Saturday, July 13, 2024
বাড়িSliderঅনন্য কৃতী পঞ্চমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

অনন্য কৃতী পঞ্চমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

আনিস আহামেদ : শুধু বাংলাদেশ নয়; প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। টানা চতুর্থবারের সঙ্গে পূর্বের একবার মিলিয়ে পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী এখন জননেত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে ইতোমধ্যে ২০ বছর তিনি পেরিয়ে এসেছেন। আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বের নারী রাষ্ট্রনেতাদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশিদিন সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শ্রীলংকার সিরিমাভো বন্দরনায়েকে, অ্যাঙ্গেলা মার্কেল, ইন্দিরা গান্ধীকেও ছাড়িয়ে গেলেন।
উল্লেখ্য, শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকে ১৮ বছর সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। জার্মানির প্রথম নারী চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল ১৬ বছর সরকারপ্রধান ছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী প্রায় ১৫ বছর সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পঞ্চমবারের মতো শপথ নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গত ১১ জানুয়ারি। তাকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এর আগে ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ এবং প্রতিবারই প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর শপথের পর অন্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ২২২ আসনে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টি পেয়েছে ১১টি আসন। বাকি ৬৫ আসনের মধ্যে ৬২টিতে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এবং জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও কল্যাণ পার্টি পেয়েছে একটি করে আসন।
এর আগে ১০ জানুয়ারি শপথ নেন নতুন সংসদ সদস্যরা। শপথ নেওয়ার পর আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাদের সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করা হয়। সংসদ নেতা হওয়ার পর শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশি-বিদেশির সাংবাদিক-পর্যবেক্ষকসহ মিডিয়ার সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন। যেখানে আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচনী পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকরাসহ ১১টি দেশের প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিলেন। রেকর্ডবার মহিলা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর শেখ হাসিনা সহাস্যে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন- ‘মানুষ আমাকে দেশ শাসনের দায়িত্ব দিয়েছেন। প্রশাসকের আবার পুরুষ-মহিলা কী! নিজেকে আমি মহিলা প্রধানমন্ত্রী নন, শুধু প্রধানমন্ত্রী বলেই মনে করি। তবে আমি মহিলা তো বটেই। মায়ের জাত। এই বয়সে এসে দেশবাসীকে সন্তানবৎই মনে করি।’ বললেন আরও- ‘ইন্দিরা গান্ধী, বন্দরনায়েকে, থ্যাচাররা বড় বড় মানুষ। আমি নগণ্য, নেহাতই সাধারণ। অত লেখাপড়ার সুযোগ আমার হয়নি। তবে ছোট বয়সে বাবা-মা, তিন ভাই, দুই ভাবীকে হারিয়েছি। খুনিদের ভয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছি দেশ থেকে দেশে। গরিব মানুষের দুঃখটুকু আমি বুঝি।’
১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। ১৯৮৬ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বসেন বিরোধীদলীয় নেতার আসনে। তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৯০ সালে তিন জোটের আন্দোলনে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন ঘটায়। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের পর তিনি দ্বিতীয় দফা বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দীর্ঘ ২১ বছর পর বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তিনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামাত জোট সরকার গঠন করলে তৃতীয়বারের মতো বিরোধীদলীয় নেত্রী হন শেখ হাসিনা। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর অযৌক্তিকভাবে শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়। দুই বছরের মাথায় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। দ্বিতীয়বারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের ভোট হয়, তাতে ২৩১টি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় আওয়ামী লীগ। সেই সরকারের মেয়াদ শেষে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিবন্ধিত সব দলই অংশ নেয়। ২৫৭টি আসন জিতে আবার সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। দশম সংসদ নির্বাচনের মতো দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনও বর্জন করে বিএনপি। নিবন্ধিত ৪২ দলের মধ্যে ২৮ দলের অংশগ্রহণে ভোটের আমেজ আনতে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের বাইরেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনা যখন দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন, তখন বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫-এর কাছাকাছি, ২০১৮ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে সেই প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৮ শতাংশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ২০২১ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১০-এর ঘরে নেওয়ার কথা সে-সময় বলেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু ২০২০ সালের মার্চে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা লাগে অর্থনীতিতে।
