের প্রতিষ্ঠা তারা ছিলেন ঢাকার নবাব পরিবার বা আহসান মঞ্জিলের বিপরীতে ভারত বিভক্তির পূর্বে পুরান ঢাকার ১৫০নং মোগলটুলি পার্টি হাউসকে কেন্দ্র করে সংগঠিত বঙ্গীয় মুসলিম লীগের ‘প্রগতিশীল গ্রুপ’ নামে পরিচিত সোহরাওয়ার্দী-হাশিম সমর্থক। ঐ পার্টি হাউস বা কর্মীশিবিরের প্রধান ছিলেন শামসুল হক (যিনি টাঙ্গাইলের শামসুল হক হিসেবে খ্যাত)।
১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক মাস পর অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা থেকে পূর্ব বাংলায় চলে এসে মোগলটুলি পার্টি হাউসে ওঠেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ভর্তি ফরমে ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল ১৫০, মোগলটুলি, ঢাকা। এটি ছিল তার বন্ধু শওকত আলী ওরফে শওকত মিয়ার বাড়ি। সেপ্টেম্বর মাসেই কিছু সংখ্যক বামপন্থি ‘রাজনৈতিক কর্মী’দের উদ্যোগে ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বঙ্গবন্ধু ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম। তবে কিছুদিনের মধ্যে তিনি এ সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেন। কারণ, বাস্তব পরিস্থিতিকে বিবেচনায় না এনে সংগঠনের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের ‘অতি বামপন্থা’ অবলম্বন। অতঃপর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সাড়ে চার মাসের মধ্যে তারই উদ্যোগে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা লাভ করে ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ (বর্তমান বাংলাদেশ ছাত্রলীগ)। সোহরাওয়ার্দী-হাশিম সমর্থকদের উদ্যোগেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ২২ মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ (২৩ জুন ১৯৪৯; বর্তমানে যা ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’)। বঙ্গবন্ধু ছিলেন এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। কারাগারে বন্দি অবস্থায় তিনি নতুন এই দলের যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা ভাসানী আর সাধারণ সম্পাদক (টাঙ্গাইলের) শামসুল হক।
তখন বিরোধী দল প্রতিষ্ঠা কিছুতে সহজসাধ্য ছিল না। মুসলিম লীগ শাসকগোষ্ঠীর রোষানল মোকাবিলায় দলের নামের সঙ্গে ‘মুসলিম’ শব্দ ব্যবহার এবং মওলানা ভাসানীর মতো একজন ‘আলেম’কে সভাপতি করা ছিল সময়ের প্রয়োজন। ভারত বিভাগ পূর্বে তিনি রাজনীতি করেছেন আসামে এবং সেখানকার ভাসানচরের কৃষক আন্দোলনের নেতা হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন ঠিকই, তবে তাকে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা বলা যাবে না।
‘আওয়াম’ শব্দের অর্থ ‘জনগণ’। জনগণের মধ্য থেকেই এই দলের সৃষ্টি। তাই, প্রতিষ্ঠাগতভাবে আওয়ামী লীগ হচ্ছে জনগণের দল। দীর্ঘ ৭৪ বছরের পথচলায় আওয়ামী লীগ কখনও জনবিচ্ছিন্ন হয়নি। বরং জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা ও সমাজ-চাহিদা বিবেচনায় রেখেই প্রধানত বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐ দীর্ঘ পথ চলে আসছে। জনগণই হলো আওয়ামী লীগের শক্তির মূল উৎস। যে কারণে, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের যে সংবিধান রচিত হয়, এর ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।’ বঙ্গবন্ধুকন্যা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নামের সঙ্গে ‘জননেত্রী’ অভিধা যুক্ত। একই চিন্তা-চেতনা ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ আওয়ামী লীগ খাদ্য সংকট, বন্যা-খরা-প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি (কোভিড-১৯) সদাসর্বদা জনগণের পাশে এসে দাঁড়ায়। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের কোভিড মহামারির সময় অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ এবং মাঠের ফসল কৃষকদের ঘরে তুলতে সাহায্যার্থে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাশে দাঁড়াতে দেখি। এছাড়া, অনাথ, বয়স্ক, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা নারী ইত্যাদি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নিয়মিত ভাতা প্রদানের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তার বিধান শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন প্রথম আওয়ামী লীগ সরকার (১৯৯৬-২০০১)-এর সময়ই সর্বপ্রথম হয়েছে এবং জাতীয় বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়। কোনো মানুষ যেন গৃহহীন না থাকে, সে-লক্ষ্যে তার নেতৃত্বাধীন সরকারই সরকারি খরচে গৃহ নির্মাণ করে লক্ষ লক্ষ গৃহহীন অসহায় মানুষের মাঝে তা বরাদ্দ দিয়ে নজির সৃষ্টি করছে। গ্রামীণ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে তার সরকারই সারাদেশে ১৮ হাজার কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছে। এটি অন্যান্য দেশে অনুকরণের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সম্প্রতি এ মর্মে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। দেশের প্রায় শতভাগ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। হতদরিদ্র্যের হার বিস্ময়করভাবে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ৫.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। আজ গ্রামের মানুষও শহরের মতো নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। দেশব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর ৪০ কোটির মতো পাঠ্যপুস্তক সরকারি খরচে ছেপে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। পুরুষদের মতো তাদের সকল নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। অধিকন্তু, জনসংখ্যার অর্ধেকাংশকে গৃহকোণে সীমাবদ্ধ রেখে জাতির সার্বিক উন্নয়ন যে সম্ভব নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই, অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী সরকারের সময় সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন যে মাত্রায় ঘটেছে, তা বিশ্বব্যাপী বিপুলভাবে প্রশংসিত।
রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের শক্তির আরেকটি উৎস হলো বাস্তববাদিতা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শ ও বাঙালির জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হলেও, এ লক্ষ্যে সময় নিয়েছে বা যথোপযুক্ত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ শাসকগোষ্ঠীর বৈরী আক্রমণ মোকাবিলায় শুরুতে দলের নামের সঙ্গে ‘মুসলিম’ শব্দটি ছিল বটে, তবে ’৪৮-’৫২-র ভাষা আন্দোলন এবং ’৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনোত্তর অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া মাত্র, দলের নাম থেকে তা বাদ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের দরজা সকলের জন্য উন্মুক্ত বা অসাম্প্রদায়িকীকরণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধোত্তর ১৯৭২ সালের সংবিধানে অসাম্প্রদায়িকতাকে (‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র নামে) রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান আদর্শিক ভিত্তি (Ideational foundation) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী একদল ঘাতক-খুনির হাতে জাতির পিতা ও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্রষ্টা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে অত্যন্ত নির্মম-নিষ্ঠুরভাবে প্রাণ দিতে হয়। এর পূর্বে বিরোধী পক্ষের চরম সন্ত্রাসী ও নৈরাজ্য সৃষ্টিজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং তার দ্বিতীয় স্বপ্ন উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ‘দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো’র লক্ষ্যে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রায় সব দল ও ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) গঠন করেছিলেন। কিন্তু তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সুযোগ ঘাতক-খুনি চক্র দেয়নি। অতঃপর, জেনারেল জিয়ার শাসন আমলে (১৯৭৫-১৯৮১) ‘রাজনৈতিক দলবিধি’ (পিপিআর)-এর আওতায় ১৯৭৬ সালে দল পুনরুজ্জীবনের সুযোগ এলে, পরিবর্তিত অবস্থার নিরিখে ‘বাকশাল’ নামের পরিবর্তে পূর্বের ‘আওয়ামী লীগ’ নামে সেটি করা হয়।
দল হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক বিস্তার ঘটে। তার নেতৃত্বেই আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ষাটের দশকের শেষে আওয়ামী লীগ বাঙালির জাতীয় মুক্তির মঞ্চে পরিণত হয়। মাঝে ৬-দফা কর্মসূচি, ’৬৯-এ আইয়ুববিরোধী গণ-অভ্যুত্থান এবং এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের নির্বাচন, তাতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়, নির্বাচনে জনগণের রায় ইয়াহিয়া সামরিক জান্তা কর্তৃক বাঙ্গাল ও বাঙালিদের চিরতরে পদানত করে রাখার লক্ষ্যে ষড়যন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ, এর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে বাঙালিদের ২ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন পালন এবং এ আন্দোলন চলাকালে ৭ মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির উদ্দেশ্যে পাকিস্তানিদের শাসন-শোষণ-নিয়ন্ত্রণ ও জাতি নিপীড়নের হাত থেকে বাঙালির মুক্তির অর্জনে আসন্ন মুক্তিযুদ্ধের সর্বপ্রকার প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান ও দিক-নির্দেশনা দানসহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) তার ঐতিহাসিক ভাষণ রাখেন। ঐ ভাষণে তিনি সর্বপ্রথম ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ অর্থাৎ ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি উচ্চারণ বা স্বাধীনতার লক্ষ্য প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। অতঃপর, ২৫ মার্চ রাতে ইয়াহিয়া সামরিক জান্তার নির্দেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর গণহত্যায় ঝাঁপিয়ে পড়লে, রাত সাড়ে ১২টার দিকে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি কমান্ডোদের হাতে বন্দি হওয়ার পূর্বমুহূর্তে বঙ্গবন্ধু সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর তার নেতৃত্বাধীন (অনুপস্থিতি সত্ত্বেও) আওয়ামী লীগ সরকার (‘মুজিবনগর সরকার’ নামে সর্বমহলে পরিচিত প্রথম বাংলাদেশ সরকার)-এর অধীনে পরিচালিত ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত হয়ে অর্জিত হয় আমাদের মহান স্বাধীনতা; প্রতিষ্ঠা পায় বাঙালির জাতিরাষ্ট্র, বাংলাদেশ। একটু দীর্ঘ বিবরণ দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানী একবার পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্যে ‘সালাম’ বা বিদায় জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে বাঙালির জাতীয় মুক্তি অর্জিত হয়নি। জনগণের সম্পৃক্ততা ব্যতীত কী করে তা সম্ভব? লক্ষ্য অর্জনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতির বিপ্লবী উত্থান ঘটানো আবশ্যক হয়েছে। এ জন্য বঙ্গবন্ধুকে দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। আওয়ামী লীগের বাস্তবমুখী হওয়ার এরূপ বহু ঘটনা উল্লেখ করা যাবে।
