Monday, April 15, 2024
বাড়িSliderঅর্থনৈতিক ঝুঁকি : প্রাসঙ্গিক ভাবনা

অর্থনৈতিক ঝুঁকি : প্রাসঙ্গিক ভাবনা

বাংলাদেশ ব্যাংককে হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শুধুমাত্র প্রণোদনার অর্থ বা বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে ভালো রেট এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন দেশের সকল ব্যাংক ও মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসকে নিয়ে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ।

মো. হাবিবুর রহমান: কোভিড-১৯ মহামারিতে স্থবির বিশ্ব যখন কিছুটা স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসার পথে, তখনই বিশ্ব পরিস্থিতিকে টালমাটাল করে দিয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধ লকডাউন পরবর্তী মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে আরও বেগবান করেছে। অস্থির এই বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নানামুখী চাপ অনুভূত হচ্ছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনাও হচ্ছে অনেক, তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বিষয় আলোচনা না করে চটকদার শিরোনাম বা অযৌক্তিক আতঙ্ক ছড়ানোর মনোভাব দেখা যাচ্ছে।

শ্রীলংকার সাথে তুলনা ও বাস্তবতা
শ্রীলংকার অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে বিগত কয়েক মাসে অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। তাদের অর্থনৈতিক সংকটের কারণ, দেউলিয়াত্বের ঘোষণা ও জনগণের দুর্ভোগÑ এসব কিছুই যুক্তিযুক্ত আলোচনার দাবিদার এবং সেই আলোচনা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ প্রয়োজন। কিন্তু অযাচিতভাবে শ্রীলংকার তুলনা এনে, বাংলাদেশও দেউলিয়া হয়ে যাবে ও চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পতিত হবে- এ ধরনের আতঙ্ক ছড়ানোর প্রচেষ্টা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এর মাধ্যমে অর্থনীতি নিয়ে তথ্য-উপাত্তনির্ভর আলোচনা এড়িয়ে এক ধরনের Perception Building-এর প্রতি অতি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এ আতঙ্কবাদী মনোভাব প্রকৃত অর্থনৈতিক চিত্রকে আড়াল করে।
বাংলাদেশের সামষ্টিক ঋণ ব্যবস্থাপনার চিত্র, আমাদের মোট ঋণের পরিমাণ, ঋণের ধরন এবং গ্রহণ করা ঋণের সুদের হার ও মেয়াদের তথ্য থেকে বোঝা যাবে। বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ-এর ‘Debt Sustainability Analysis –March 2022’ রিপোর্টে বাংলাদেশকে ঋণ ব্যবস্থাপনার ঝুঁকির নিরিখে কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের বৈদেশিক ঋণ জিডিপির ১২.২ শতাংশ। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, আমাদের বৈদেশিক ঋণের ৮০ শতাংশই দীর্ঘমেয়াদি। পক্ষান্তরে শ্রীলংকার বৈদেশিক ঋণ তাদের জিডিপির ৪৮.২ শতাংশ। শ্রীলংকার বৈদেশিক ঋণের ৪৭ শতাংশ গ্রহণ করা হয়েছে সভরেন বন্ড ও অন্যান্য বেসরকারি খাত থেকে, যার গড় সুদের হার ৭.৫ শতাংশ। এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আমাদের গড় সুদের হার ১.৪ শতাংশ এবং আমাদের বৈদেশিক ঋণের ৬১.১ শতাংশ বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেওয়া। মোট বৈদেশিক ঋণের পুরোটুকু সরকারের নয়, ৭৫ শতাংশ সরকারের এবং ২৫ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নেওয়া। পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে বাংলাদেশের ঋণের চিত্র সহনীয় এবং বাংলাদেশের কোনো ধরনের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভবনা নেই।

