Saturday, July 13, 2024
বাড়িSliderঅসাংবিধানিক পন্থায় কিছু করা যাবে না

অসাংবিধানিক পন্থায় কিছু করা যাবে না

সম্পাদকের কথা: জাতীয় সংসদ নির্বাচন সমাসন্ন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর নানামুখী তৎপরতা। বিএনপি-র নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলো নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে বড় বড় জমায়েত-সমাবেশ করছে। তবে তারা গতানুগতিক কৌশল হিসেবে, বর্তমান সরকারের পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি তুলে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখলই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। জন্মলগ্ন থেকেই তারা এটা করছে।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তিগুলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছিল। একই দিনে তারা সপরিবারে হত্যা করেছিল তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণিকে। নৃশংস বর্বরতায় তারা একই বছরের ৩ নভেম্বর কারাগারে বন্দি চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে হত্যা করেছিল। এই অপশক্তিই খুনি খন্দকার মোশতাকের উত্তরসূরি হিসেবে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল। ১৫ আগস্টের ঘটনায় তাদের ভূমিকা ছিল পর্দার আড়ালে। কিন্তু ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বরের পর দোর্দণ্ড প্রতাপে তারা দৃশ্যপটে চলে আসে। মোশতাক ও জিয়াÑ কারও ক্ষমতা দখলই সংবিধানসম্মত ছিল না।
জিয়াউর রহমান তার ও বাংলাদেশ-বিরোধী শক্তির ক্ষমতাকে স্থায়ী করার লক্ষ্যে ১৯৭৫-১৯৭৭ সালের মধ্যে ক্যান্টনমেন্টে বসে বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলের জন্ম দেয়, তথাকথিত গণভোট দেয়, সামরিক ফরমান বলে সংবিধান সংশোধন এবং একাধিক নির্বাচনী প্রহসনের আয়োজন করে। অর্থাৎ অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখল, রাজনৈতিক দল গঠন এবং সংবিধান পদদলিত করে রাষ্ট্র পরিচালনার ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে। তারাই বিভিন্ন মেয়াদে সামরিক/অসামরিক পোশাকে বাংলাদেশের কাঠামোয় দেশকে পাকিস্তান বানানোর চেষ্টা করেছে। যে বিএনপি নামক দলটির জন্মই হয়েছে অসাংবিধানিক পন্থায়, এখন তারা ঐ অসাংবিধানিক ধারায় তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলবে, সেটাই স্বাভাবিক।
তবে তারা একা ছিল না। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু-হত্যার পেছনেও যেমন বিদেশি শক্তির মদত ছিল, জিয়া সরকারকে টিকিয়ে রাখার ব্যাপারেও তাদের ভূমিকা ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেমন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, তেমনি বঙ্গবন্ধু-হত্যার পেছনেও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশের চির শত্রু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীও তখন সরাসরি বিএনপি ও জিয়াউর রহমানকে মদত দিয়েছিল। বর্তমানেও সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো সামরিক জোটের সদস্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশে অযাচিতভাবে হস্তক্ষেপ করছে। যে মার্কিনীরা কিছুদিন আগেও স্বাধীন সার্বভৌম ইরাকে সামরিক অভিযান চালিয়ে সেদেশের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করেছে, হত্যা করেছে স্বাধীন দেশ লিবিয়ার সরকারপ্রধান মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে, রক্তের গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়েছে সংবিধান, গণতন্ত্র, মানবাধিকারকে, তারাই এখন মায়াকান্না জুড়ে দিয়েছে বাংলাদেশে গণতন্ত্র-মানবাধিকারের জন্য।
বিএনপি এবং তার সহযোগীরা এজন্য উদ্বাহু নৃত্য করছে এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবি করছে। বিএনপি বাংলাদেশে এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাচ্ছে, যাতে বিদেশি প্রভুদের সহায়তায় অসাংবিধানিক শক্তি ক্ষমতায় আসতে পারে। তারা যে নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে চাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তারা ভুলে গেছে এটা ১৯৭৫ বা ১৯৮১/৮২ সাল নয়। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ইতোমধ্যে যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, যে বাংলাদেশ এখন সারাবিশ্বে উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য দূরীকরণের রোল মডেল হয়েছে, সেই দেশে ইচ্ছে করলে ১৯৭৫-এর পুনরাবৃত্তি সম্ভব নয়।
এ-কথা পরিষ্কার যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, চীন ও ভারতের মতো বৃহৎ শক্তিগুলো ‘বিশ্ব রণকৌশলগত’ স্বার্থ বিবেচনা করেই তাদের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করে। বাংলাদেশ প্রশ্নেও তাদের এই নীতি প্রযোজ্য। আমরা দেখতে পাচ্ছিÑ বাংলাদেশের নির্বাচন, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন প্রশ্নে প্রকাশ্যেই রাশিয়া, চীন এবং মার্কিন ও পশ্চিমা ভূমিকার নিন্দে করেছে। বৃহৎ এই দুই পরাশক্তি স্পষ্ট কথায় জানিয়ে দিয়েছে, তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার পক্ষে। প্রতিবেশী ভারতও তাদের মনোভাব গোপন রাখেনি। তারাও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ন রাখার পক্ষে। কাজেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, আমরা একা নই।
আমরা চাই, সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশে অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। আমরা চাই, যে বা যারাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হোক, তারাই নির্বিঘ্নে সংবিধানের আওতায় রাষ্ট্র পরিচালনা করুক। কোনো অরাজকতা, রক্তপাত ও অবৈধ ক্ষমতা দখলের চেষ্টাকে বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেবে না।
রক্ত স্মৃতিবিজড়িত এই শোকের মাসে আমাদের আহ্বান, আসুন মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে সমুন্নত রাখতে অপশক্তিকে রুখে দাঁড়াই।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য