দল হিসেবে আওয়ামী লীগের শক্তির অপর একটি উৎস হলো সৃজনশীলতা বা Ingenuity। যেমন বাঙালির জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু প্রণীত ঐতিহাসিক ৬-দফা কর্মসূচি (১৯৬৬); ১৯৮১ সালে দলের নিশ্চিত ভাঙন রোধে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ভারতে নির্বাসনে থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতিক্রমে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা; জেনারেল জিয়া-এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষকে শামিল করতে শেখ হাসিনার ‘ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা’র অঙ্গীকার; খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকারের সময় ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে ঢাকার মিরপুর ও জেলা শহর মাগুরার উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের নজিরবিহীন কারচুপি ও সন্ত্রাসী ঘটনার পর নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন; পুনরায়, বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়ে (২০০১-২০০৬) সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর (২০০৪ সাল) মাধ্যমে এ সরকার ব্যবস্থার ভিত্তিমূলে কুঠার আঘাত হানা এবং উচ্চ আদালত কর্তৃক ২০১০ সালে এ ব্যবস্থাকে ‘গণতন্ত্র’ তথা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি বা ‘Basic Principal’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় অবৈধ ঘোষণা করে রায়দানের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল; ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বা ‘ভিশন ২০২১’ ম্যানিফেস্টো গ্রহণ; আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (জানুয়ারি ২০২৪) ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের কর্মসূচি গ্রহণের ঘোষণা, ইত্যাদি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
গণতন্ত্রে বিশ্বাসী গণমুখী জনগণের দল মাত্রই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনে বিশ্বাসী। নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়, জনগণের কাছে পৌঁছা যায়। আবার নির্বাচনকে আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখা হয়। তাই, আওয়ামী লীগ পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলব্যাপী ৭৪ বছরের পথ চলায় প্রায় সকল নির্বাচনে (এরশাদের ১৯৮৮ সাল ও বেগম খালেদা জিয়ার মধ্য ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ ব্যতীত) অংশগ্রহণ করে। নির্বাচন বর্জন আওয়ামী লীগের ইতিহাস নয়। এমন কী জয়ের সামান্যতম সম্ভাবনা দূরে থাকুক, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন লাভ করা সম্ভব হবে না জেনেও, আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে জেনারেল আইয়ুব খানের শাসন আমলে ১৯৬৫ সালে অনুষ্ঠিত তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্রভিত্তিক (যাতে ভোটার ছিল পাকিস্তানের দুই অংশ থেকে ৪০ হাজার + ৪০ হাজার = ৮০ হাজার ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য, সাধারণ জনগণ নয়) নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনকে ইতিবাচক হিসেবে নেওয়াটাও আওয়ামী লীগের শক্তির একটি উৎস।
পরিশেষে, আওয়ামী লীগ মানে আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-আদর্শ সুরক্ষা। আওয়ামী লীগ মানে দেশের উন্নতি, সমৃদ্ধি, সাফল্য ও অগ্রগতি। আওয়ামী লীগ মানে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের শান্তি, সম্প্রীতি, সহাবস্থান। আওয়ামী লীগ মানে জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণ। আওয়ামী লীগ হচ্ছে অসহায়, গরিব, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঠিকানা। আওয়ামী লীগ পথ হারালে কিংবা ক্ষমতাচ্যুত হলে জাতি আর সঠিক পথে পথ চলতে পারবে না। এক অর্থে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতির ভাগ্য অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। তাই, আওয়ামী লীগ যাতে করে কিছুতে পথ না হারায়, জনগণের মণিকোঠায় যাতে স্থায়ী আসন করে নিতে পারে, দেশ ও জাতির স্বার্থে দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটিই একান্ত কামনা। এর দায়ভার, দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে সর্বস্তরের নেতৃত্ব ও কর্মীবৃন্দের। তাদের রাজনীতির পাথেয় হবে- ভোগ নয়, ত্যাগ- জনগণের সেবায় আত্মোৎসর্গ। সেটিই বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ও আদর্শ।

লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং সাবেক উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য