একাদশ নির্বাচনে ভরাডুবির অভিজ্ঞতা মাথায় নিয়ে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে এবারও ভোট বর্জন করেছে বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো। দফায় দফায় হরতাল-অবরোধের মধ্যে ২০১৩-২০১৫ সালের মতো নাশকতাও ফিরে এসেছে। সেই সহিংসতা মোকাবিলা করে এবারও নির্বাচনী বৈতরণী পেরিয়ে এলেন শেখ হাসিনা। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিঁড়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় ৪৮ শতাংশ ভোটার স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট প্রদান করেন।
এবারের নির্বাচনের ইশতেহারেও আওয়ামী লীগ গুরুত্ব দিয়েছে অর্থনৈতিক অগ্রগতির ওপর; ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ স্মার্ট সোনার বাংলা গড়ার কথা বলছে দলটি। শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন, অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ স্মার্ট ‘সোনার বাংলা’য় পরিণত করবেন তিনি।

জীবন সংগ্রাম
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের পাঁচ সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ শেখ হাসিনা। গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে বকশিবাজার সরকারি ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ছাত্রী সংসদের সহ-সভাপতি হন। তিনি এই কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং পরের বছর সভাপতি ছিলেন। শেখ হাসিনা ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস এবং পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সদস্য ও রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্র-জীবন থেকে শেখ হাসিনা সকল গণ-আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা সে-সময় পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যান। পরবর্তীকালে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছয় বছর ভারতে অবস্থান করেন। ১৯৮০ সালে ইংল্যান্ডে থেকে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন।
১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন শেষ করে অবশেষে তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার পরপরই তিনি শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। তাকে বারবার কারান্তরীণ করা হয়। তাকে হত্যার জন্য কমপক্ষে ২৩ বার সশস্ত্র হামলা করা হয়।
শেখ হাসিনাকে হত্যা-চেষ্টার উল্লেখযোগ্য হামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালনকালে তাকে লক্ষ্য করে পুলিশের গুলিবর্ষণ। এতে যুবলীগ নেতা নূর হোসেন, বাবুল ও ফাত্তাহ নিহত হন। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তাকেসহ তার গাড়ি ক্রেন দিয়ে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংয়ের সামনে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে এরশাদ সরকারের পুলিশ বাহিনী লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করে। এ ঘটনায় শেখ হাসিনা অক্ষত থাকলেও ৩০ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী শহিদ হন। লালদীঘি ময়দানে ভাষণদানকালে তাকে লক্ষ্য করে দুবার গুলিবর্ষণ করা হয়। জনসভা শেষে ফেরার পথে আবারও তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়।
১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য বারবার হামলা করা হয়। ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের উপনির্বাচন চলাকালে তাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। ১৯৯৪ সালে ঈশ্বরদী রেল স্টেশনে তার কামরা লক্ষ্য করে অবিরাম গুলিবর্ষণ করা হয়। ২০০০ সালে কোটালীপাড়ায় হেলিপ্যাডে এবং তার জনসভাস্থলে ৭৬ কেজি ও ৮৪ কেজি ওজনের দুটি বোমা পুঁতে রাখা হয়। শেখ হাসিনা পৌঁছার পূর্বেই বোমাগুলো শনাক্ত হওয়ায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। বিএনপি সরকারের সময় সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। ওইদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে এক জনসভায় বক্তব্য শেষ করার পরপরই তাকে লক্ষ্য করে এক ডজনেরও বেশি আর্জেস গ্রেনেড ছোড়া হয়। লোমহর্ষক সেই হামলায় শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও আইভি রহমানসহ তার দলের ২২ নেতাকর্মী নিহত হন এবং ৫০০-র বেশি মানুষ আহত হন। শেখ হাসিনা নিজেও কানে আঘাত পান।
শত বাধা-বিপত্তি এবং হত্যার হুমকিসহ নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা ভাত-ভোট এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য অবিচল থেকে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগণ অর্জন করেছে গণতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতা। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত হতে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে আর্থ-সামাজিক খাতে দেশ অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করে। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে শেখ হাসিনা সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলো ছিল- ভারতের সাথে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ এবং খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। এ ছাড়া, তিনি কৃষকদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং ভূমিহীন দুস্থ মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি চালু করেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- দুস্থ মহিলা ও বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্কদের জন্য শান্তি নিবাস, আশ্রয়হীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প।