অর্থনৈতিক ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ ও মোকাবিলায় পদক্ষেপসমূহ
বৈশ্বিক অর্থনীতির এই অস্থির পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও চাপ পড়েছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাণিজ্যিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০.৮২ বিলিয়ন ডলার। এই বাণিজ্য ঘাটতির প্রভাব পড়েছে মুদ্রাবাজারে। আমাদের রপ্তানি আয় ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারা ছিল নিম্নগামী। রেমিট্যান্স এসেছে ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম, ২১.০৩ বিলিয়ন ডলার। এ পরিস্থিতিতে আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ মোটাদাগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য ঘাটতি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় আনা এবং মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ, কারণ চ্যালেঞ্জের প্রতিটি ক্ষেত্র একটি অন্যটির সাথে জড়িত।
মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জটি বিশ্বব্যাপী সব সরকারের জন্য মাথাব্যথার কারণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ৯.০৬ শতাংশ। বাংলাদেশে এক সময়ে মূল্যস্ফীতি ৭.৫৬ শতাংশ, যা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কম হলেও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের জন্য সুখকর নয় মোটেই। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, পণ্য পরিবহনে- বিশেষ করে জাহাজে পণ্য পরিবহনের খরচের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং লকডাউন-পরবর্তী চাহিদা এর প্রধান নিয়ামক। মূল্যস্ফীতিকে মাথায় রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সতর্ক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। তবে এখনও দেশে ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার ৯ শতাংশে স্থির করা। যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল দেশেই মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বৃদ্ধি করছে। এমন সময়ে ঋণের সুদের উচ্চসীমা স্থির করে রাখার সিদ্ধান্ত সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য সুখকর হবে না। ঋণের সুদের হারের উচ্চসীমা পুরোপুরি উঠিয়ে দেওয়া উচিত অথবা খাতভিত্তিক ঝুঁকি বিবেচনায় উচ্চসীমা ১৪-১৬ শতাংশে স্থির করা যেতে পারে। এতে ঋণ গ্রহণ ব্যয়বহুল হবে বেসরকারি খাতের জন্য; কিন্তু একই সাথে আমানতকারীরা উপকৃত হবেন। বর্তমান অবস্থায় ব্যাংকগুলোকে মূল্যস্ফীতির সাথে সমন্বয় করে আমানতের সুদের হার নির্ধারণ করতে হচ্ছে। বর্তমান ৭.৫৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি এবং সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ ঋণের সুদের হার ব্যাংকসমূহের নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন অনেক কমিয়ে দিয়েছে। মুদ্রানীতি কার্যকর করতে সুদের হারের বর্তমান উচ্চসীমা উঠিয়ে দেওয়া বা মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন।
ঋণের সুদের হারের বর্তমান উচ্চসীমা প্রত্যাহার করা হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হতে পারেÑ এ ধরনের দাবি দেশের ব্যবসায়ীমহল থেকে উঠবে। দাবিটি অমূলক নয়। তবে স্বল্পমেয়াদি চাপ মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার স্বার্থে কিছুটা শ্লথ প্রবৃদ্ধি গ্রহণযোগ্য। পাশাপাশি এই সময়ে স্বাভাবিকভাবে সরকারের দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের তারল্য সংকট যাতে তীব্র আকার ধারণ না করে সে-জন্য আমানতকারীদের প্রাপ্ত সুদের হার মূল্যস্ফীতির বিবেচনায় সন্তোষজনক হওয়া প্রয়োজন। যা ঋণ সুদের হারের ৯ শতাংশ উচ্চসীমা উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব। সুদের হার বাজারের চাহিদা জোগানের ভিত্তিতে নির্ধারণ রেমিট্যান্স প্রবাহকে বৃদ্ধি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, যা পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে।
টাকার মানের বাজারের চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে অবমূল্যায়ন প্রয়োজন। বর্তমানে খোলাবাজারে ১ ডলার ১০৩ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত আন্তঃব্যাংক ডলারের রেট ৯৪.৪৫ টাকা। খোলাবাজারের সাথে এই বড় পার্থক্য মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতার পথে অন্তরায়। টাকার অবমূল্যায়ন বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। মার্কিন ডলারের বিপরীতে পৃথিবীর সকল মুদ্রারই অবমূল্যায়ন হয়েছে। টাকার মান কৃত্রিমভাবে ধরে রাখতে চাইলে মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা দূর হবে না। আর মুদ্রা বাজারের অস্থিরতা যে কোনো বিদেশি বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে যেমন বিলম্বিত করে তেমনি বৈধ পথে আসা রেমিট্যান্সের হার কমিয়ে দেয়। বাজারে চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে ডলারের দাম নির্ধারিত হতে দেওয়া হোক। এতে বহির্বিশ্বে পর্যটন ও চিকিৎসা ভ্রমণের চাহিদা যেমন হ্রাস পাবে, তেমনি বিলাস পণ্যের আমদানিও নিরুৎসাহিত হবে।
রেমিট্যান্স প্রবাহের হার বাড়ানো বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি কার্যকর পথ। পূর্বে উল্লিখিত সুদের হারের বর্তমান উচ্চসীমা প্রত্যাহার এবং ডলারের দাম বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া এ প্রবাহকে বাড়াতে পারে। বর্তমানে ব্যাংক ঘোষিত ও খোলাবাজারের রেটে টাকার আরও অবমূল্যায়ন হবেÑ এই প্রত্যাশায় অনেকে তাদের রেমিট্যান্স ধরে রেখেছেন, রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানসমূহও তাদের রপ্তানি আয় দেশে আনায় ধীরগতির অবলম্বন করছে। আমানতের সুদের হার সন্তোষজনক না হওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলেও অর্থ সঞ্চয়ের উৎসাহে ভাটা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। খোলাবাজারের রেটের সাথে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত রেটের ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে টাকার মান নির্ধারিত হওয়ার বার্তা বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় দ্রুত প্রত্যাবাসনকে সুগম করবে। পাশাপাশি সন্তোষজনক আমানতের হার ব্যাংকিং চ্যানেলে কষ্টার্জিত উপার্জনের অর্থ সঞ্চয়ে উৎসাহিত করবে বিদেশে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষকে।