২০০৯-২০১৩ মেয়াদে শেখ হাসিনা সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ১৩,২৬০ মেগাওয়াটে উন্নীতকরণ, গড়ে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন, ৫ কোটি মানুষকে মধ্যবিত্তে উন্নীতকরণ, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সামুদ্রিক জলসীমা বিরোধের নিষ্পত্তি, প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন, মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, কৃষকদের জন্য কৃষিকার্ড এবং ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলা, বিনা জামানতে বর্গাচাষিদের ঋণ প্রদান, চিকিৎসাসেবার জন্য সারাদেশে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালের ৩৮.৪ শতাংশ থেকে ২০১৩-১৪ বছরে ২৪.৩ শতাংশে হ্রাস, জাতিসংঘ কর্তৃক শেখ হাসিনার শান্তির মডেল গ্রহণ, ইত্যাদি। ২০১৪-২০১৮ মেয়াদে উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীতকরণ, ভারতের পার্লামেন্ট কর্তৃক স্থল সীমানা চুক্তির অনুমোদন এবং দুই দেশ কর্তৃক অনুসমর্থন, (এর ফলে দুই দেশের মধ্যে ৬৮ বছরের সীমানা বিরোধের অবসান হয়েছে), মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬০২ মার্কিন ডলারে উন্নীতকরণ, দারিদ্র্যের হার ২২.৪ শতাংশে হ্রাস, ৩২ বিলিয়ন ডলারের ওপর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন শুরু, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ইত্যাদি।
চতুর্থ মেয়াদে ২০১৯-২০২৩ পর্যন্ত অর্জিত উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্তিকরণ, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ সমাপ্ত এবং ঢাকায় মেট্রোরেল চালু, ঢাকা-কক্সবাজার ট্রেন লাইন চালু, বেশ কয়েকটি জেলা শহরের সংযোগ সড়ক চার-লেনে উন্নীতকরণ, রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ, মাতারবাড়ি বহুমুখী প্রকল্পসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। সারাদেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মিত হচ্ছে। সবগুলো বিভাগে আইসিটি পার্ক নির্মাণের কাজ চলছে। বর্তমানে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
শান্তি প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য বিশ্বের বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিষ্ঠান শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন ডিগ্রি এবং পুরস্কার অর্জন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি, ব্রিজপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানের ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়, স্কটল্যান্ডের অ্যাবারটে বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের বিশ্বভারতী এবং ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ব্রাসেলসের বিশ্ববিখ্যাত ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়, রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্টেট ইউনিভার্সিটি অব পিটার্সবার্গ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। এ ছাড়া ফ্রান্সের ডাওফি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডিপ্লোমা প্রদান করে। ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক রোটারি ফাউন্ডেশন তাকে Paul Haris ফেলোশিপ প্রদান করে।
সামাজিক কর্মকাণ্ড, শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য শেখ হাসিনাকে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা সম্মানিত করেছে। বিশেষ পার্বত্য চট্টগ্রামে সুদীর্ঘ ২৫ বছরের গৃহযুদ্ধ অবসানের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে ইউনেস্কো তাকে ‘হুপে-বোয়ানি’ (Houphouet-Boigny) শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রানডলপ ম্যাকন উইমেন্স কলেজ ২০০০ সালের ৯ এপ্রিল মর্যাদাসূচক ‘চবধৎষ ঝ. ইঁপশ ৯৯’ পুরস্কারে ভূষিত করে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ক্ষুধার বিরুদ্ধে আন্দোলনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘সেরেস’ (CERES) মেডেল, সর্বভারতীয় শান্তিসংঘ ১৯৯৮ সালে ‘মাদার টেরেসা’ পদক প্রদান করে। পশ্চিমবঙ্গ সর্বভারতীয় কংগ্রেস ১৯৯৭ সালে তাকে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু স্মৃতি পদক, আন্তর্জাতিক লায়ন্স ক্লাবের ‘গবফধষ ড়ভ উরংঃরহপঃরড়হ’ পদক ও ১৯৯৬-১৯৯৭ সালে ‘Head of State’ পদক, ২০০৯ সালে ভারতের ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ‘ইন্দিরা গান্ধী’ পুরস্কার, ব্রিটেনের গ্লোবাল ডাইভারসিটি পুরস্কার এবং দুবার ‘সাউথ সাউথ’ পুরস্কারে ভূষিত হন।
জাতিসংঘ পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচি দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে শেখ হাসিনাকে তাদের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ-২০১৫’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এ ছাড়া, টেকসই ডিজিটাল কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য International Telecommunication Union (ITU) শেখ হাসিনাকে ICTs in Sustainable Development Award-2015 প্রদান করে। নারী শিক্ষা ও উদ্যোক্তা তৈরিতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ২৭ এপ্রিল ২০১৮ Global Women’s Leadership Award-এ ভূষিত হন। ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান উইমেন ২০১৯ সালে তাকে খরভবঃরসব Lifetime Contribution for Women Empowerment Award প্রদান করে। এসিডিএসএন কর্তৃক তিনি ২০২১ সালে ‘এসডিজি অগ্রগতি’ পুরস্কারে ভূষিত হন।
শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে পিতার নির্দেশিত পথে একটি সমৃদ্ধিশালী দেশ গঠনের জন্য জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত তিনি। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যিনি আজ বিশ্ব মানবতার বাতিঘর; যার সুদূরপ্রসারী জনভাবনা আজ শুধু বাংলাদেশেই নয়, প্রশংসিত সারাবিশ্বে- তার নাম শেখ হাসিনা। তার অনন্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজকে বিশ্বের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

মন্তব্য