বাংলাদেশ ব্যাংককে হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শুধুমাত্র প্রণোদনার অর্থ বা বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে ভালো রেট এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন দেশের সকল ব্যাংক ও মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসকে নিয়ে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ। রেমিট্যান্স অ্যাকাউন্টের অর্থ প্রেরণ ও উত্তোলনকে সহজ করা এবং একটি ব্যাংকে রেজিস্টার্ড রেমিট্যান্স অ্যাকাউন্টের টাকা অন্য যে কোনো ব্যাংক বা মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে উত্তোলনের সুবিধা করে দেওয়া যেতে পারে। এর ফলে শ্রমজীবী মানুষ বিশেষ করে মালয়েশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশে অবস্থানকারীগণ বিশেষভাবে উৎসাহিত হবেন।
ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবেÑ এ কথা বলাই বাহুল্য। তবে আমাদের বর্তমান অগ্রাধিকার হিসেবে কৃষিকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সরকার ভর্তুকি দিয়ে আসছে। তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দেশেও দাম বাড়ানোর প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। এক্ষেত্রে ভর্তুকি বাড়ানোর চিন্তা সর্বপ্রথম আসে। তবে বিপিসির আমাদানিকৃত জ্বালানির ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স প্রত্যাহার করেও দাম বাড়ানোর চাপ কমানো সম্ভব। বর্তমানে বিপিসি আমদানিকৃত পরিশোধিত জ্বালানি তেলে প্রতি লিটারে ০.৪০ (চল্লিশ সেন্ট) মার্কিন ডলার এবং অপরিশোধিত আমদানিকৃত জ্বালানি তেলে ব্যারেলপ্রতি ৪০ মার্কিন ডলার ট্যারিফ দিয়ে থাকে। বার্ষিক প্রদানকৃত এই ভ্যাট-ট্যাক্সের পরিমাণ বর্তমান বাজার মূল্য বিবেচনায় ১২ হাজার কোটি টাকার ওপরে দাঁড়াবে। বিপিসির ওপর থেকে এই ভ্যাট-ট্যাক্স প্রত্যাহার অতিরিক্ত ভর্তুকির চাহিদা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।
সরকার সংকট মোকাবিলায় আগাম পদক্ষেপ হিসেবে সরকারি খরচ কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর পাশাপাশি জ্বালানি, বিশেষ করে এলএনজি-র মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিয়ন্ত্রিত লোড ম্যানেজমেন্টের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে লোড ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে পরিবেশ অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় নিয়ে Hard Cash এবং Comfort/Social এই অর্থনৈতিক দিকসমূহ এবং ভোক্তাদের মতামতের বিষয় গুরুত্ব দেওয়া অধিকতর সহায়ক হবে। পাশাপাশি বিলাসী পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিতকরণও করা হয়েছে। সর্বশেষ মে-জুন মাসের এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের বিল ছিল ১.৯৫ বিলিয়ন ডলার, যা আমদানির নিম্নমুখী ধারাকে নির্দেশ করে। তবে ইতোমধ্যে নেওয়া সিদ্ধান্তসমূহের প্রভাব সঠিকভাবে নির্ণয়ে অন্তত তিন মাস অপেক্ষা করতে হবে। ভোজ্যতেলের দাম বর্তমানে কমতির দিকে, জ্বালানি তেলের মূল্যও জুনে ১১৬ ডলার প্রতি ব্যারেল থেকে বর্তমানে ১০০-১০৫ ডলার প্রতি ব্যারেলে নেমে এসেছে। সামনে আশা করা যায় দাম কিছুটা পড়তির দিকে থাকবে। বিশেষ করে ভারত ও চীন রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি দিন দিন বৃদ্ধি করার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক দ্বিমুখী কাঠামো তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব জ্বালানি মূল্যে কেমন হবে তা আগামী দু-তিন মাসে স্পষ্ট হবে। এ সময় আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে সংস্কার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা প্রয়োজন। কর-জিডিপির অনুপাত ও করজাল বিস্তৃত করায় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। জিডিপির অনুপাতে কর প্রদানের হারের পরিসংখ্যান প্রমাণ করে করজাল প্রসারের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কর আহরণের পরিমাণ বৃদ্ধি আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা বলয়কে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ দেবে। একই সাথে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং ডলারের ওপর চাপ কমানোর চিন্তাধারা থেকে ভারতের সাথে রুপিতে বাণিজ্যের সুযোগ নিয়ে সমীক্ষা চালানো যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, আমাদের অর্থনীতি যেমন বড় হয়েছে তেমনি আমাদের অভিঘাত সহ্য করা এবং প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলার সক্ষমতাও বেড়েছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গত এক যুগের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলশ্রুতিতে আমাদের রিজার্ভ ২০০৭-০৮ অর্থবছরের ৬.১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২১ সালে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। বর্তমান এই অস্থিতিশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে উচ্চ আমদানি ব্যয়ের ফলে রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩৯.৭৭ বিলিয়নে, যা আমাদের পাঁচ মাসের আমদানি দায় মেটাতে সক্ষম। অভিঘাত মোকাবিলার এই সক্ষমতায় তাই আতঙ্কিত না হয়ে যৌক্তিক পর্যালোচনার নিরিখে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

লেখক : ভাইস-চ্যান্সেলর, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর এবং সভাপতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য